ঢাকা, বুধবার   ১৩ মে ২০২৬,   বৈশাখ ৩০ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৫৬, ১৩ মে ২০২৬

ট্রাম্প-শি বৈঠক ঘিরে বিশ্বজুড়ে নজর

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিং। ছবি: সংগৃহীত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিং। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে চীন সফরে যাচ্ছেন। ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর সঙ্গে তার বহুল আলোচিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান পরিস্থিতি এবং ইরান যুদ্ধকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেইজিং সফরে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

এক দশক আগের সফরের সঙ্গে তুলনা

বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এবারের সফরকে ২০১৭ সালের তার শেষ বেইজিং সফরের সঙ্গে তুলনা করছেন। সে সময় চীন ট্রাম্পকে বিশেষ কূটনৈতিক মর্যাদা দিয়েছিল। তাকে ঐতিহাসিক ফরবিডেন সিটিতে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

তৎকালীন সময়ে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী ছিল। আন্তর্জাতিক সংকট গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র রিসার্চ ও অ্যাডভোকেসি অ্যাডভাইজার আলি ওয়াইনের ভাষ্য, তখন চীন ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল যাতে ট্রাম্প বুঝতে পারেন যে শি জিন পিং তার সমপর্যায়ের নেতা। তবে এখন সেই অবস্থান প্রমাণের প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে।

চীনের শক্তিশালী অবস্থান ও নতুন বাস্তবতা

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই চীনকে ‘নিয়ার-পিয়ার’ বা সমপর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ইতিহাসে চীনই সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী রাষ্ট্র।

শি জিন পিংয়ের তৃতীয় মেয়াদে চীন “নতুন উৎপাদনশীল শক্তি” গড়ে তোলার কৌশল বাস্তবায়ন করছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, রোবোটিক্স, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

চংচিং: ভবিষ্যৎ চীনের প্রতিচ্ছবি

চীনের পশ্চিমাঞ্চলের শহর চংকিং এখন দেশটির আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পাহাড় ও নদীবেষ্টিত এই শহর ধাপে ধাপে নির্মিত হওয়ায় একে অনেকে “৮ডি শহর” বলে অভিহিত করেন।

শহরের বহুতল সড়ক, বহুস্তরবিশিষ্ট মেট্রো নেটওয়ার্ক এবং উঁচু-নিচু নগর কাঠামো পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। রাতের আলোয় ইয়াংজি নদীর তীরজুড়ে গড়ে ওঠা আধুনিক নগর দৃশ্য চীনের দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।

চংচিং এখন গাড়ি শিল্প, বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন, রোবোটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় কারখানার বড় কেন্দ্র। এ কারণে একে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের “সিলিকন ভ্যালি” বলেও ডাকা হয়।

তবে দ্রুত উন্নয়নের পাশাপাশি শহরটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছে। স্থানীয় সরকারের ঋণ বেড়েছে, সম্পত্তি বাজারে মন্দা চলছে এবং বেকারত্বও বাড়ছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও চীনের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন লড়াই

চীনের প্রযুক্তি অগ্রযাত্রার অন্যতম কেন্দ্র এখন রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চংচিংয়ের বিভিন্ন গবেষণাগারে শিশু ও তরুণদের জন্য রোবট প্রদর্শনী আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে হিউম্যানয়েড রোবট, রোবট মাছ এবং নৃত্যরত রোবট প্রদর্শিত হচ্ছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প রোবট ব্যবহারকারী দেশ। ২০২৬ সালে দেশটি রোবোটিক্স খাতে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।

তবে এই অগ্রগতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এনভিডিয়া এর উন্নত এআই চিপ এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন কিছু প্রযুক্তি রপ্তানি নীতিতে শিথিলতা আনলেও সবচেয়ে উন্নত চিপ বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে।

বাণিজ্য ও বৈশ্বিক কূটনীতি

চীন এখন ধীরে ধীরে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি চীনের জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। চীন এখন নিজেদের প্রভাব বাড়াতে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশ সুবিধাও সম্প্রসারণ করছে।

এদিকে ইরান সংকট নিরসনেও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে বেইজিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের দ্বৈত বাস্তবতা

চীনের আধুনিক নগর উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও দেশটিতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এখনও কঠোর। সংবাদমাধ্যম ও সমালোচনামূলক মতামতের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

তারপরও চংচিংয়ের মতো শহরগুলো চীনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সালে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল চীনের উত্থান প্রদর্শনের একটি সুযোগ। আর ২০২৬ সালের এই সফরে চীন বিশ্বকে দেখাতে চায়, তারা এখন কেবল উদীয়মান শক্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক শক্তি।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়