ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ জানুয়ারি ২০২২,   মাঘ ৭ ১৪২৮

তনিমা রশীদ

প্রকাশিত: ১৯:২৩, ৬ নভেম্বর ২০২১

শীতকালীন শাকসবজির গুণাগুণ

আমাদের দেশে শীতকালীন শাকসবজি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পেছনে বড় কারণ এর গুণাগুণ। শীতকালে টাটকা শাকসবজি পাওয়া যায়। শাকসবজিতে পোকামাকড়ের উপদ্রবও কম থাকে এ সময়। তাই তখন শাকসবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক কম দেওয়া হয় গ্রীষ্ম-বর্ষাকালের তুলনায়। তাই তখন টাটকা সবজি পাওয়া যায়।

শাকসবজি যত টাটকা থাকে তাতে পুষ্টিগুণ ততো বেশি থাকে। শীতকালীন শাকসবজি পুষ্টিগুণে ভরপুর একারণেই। পুষ্টিবিদদের মতে, শীতকালীন শাকসবজিতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন বা ফ্যাট, প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, বেটা-ক্যারোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ফলিক এসিড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, মিনারেলস ও ভিটামিন। অস্থিক্ষয় রোধ ও শরীরে রক্তকণিকা গঠনে শীতকালীন শাকসবজির ভূমিকা অপরিসীম।

শীতকালীন শাকসবজি ক্ষেত থেকে সরাসরি বাজারে আসে স্থানীয় চাষিদের মাধ্যমে।

তাই শরীরের চাহিদা পূরণে জন্য, ভিটামিনের ঘাটতি পূরণের জন্য ও শরীরকে ফিট রাখার জন্য শীতকালীন শাকসবজিগুলো নিয়মিত গ্রহণ করা দরকার। আমাদের দেশে শীতের সময়ের বেশি পাওয়া যায়- ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি, লাউ, মটরশুঁটি, গাজর, লালশাক, পালংশাক, মুলা, শালগম, শিম, টমেটো ও পেঁয়াজ কলি ইত্যাদি। শীতকালীন এই সবজিগুলো ক্যান্সার, উচ্চরক্তচাপ আরো নানাধরণের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা রয়েছে।

ফুলকপি

ফুলকপিতে রয়েছে আয়রন, সালফার, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও ফইবার। ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি,  ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে যা আমাদের দেহে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে। ফুলকপিতে রয়েছে নানান স্বাস্থ্য উপকারিতা। 

  • ক্যান্সার ও টিউমার:

ফুলকপি ক্যান্সার ও টিউমার প্রতিরোধক। এটিতে বিদ্যমান সালফারযুক্ত সালফোরাফেন উপাদানটি ক্যান্সার এর সেল ধ্বংস করে। আর যেকোনো ধরনের টিউমারকে বৃদ্ধি হতে দপয় না। তাই ক্যান্সার ও টিউমার রোগীকে ফুলকপি বেশি বেশি করে খাওয়া উচিত।

  • সবল হৃদয়যন্ত্র, পরিপাক সহায়ক ও স্মৃতিশক্তি বান্ধব

সবল হৃদযন্ত্রের জন্য ফুলকপি খুব উপকারী। এতে বিদ্যমান সালফোরাফেন রক্ত চাপ কমায় ও রক্ত প্রবাহ নিয়মিত রেখে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
ফইবার ও সালফার সমৃদ্ধ ফুলকপি পরিপাকে সাহায়তা কর।

  • ভিটামিন

ফুলকপিতে ভিটামিন-বি ও বি কমপ্লেক্সযুক্ত কলিন রয়েছে। যা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও সচল রাখে। মস্তিষ্কের দূর্বলতা ও স্মৃতিবিভ্রম এর মতো সমস্যায় ফুলকপি খুবই কাজে আসে। 

