Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, রোববার   ০১ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ১৭ ১৪৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ৩০ জানুয়ারি ২০২৪
আপডেট: ১৯:১০, ৩০ জানুয়ারি ২০২৪

দেশে কুষ্ঠ রোগী বেশি মৌলভীবাজারে, মৃ ত্যু ২

মৌলভীবাজারে ২০২৩ সালে ২৫৭ জন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়েছে।

মৌলভীবাজারে ২০২৩ সালে ২৫৭ জন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের যেসব জেলায় কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম মৌলভীবাজার জেলা। গেল ২০২৩ সালে এই জেলায় মোট ২৫৭ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১১ জন। যদিও, কুষ্ঠ পরীক্ষার হার বাড়লে কুষ্ঠরোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ জানান, বর্তমানে মৌলভীবাজারে কুষ্ঠ রোগের পরিস্থিতি ভালো। চা-বাগানসহ সন্দেহজনক এলাকায় পোর্টেবল এক্স-রে দিয়ে রোগী শণাক্ত করা হচ্ছে। অনেক রোগী শণাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কুষ্ঠমুক্ত মৌলভীবাজার করতে কাজ করছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। 

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুষ্ঠ রোগের একটি চিত্র আই নিউজের সামনে তোলে ধরেছে কুষ্ঠ রোগ নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা লেপ্রা। সংস্থাটির মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জের এরিয়া সুপারভাইজার জিয়াউর রহমান মৌলভীবাজারের কুষ্ঠরোগের অবস্থা নিয়ে বেশ আশঙ্কাজনক কিছু তথ্য জানিয়েছেন। 

কুষ্ঠ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ ধরা হয় গ্রেড টু বলে চিহ্নিত রোগীদেরকে। এই গ্রেড টু রোগীদের মূল চ্যালেঞ্জ ধরে কাজ শুরু করা এই সংস্থা বলছে মৌলভীবাজারে গ্রেড টু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। ২০২৩ মৌলভীবাজার জেলায় ৭ জন গ্রেড টু কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। 

লেপ্রার এই কর্মকর্তা জানান ২০২১ সাল থেকে মৌলভীবাজারে কুষ্ঠ রোগীদের নিয়ে কাজ করছে তাঁদের সংস্থাটি। যেখানে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করার পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ক্যাম্পেইনও করছেন তাঁরা।  

লেপ্রার মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জের এরিয়া সুপাইভাইজার জিয়াউর রহমান জানান, বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগী শনাক্তের দিক থেকে মৌলভীবাজার অন্যতম। গেল ২০২৩ সালে এ জেলায় ৬৪টি জন বেশি কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

লেপ্রার তথ্য বলছে, ২০২২ সালে মৌলভীবাজারে মোট কুষ্ঠ রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১৯৩ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ৬৪ জন বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৭ জনে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছে কমলগঞ্জ উপজেলায়। এ উপজেলায় ২০২৩ সালে ৬৬ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাছাড়া, ২০২৩ সালে কুলাউড়ায় ৬২ জন, জুড়ীতে ৪৬ জন শ্রীমঙ্গলে ৩৫ জন, বড়লেখায় ২৬ জন, রাজনগরে ১৭ জন এবং সদরে মোট ৯ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

জিয়াউর রহমান আই নিউজকে বলেন, মৌলভীবাজারে মোট শনাক্ত হওয়া কুষ্ঠরোগীর বেশিরভাগই পিছিয়ে থাকা চা শ্রমিক। মোট কুষ্ঠ রোগীর ৯৮ শতাংশই আসেন জেলার বিভিন্ন চা বাগান থেকে। এর অবশ্য আরেকটা কারণ আছে, চা বাগানগুলোতে সহজেই রোগীদের পরীক্ষার জন্য একত্র করা যায়। তাই পরীক্ষাও হয় বেশি। যেকারণে শনাক্তের হার 
চা বাগানে বেশি।

মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন অফিসের আরেক কর্মকর্তা মো. আব্দুল জাকারিয়া বলেন, আমাদের জেলায় ২০২৩ সালে ২৫৭ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এরমধ্যে চিকিৎসার আওতাধীন রয়েছেন ২১৭ জন। যাদের মধ্যে শিশুও আছেন ১১ জন। দুই জন মারা গেছেন। বাকিরা সুস্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু, আক্রান্তের এই পরিমাণটা আশঙ্কাজনক বলে মনে হয়।

তিনি জানান, কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে সিভিল সার্জন অফিসের উদ্যোগে এরিমধ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমান চিকিৎসকদের দল গিয়ে গিয়ে সার্ভে করছেন। সচেতনা ক্যাম্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে জানাচ্ছেন। 

