ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২৫ ১৪২৭

আব্দুর রব, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ১৮:০৪, ২৮ জানুয়ারি ২০২১
আপডেট: ২১:১৭, ২৮ জানুয়ারি ২০২১

একজনের মানবিক উদ্যোগে ভাগ্য বদল হবে অন্যজনের

প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আমেনা ফজল

প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আমেনা ফজল

কাশ্মীরি আপেলকুল চাষ করে সফল আমেনা ফজল। মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে  শুরু করেছেন এ চাষ। নিজের গ্রামের গরীব ও মেধাবী এক শিক্ষার্থীকে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তার এ উদ্যোগ বলে জানান তিনি ।

প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আমেনা ফজল চাকরির  পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মানবিক ও সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত। তিন সন্তানের জননী হয়েও স্বামী সন্তানদের সময় দিয়ে, চাকুরী ঠিক রেখেও মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আমেনা ফজলের সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, আপেলকুলের লাভের পুরোটাই ওই গরিব মেধাবী  শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যায় হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়, আমার এতো সামর্থ্য নাই, তাই  বিভিন্ন ভাবে কিছু টাকা সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করছি। এর মধ্যে  আপেলকুল চাষকে প্রাধান্য দিচ্ছি।

তিনি বলেন, '৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ৭০০ আপেলকুলের চারা রোপন করেছিলাম, এগুলো এখন বড় হয়েছে এবং প্রতি গাছে আশানুরূপ ফলন হয়েছে।  এই গাছগুলো ৩ বছর ভালো ফলন দিবে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ফলন কমবে। এর পাশাপাশি কিছু অস্ট্রেলিয়ান বলসুন্দরী'র চারাও রোপন করেছিলাম সেগুলোতেও ভালো ফলন হয়েছে।'

আমেনা আরও বলেন, 'প্রতি বছর একটি গাছ থেকে ১২-১৫ কেজি ফলন পাবো আশা করি। সে অনুযায়ী পাইকারী ১০০ থেকে ৮০ টাকা  কেজি ধরে বিক্রি করতে পারলে বছরে ৫-৬ লাখ টাকা আয় হতে পারে। সার্বিক খরচ বাদ দিলে বছরে ৩-৪ লাখ আয় হবার সম্ভাবনা রয়েছে।  সে অনুযায়ী ৪/৫ বছরের টাকা একত্রে করলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।'

দেরীতে চারা রোপনের ফলে এ বছর ফলন অনেকটা কম হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'পরবর্তী বছর থেকে ফলন বাড়বে। এখন পর্যন্ত পাইকারি  ১১০টাকা কেজি ধরে ২৫০ কেজি আপেলকুল বিক্রি করেছি, যার বাজার মূল্য ২৭৫০০ টাকা। এ বছর পুরো ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ফলন হবে সে অনুযায়ী আরো ৭০০ থেকে ১০০০ কেজি বিক্রি করা যাবে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী এই সহযোগিতায় সফল মানুষ হবে এই স্বপ্ন দেখি,  সে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিনত হবে।'

যে শিক্ষার্থীর জন্য এতোকিছু সেই শিক্ষার্থী মোছাব্বির বলে, 'আমি সুনামগঞ্জে গ্রামে থাকতাম, সেখানে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতাম। পাশাপাশি পড়ালেখা করতাম। কিন্তু পড়ালেখা ভালোভাবে করতে পারতাম না। এরপর আমেনা ম্যাডাম এবং উনার স্বামী আমাকে মৌলভীবাজার শহরে নিয়ে আসেন। আমার এক চোখে সমস্যা ছিলো,দেখতে পারতাম না। প্রথমে তারা ঢাকায় নিয়ে গিয়ে আমার চোখের অপারেশন করান। সেখান থেকে ফেরার পর আমাকে পড়ালেখা করান, এরপর মৌলভীবাজার জেলার সবচেয়ে ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয় 'মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে' ভর্তি পরিক্ষা দেই, সেখানে সবার মধ্যে প্রথম হই।'

মোছাব্বির বলে, 'এরপর প্রতি ক্লাসেই সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হই। আমাকে তারা নিজের সন্তানের মতো আদর করেন, পড়ালেখার সব খরচ  দিচ্ছেন। এখন আমার উচ্চশিক্ষার জন্য টাকা সঞ্চয় করছেন।  আমি তাদের ঋণ কখনো শোধ করতে পারবো না।
বড় হয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার  হতে চাই,মানুষের সেবা করতে চাই।'

মোছাব্বির এর পাশাপাশি নিজের  গ্রামের আরো তিন জন শিক্ষার্থীকে নিজের বাসায় রেখে পড়ালেখা করাচ্ছেন আমেনা ফজল।

এই কাজে তাকে পরিপূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন আমেনা ফজল এর স্বামী এ এফ তালুকদার, তিনি জানান-  স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে আসছি।  চাকুরীর সুবাদে সময় কম থাকে, তাও যতটুকু সময় পাই স্ত্রীর কাজের সাথে যুক্ত হই, চেষ্টা করি সহায়তা করতে। আমার স্ত্রী যে একজন গরীব মেধাবী  শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেন, পাশাপাশি বাসায় আরো তিনজন রেখে পড়াচ্ছেন,  সেই স্বপ্নের সমর্থক আমি, পাশাপাশি এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমিও কাজ করছি, করে যাবো। সামনের দিনগুলোতে আমরা দুজন মিলে সাধ্য অনুযায়ী  মানুষের কল্যানে কাজ করতে চাই।

উল্লেখ্য, আমেনা ফজল এবং এ এফ তালুকদারের বাড়ি হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রফিনগর  গ্রামে,বর্তমানে বসবাস করছেন মৌলভীবাজার শহরে।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়