Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, শনিবার   ০৭ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ২৩ ১৪৩২

মকিস মনসুর

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ৭ মার্চ ২০২৬

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিকে মুক্তির মোহনায় দাঁড় করেছিল

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালির মুক্তির দিশারী এবং হাজার বছরের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাসে আত্মোপলব্ধি ও মুক্তির অঙ্গীকারের এক অনন্য দিন হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ দেওয়া সেই ভাষণ আজও জাতিকে অনুপ্রাণিত করে। প্রতি বছর দিনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।

বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কারণ আমার জন্ম ১৯৭০ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যদি জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা না হতো, তাহলে হয়তো আমাদের প্রজন্মও এই মহান নেতার সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করত। তবুও শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনুভূতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

স্কুলজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এজন্য নিজেকে ধন্য ও সৌভাগ্যবান মনে করি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক কর্মী হিসেবে যখনই তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনি, তখন তা আমাকে গভীর আবেগে আলোড়িত করে। নতুন চেতনায় উজ্জীবিত করে দেশের মানুষের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার প্রেরণা জোগায়।

স্কুলজীবনেই আমি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি মুখস্থ করেছিলাম। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় মহান স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে এই ভাষণ দিয়ে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করি। যা আমার জীবনের গৌরবময় স্মৃতি হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তাঁর সেই জ্বালাময়ী ভাষণ বাঙালির রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। জাতিকে উজ্জীবিত করে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অত্যাচার, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ডাক দেন। তিনি জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এই শব্দযুগলই হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। ভাষণটি ছিল সম্পূর্ণ অলিখিত। কোনো লিখিত নোট ছাড়াই প্রায় ১০ লাখ মানুষের সামনে মাত্র ১৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে বঙ্গবন্ধু এক অনন্য রাজনৈতিক কাব্য রচনা করেছিলেন। ভাষণের শুরুতেই তিনি জনতাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।” এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে তিনি জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন।

ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন— “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।”

এই আহ্বান ছিল মূলত একটি গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতির দিকনির্দেশনা।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত কৌশল ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ভাষণটি দেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন, অন্যদিকে সরাসরি ঘোষণা না দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় রাখেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগে আঘাত করুক, যাতে বিশ্ববাসীর কাছে তাদের প্রকৃত চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষকে নাড়া দেয়নি, বরং বিশ্বজুড়েও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ভাষণকে ইউনেস্কো “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার”-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে এটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ড. জ্যাকব এফ. ফিল্ড সম্পাদিত We Shall Fight on the Beaches: The Speeches that Inspired History গ্রন্থেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে নির্বাচিত ৪১টি বিখ্যাত ভাষণের মধ্যে এটি অন্যতম।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভাষণ শুধু বাঙালি জাতিকেই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেনি, বরং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

বিশিষ্ট কবি নির্মলেন্দু গুণ এই ভাষণকে একটি অমর কবিতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়— “রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন…
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’”

আজও বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ বাঙালি জাতির চেতনা, সাহস ও প্রেরণার উৎস। পথ হারানোর মুহূর্তে কিংবা যেকোনো সংকটে এই ভাষণ আমাদের নতুন করে শক্তি জোগায়।

বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর দিকনির্দেশনা এবং ৭ মার্চের ভাষণ আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত।

৭১-এর সকল শহীদ, নির্যাতিত মা-বোন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বিনম্র শ্রদ্ধা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। চিরজীবী হোক আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়