  • দেহ গঠন ও রক্ত উৎপাদন

দেহ গঠনে কার্যকরী ভূমিকা রাখে ফুলকপি। এটি কোলেস্টেরলমুক্ত বলে দেহ গঠনে সাহায্য করে। আয়রন দেহে রক্ত উৎপাদন করে। আর ফুলকপিতে আয়রন রয়েছে। আয়রন থাকায় গর্ভবতি মা, বাড়ন্ত শিশু ও বেশি পরিশ্রমী লোকের জন্য খুবই উপকারী। আয়রনের ট্যাবলেট খাওয়া থেকে ফুলকপি খাওয়া ভালো।

  • ঠান্ডা জাতীয় রোগ প্রতিষেধক

শীতকালে অনেকেই জ্বর, সর্দি, কাশি ও টনসিলে ভুগে। এসময় ফুলকপি খেলে খুব উপকার হয়। কারণ এর ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি এসব রোগ থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে। 

বাঁধাকপি

শীতকালীন শাকসবজি চিন্তা করলেই চোখে ভাসে ফুলকপির জাতভাই বাঁধাকপির কথা। বাঁধাকপিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি ও ভিটামিন কে যা দেহের ভিটামিনের অভাব দূর করে। আরো রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ফোলেট, ফাইবার, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, প্যান্টোথেনিক এসিড, বিটা ক্যারোটিন, এন্টি-অক্সিডেন্ট ইত্যাদি পুষ্টি গুণ।

  • ওজন কমায় ও হাড় মজবুত করে

ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি হওয়ায় বাঁধাকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ফাইবার তাড়াতাড়ি ওজন কমাতে সহায়তা করে। ক্যালসিয়াম মানব দেহের হাড় মজবুত করে। এই সবজিতে ক্যালসিয়াম বিদ্যমান যা হাড়কে করে দৃঢ় ও মজবুত।

  • আলসার প্রতিষেধক

বাঁধাকপি হলো একটি প্রাকৃতিক আলসার প্রতিষেধক। এর রস আলসার থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে। যাদের আলসারের সমস্যা রয়েছে তারা বাঁধাকপির রস খেতে পারেন।

  • চোখের, ত্বকের ও চুলের যত্নে

বিটা ক্যারোটিন চোখের যত্নের জন্য উপকারী। বাঁধাকপিতে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে যা চোখের জন্য ভালো। ত্বকের প্রদাহ জনিত সমস্যা থেকে দূরে রাখে বাঁধাকপি। এতে বিদ্যামান ফাইটো-ক্যামিকেলসমূহ এ সমস্যা থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে। বাঁধাকপিতে বিদ্যমান বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল আমাদের চুলের জন্য খুবই উপকারী।

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

ভিটামিন সি ও এন্টি-অক্সডেন্ট আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও আমাদের সুস্থ রাখে। বাঁধাকপিতে এই ভিটামিন ও এন্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে।

ব্রোকলি

এটি একপ্রকার কপি জাতীয় সবজি। বতর্মানে আমদের দেশে এর চাষ করা হচ্ছে। ব্রকোলিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। এটি চোখের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হাড় মজবুত করে।

টমেটো

টমেটো সারা বছর পাওয়া যায় এমন একটি সবজি। এটি ভিটামিন সি-তে ভরপুর হওয়ায় বিভিন্ন রোগ থেকে আামাদের সুরক্ষা করে। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, সামান্যই পরিমাণে ভিটামিন ডি, ফাইবার, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, রিবোফ্লাভিন, থায়ামিন সালফার ও প্রচুর পানি। 

  • দাঁত ও সুস্থতায়

টমেটোর ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম আমাদের দাঁতের জন্য খুবই উপকারী। এটি আমায় দাঁতকে রক্ষা করে। হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে হলে প্রচুর টমেটো খেতে হবে। কারণ এতে রয়েছে থায়ামিন যা আমাদের হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখে।

  • দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে

ভিটামিন এ আমাদের চোখ ভালো রাখে। টমেটোতে ভিটামিন এ রয়েছে যা রাতকানা রোগ নিরাময় করতে সক্ষম।

  • ক্যান্সার প্রতিরোধক

টমেটোও একটি ক্যান্সার প্রতিরোধক সবজি। এটি ফুসফুস ক্যান্সার ও যকৃত ক্যান্সার দূর করতে সহায়তা করে । টমেটোতে সালফার রয়েছে বলে এটি ক্যান্সার প্রতিরোধক।

মুলা

মুলা ও এর শাকে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি। এছাড়াও রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফাইবার এবং পানি।

  • শর্করার নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুধা বৃদ্ধি

শীতকালীন শাকসবজির তালিকায় এরপর আসে মুলা। ফাইবার রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। মুলা শাকে ফাইবার বিদ্যমান। মুলা রুচি একটি সবজি। এটি রুচি বাড়িয়ে দেয়ার ফলে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়।

  • কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়

মুলাতে ফাইবার থাকার কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে সাহায্য করে। 

লাউ

শীতকালীন শাকসবজি তে এরপরেই আসে ঠান্ডা জাতীয় সবজি লাউ। এ সবজিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পানি রয়েছে। এছাড়া ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন কে, ভিটামিন ই, ফাইবার, ফসফরাস, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও জিংকও রয়েছে।

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রক

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে লাউকে ঔষধ হিসেবে ধরা হয়। এটি রক্তে গ্লুকোজ এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।

  • হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সুস্বাস্থ্যে

লাউয়ে বিদ্যমান জিংক আমাদের দেহকে হৃদরোগ থেকে রক্ষা করে। লাউ খেলে স্ট্রোক এর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

  • কোষ্ঠকাঠিন্য নিরামক

লাউয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকায় এটি আমাদের শরীরের পানিশূন্যতা দূরে কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ থেকে রক্ষা করে।

গাজর

গাজর প্রায় সারা বছর পাওয়া যায়। গাজর পুষ্টিকর ও আঁশযুক্ত একটা সবজি। এতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন যা দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়।

সালাদ হিসেবে, তরকারী হিসেবে, ভাজি হিসেবে কিংবা শুধুই জুস হিসেবে গাঁজর। 

শীতকালে শাকসবজিতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম থাকায় এতে বিষাক্ত কীটনাশক কম ব্যবহার করা হয়। সে জন্য শীতকালের সবজি খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি কম থাকে। তারপরও কোনো কোনো সবজিতে নির্বিচারে কীটনাশক দেওয়া হয় বিশেষ করে ফুলকপি, বাধাঁকপি ও শিমে। যার কারণে এই তিনটি সবজি কখনো কখনো স্বাস্থ্যের উপকারের বদলে ক্ষতি করে।

তবে এই বিষাক্ত কীটনাশক থেকে মুক্তির উপায় আছে। যদি দু-একদিন আগে এসব সবজিতে কীটনাশক স্প্রে করা হয়, তাহলে সবজি থেকে কীটনাশকের কিছুটা গন্ধ পাওয়া যাবে। কোনো ঝুঁকি না নিতে চাইলে রান্না করার আগে সবজিগুলো লবণ বা তেঁতুল-গোলা পানিতে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখবেন। এতে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বিষ গুলো শাকসবজি থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর সবজিগুলো ভালো করে ধুয়ে রান্না করবেন। রান্নার তাপে বাকি শতাংশের কিছু বিষ নষ্ট হয়ে যাবে। তবে লবণ বা তেঁতুল-গোলা পানি ভিজিয়ে রাখা সম্ভব না হলে পরিষ্কার পানিতে আধা ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলেও উপকার হয়। আর এটাও সম্ভব না হলে নিজের বাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান তৈরী করে নিন। এতে সারা বছর বিষ মুক্ত সবজি পাবেন।

আইনিউজ/তনিমা রশিদ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়