এ জে লাভলু, বড়লেখা প্রতিনিধি
আপডেট: ১৮:৩৫, ২২ জুলাই ২০২১
বড়লেখার বোবারথলে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার
পাহাড়ের নিচে থেকে পানি সংগ্রহ করে ঘরে ফিরছে ১১ বছর বয়সী নাইমা বেগম। ছবি: প্রতিনিধি।
পাহাড়ের ঝিরি থেকে প্লাস্টিকের পাইপ ও বাঁশের মাধ্যমে বেয়ে পানি পড়ছে চৌবাচ্চায় (ট্যাংকে)। খাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য সেই পানি সংরক্ষণ করছিলেন দক্ষিণ গান্ধাই (বোবারথল) গ্রামের ফখর উদ্দিন। অপরিচিত কারও কাছে পানি সংগ্রহের এই পদ্ধতি নতুন মনে হলেও ফখর উদ্দিনের কাছে তা নিত্যদিনের। এই গ্রামে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। এছাড়া পানি সংগ্রহের কোনো উৎসও নেই। এ কারণে ফখর এভাবেই পানি সংরক্ষণ করছিলেন।
ফখর উদ্দিনের মতো মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের বাঙালি ও আদিবাসি খাসি সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষকে কয়েক যুগ থেকে এভাবে পানি সংরক্ষণ করেন। এই পানি তারা খাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করছেন। এতে প্রায়ই এলাকার অনেকে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চৌবাচ্চায় পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ফখর উদ্দিন।
সরেজমিন দক্ষিণ গান্ধাই গ্রামে গিয়ে কথা হয় এলাকার বাসিন্দা ফখর উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি খাবার ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের জন্য এই পানি সংগ্রহ করেছি। এভাবে দীর্ঘদিন থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কারণ আমাদের এলাকা পাহাড়ি হওয়ায় পানির কোনো উৎস নেই। এখানে কোনো নলকূপও নেই। আমাদের বড় কষ্ট হচ্ছে পানির জন্য। এই কষ্ট কবে ঘুচবে তা জানি না।’ তিনি বলেন, ‘এখানে বর্ষায় মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি আনতে হয়। সে পানি ময়লাযুক্ত থাকে। ছেঁকে, চুলায় ফুটিয়ে পান করতে হয়। নোংরা পানি খেয়ে অনেকেই নানারকম অসুখে পড়ে।’
একই এলাকার বাসিন্দা রইছ আলী বলেন, ‘আমরা এমনিতেই দুর্গম এলাকায় আছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় কষ্ট পানির জন্য। বর্ষাকালে মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে কষ্ট বেশি শুরু অয়। তখন বিভিন্ন জাগায় থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। ভালো পানি (সুপেয় পানি) তো পাওয়া যায় না। ময়লাযুক্ত পানি মিলে। ছেঁকে, ফুটিয়ে খাওয়া লাগে। এই পানি খেয়ে রোগ হচ্ছে মানুষের।’
এলাকার বাসিন্দা সোহাগ দর্জি বলেন, ‘সারা বছরই সুপেয় পানির সংকট থাকে। তবে শুষ্ক মৌসুমে সংকট বেশি হয়। এসময় ঝরনাগুলো শুকিয়ে যায়। তখন পানির জন্য হাহাকার করতে হয়। এই এলাকায় বর্ষার সময় পানি মেলে। তা পাহাড়ি ঝরনা থেকে বিভিন্ন ভাবে সংগ্রহ করতে হয়। বর্ষার সময় পানি ছোট ছোট কুয়ায় ধরে রাখা হয়।’
পাহাড় বেয়ে চুইয়ে আসা পানি সংগ্রহ করছেন এক ব্যক্তি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজুর ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত সংলগ্ন ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ১২টি গ্রাম রয়েছে। ওয়ার্ডটি বোবারথল নামে সবার কাছে পরিচত। ওই ওয়ার্ডের গ্রামগুলো হচ্ছে-বোবারথল, দক্ষিণ গান্ধাই, মাঝ গান্ধাই, পেকু ছাড়া, ইসলামনগর, শান্তিনগর, গান্ধাই পুঞ্জি, কুসবা নগর, বারোঘরি, ষাইটঘরি, করইছড়া, উত্তর করই ছড়া। আনুমানিক ১৯৬৫ থেকে ৬৬ সালের দিকে ওই এলাকায় মানুষের বসতি শুরু হয়। গ্রামগুলোতে বাঙালি ও আদিবাসি খাসি সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। বর্তমানে ওই ওয়ার্ডটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। দুর্গম পাহাড়ি ওই গ্রামগুলোতে সুপেয় পানি সংগ্রহের কোনো উৎস নেই। বর্ষকালে কুয়া, ঝরনা ও পাহাড় চুইয়ে পড়া পানি তারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করেন। তবে শুষ্ক মৌসুমে (প্রায় ৫ মাস) তাদের ভোগান্তি বেড়ে যায়। এসময় পানির বেশিরভাগ উৎস শুকিয়ে যায়। তখন খাবার ছাড়াও নিত্যকাজের জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রাকৃতিক কোনো উৎস থেকে তাদের পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দূরবর্তী কোনো এলাকা থেকে উৎপাদক নলকূপ স্থাপন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্রামগুলোতে সুপেয়ে পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে পাইপ লাইন স্কীমের মাধ্যমে পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘এলাকাটি খুব দুর্গম। নিচে পাথর থাকায় নলক‚প স্থাপন করা যায় না। রিং টিউবওয়েল (পাতকুয়া) করলেও পানি পাওয়া যায় না। ওই অবস্থায় মানুষ খুব কষ্ট করছে। কয়েকটি দপ্তর থেকে রিং কুয়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুকনো মৌসুমে এগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। বছরের প্রায় ৫ মাস পানির জন্য মানুষকে বেশি কষ্ট করতে হয়। অন্যসময় পানি পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো বিশুদ্ধ নয়। এতে পানিবাহিত রোগে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থায় খাবার পানির ব্যবস্থা করলে তারা উপকৃত হবেন।’
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (বড়লেখা কার্যালয়ের) উপসহকারী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন বলেন, ‘বড়লেখার বিভিন্ন এলাকায় আমরা গভীর নলকূপ স্থাপন করেছি। কিন্তু বোবারথল পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় মাটির ৫০-১০০ ফুট নিচে পাথরের স্তর পাওয়া যায়। সে কারণে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা যায় না। দূরবর্তী কোনো এলাকা থেকে উৎপাদক নলকূপ স্থাপন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সুপেয়ে পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সে লক্ষ্যে স্থানীয় সাংসদ ও পরিবেশ মন্ত্রী, নির্বাহী প্রকৌশলীর নির্দেশনায় বোবারথলসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাইপ লাইন স্কীমের মাধ্যমে পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
আইনিউজ/এজে লাভলু/এসডি
- দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার শ্যালিকা
- মৌলভীবাজারের রাজনগরে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বিধবা রুবির বিউটি পার্লার - `প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে আমাদের ধোকা দেওয়া হচ্ছে`
- রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে কমলগঞ্জে রাস উৎসব শুরু
- কমলগঞ্জে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার


























