Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, শনিবার   ১৪ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:০৬, ১৪ মার্চ ২০২৬

শিপিং লেন বন্ধ হলে তেল নেটওয়ার্কে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

ছবি: রয়টার্স

ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা বন্ধ না করে, তবে দেশটির খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে হামলার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এমন সতর্কতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ ইতিমধ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।

একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী দ্বীপটির কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তু “সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস” করেছে। খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র; দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল এই দ্বীপের টার্মিনালের মাধ্যমে রপ্তানি হয়। এটি হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ৩০০ মাইল (৪৮৩ কিলোমিটার) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।

তবে মার্কিন হামলায় খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। ট্রাম্প বলেন, “ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে আমি অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।”

এদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, তাদের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী তেল কোম্পানিগুলোর স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মার্কিন হামলার সময় খার্গ দ্বীপে ১৫টির বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হামলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি নৌঘাঁটি এবং বিমানবন্দর স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে তেল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, “মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা করার ক্ষমতা ইরানের নেই। ইরানের সামরিক বাহিনী এবং এই সন্ত্রাসী শাসনের সঙ্গে জড়িত সবাই অস্ত্র রেখে দেশের যা অবশিষ্ট আছে তা রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”

মার্কিন হামলায় দ্বীপটির পাইপলাইন, টার্মিনাল ও স্টোরেজ ট্যাংকের জটিল নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, সেদিকেও নজর রাখছে আন্তর্জাতিক বাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার ভোরে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস লেবাননের হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েলের ওপর অতিরিক্ত হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত এক দিনে পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ছিল।

এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত একটি জ্বালানিবাহী বিমানের ছয়জন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বিমানবাহিনীর ট্যাঙ্কার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়ছে উত্তেজনা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমা হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বৈরুত ও আশপাশে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় লেবানন নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

শুক্রবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনী জলপথে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহারা দেওয়া শুরু করবে।

যুদ্ধের সম্ভাব্য সময়কাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের এটা বলতে পারব না। আমার নিজস্ব ধারণা আছে, কিন্তু তার কী লাভ? যতদিন প্রয়োজন, ততদিন এটি চলবে।”

হরমুজ প্রণালী নিয়ে উদ্বেগ
ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে।

বিশ্বের মোট জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

ইরানের হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু তেল উৎপাদক দেশ তাদের তেল রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করলেও ইরান রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী সংস্থা TankerTrackers.com জানিয়েছে, গত বুধবার খার্গ দ্বীপে কয়েকটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার লোড করা হচ্ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বুধবার পর্যন্ত ইরান প্রতিদিন ১১ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।

র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের সভাপতি বব ম্যাকন্যালি বলেন, “ট্রাম্পের মন্তব্য বাজারকে সেই আশঙ্কার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে—যেখানে এই জ্বালানি সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী ও বড় আকার ধারণ করতে পারে।”

তবে জ্বালানি শিল্পের কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো দীর্ঘ সময় অক্ষত রাখা কঠিন হবে।

বাইসন ইন্টারেস্টসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জশ ইয়ং বলেন, “তেলের অবকাঠামো বাদ দিয়ে খার্গ দ্বীপে বোমা হামলা করা যেন ম্যাকডোনাল্ডসে গিয়ে মাংস ছাড়া হ্যামবার্গার খাওয়ার মতো—এর আসল উদ্দেশ্য কী?”

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের বিস্তার
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করেছেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায় তারা হামলার ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যে ইউরোপীয়, এশীয় ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী ট্যাঙ্কারগুলোর নিরাপত্তায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরানের নাগরিক। লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

সংঘাতের কারণে কয়েক মিলিয়ন মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লেবাননের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এখন কর্তৃপক্ষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। সূত্র: রয়টার্স

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়