জিয়াউর রহমান বলেন, সিভিল সার্জনের উদ্যোগে পোর্টেবল এক্সরে সুবিধা চালু করায় এখন এক্সরে টিম নিয়ে ভ্রাম্যমান অবস্থায়ও কোষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা হয়। এই টিম যেখানে যায় সেখানে ক্যাম্পেইনও করে। আমরা সার্ভে বাড়াতে পারলে কুষ্ঠ রোগী শনাক্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। 

কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েও এখন অনেকটা সুস্থ বিণয় চাষা। কারণ, তাঁকে অন্য এক ডাক্তার এই রোগ সম্পর্কে অবহিত করতে পেরেছিলেন। তানাহলে বিনয় জানতেন না তাঁর কুষ্ঠ হয়েছে। বিনয় চাষা আই নিউজকে বলেন, আমার কুষ্ঠ হয়েছে এটা আমি নিজেও জানতাম না। শুধু পায়ে কিছু ঘা হয়েছিল দেখেছিলাম। আমি ফার্মেসি থেকে এর জন্য ওষুধও কিনে খাই। কিন্তু, দীর্ঘদিন ওষুধ খাওয়ার পরও আমার এই ঘা কমছিল না। অবশেষে, মৌলভী চা বাগানের এক ডাক্তার আমার এই রোগ শনাক্ত করেন। তিনি আমাকে জানান যে আমার কুষ্ঠ হয়েছে। পরে তিনি আরও দুইজন ডাক্তার নিয়ে আসেন। তাঁরা আমাকে চিকিৎসা দেন। প্রায় এক বছর আমি ওষুধ খাই। এতে আমি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠি। পরে আরও ছয় মাস ওষুধ খাওয়ার পর এখন মুটামুটি আমি সুস্থ আছি। বর্তমানে বিণয় চাষা চিকিৎসার আওতাধীন আছেন। তার আরও কিছু ওষুধ খাওয়া চালিয়ে যেতে পরিপূর্ণ সুস্থতা পেতে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মহিলা বলেন, আমার পিঠে প্রথম একটা দাগ হয়েছিলো। সেই দাগ শুরুতে আমলে নেইনি। কিন্তু, দীর্ঘদিন পরেও যখন এটি কমছিল না তখন ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই। তাঁরা জানান আমার কুষ্ঠরোগ হয়েছে। তবে, এখন আমি চিকিৎসাধীন আছি। ডাক্তার বলেছেন, ওষুধ খেলে কুষ্ঠরোগ ভালো হয়ে যায়। 

কুষ্ঠ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ ধরা হয় গ্রেড টু বলে চিহ্নিত রোগীদেরকে। এই গ্রেড টু রোগীদের মূল চ্যালেঞ্জ ধরে কাজ শুরু করা এই সংস্থা বলছে মৌলভীবাজারে গ্রেড টু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। ২০২৩ মৌলভীবাজার জেলায় ৭ জন গ্রেড টু কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। 

কুষ্ঠ রোগের লক্ষণ কী?
চামড়ায় ফ্যাকাশে দাগ-ছোপ দেখা দেয়।
ত্বকে ছোট ছোট ফোঁড়ার মতো হয়।
চামড়া শুষ্ক ও শক্ত হয়ে যায়।
পায়ের পাতার নিচের অংশে ঘা হয়।
মুখের বা কানের কিছু স্থানে ফুলে ওঠে।
চোখের পাপড়ি ও ভ্রু পড়ে যায়।
সংক্রমিত স্থান অসাঢ়তা অনুভব ও ঘাম হয়।
অনেকে পঙ্গু হয়ে যান।
পেশী দুর্বল হয়ে যায়।
মুখের নার্ভ বা স্নায়ুতে প্রভাব পড়ায় অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়ে।

কুষ্ঠ রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে-
হাত-পা অকেজো হয়ে যায়।
আঙুল ও পা ছোট হয়ে যেতে পারে।
পায়ের আলসার বা ঘায়ের কারণে তা কাটা পড়ে।
নাক বিকৃত হয়ে যায়।
চামড়ায় জ্বালা-যন্ত্রণা হয়।

কুষ্ঠ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগগুলোর একটি হলেও, দেশে এখনো এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে কুষ্ঠ আক্রান্ত রোগীর হার প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে একজনের নিচে নামিয়ে আনা। সেই বিচারে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।

আই নিউজ/এইচএ 

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়