ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১১ ১৪৩৩

আব্দুর রব

প্রকাশিত: ২২:৩৭, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১
আপডেট: ২২:৩৮, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ভাষা শহীদদের প্রতি নেই যথাযথ স্মরণ ও শ্রদ্ধা

সারাদেশে পালন করা হলো শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটি পালনে নেই শহীদের প্রতি যথাযথ  শ্রদ্ধা, নগ্ন পায়ে হাঁটা, একুশের গান। অধিকাংশই দামি পোশাক, মাত্রাতিরিক্ত ছবি ও ব্যক্তিগত প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ।

এখন নেই সেই বজ্রধ্বনি, নেই প্রভাতফেরী মমতা মাখানো ভালোবাসার সেই আয়োজন।  জুতা পায়ে দিয়ে কোনরকম শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দায় সারছেন। 

প্রাণের ভাষা বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠা দুর্বার আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত, রফিক প্রমুখের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। যার ফলে বাংলা ভাষা পায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। 

দিনটি জাতীয় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান গেয়ে শহীদদের স্মরণে বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে, শ্রদ্ধার ফুল হাতে মানুষের পদযাত্রা  শহীদ মিনার অভিমুখে যাত্রা করে। স্মৃতির মিনারে শ্রদ্ধায় অবনত হয় লাখো মানুষ।

কিন্তু সাবেক ছাত্রনেতারা বলছেন, বর্তমান সময়ে  দিবসটির তাৎপর্য ও শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো লোক দেখানোয় পরিণত হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর জয়েস বলেন,  কে কতো দামী পোশাক পড়বে, কে কতো ছবি তুলবে এই প্রতিযোগিতাই এখন মূখ্য হয়ে গেছে। মৌলভীবাজার জেলা শহরে প্রভাতফেরিতে ২/৩ টি প্রতিষ্ঠান একুশের গান গেয়ে নগ্ন পায়ে পদযাত্রা করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সংগঠন এগুলো থেকে দুরে ছিলেন।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে ফুল হাতে নগ্ন পায়ে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি'  গানটি গেয়ে শহীদ মিনারে যাওয়ার দৃশ্যপটটি পরিবর্তন হয়ে গেছে।

কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে, ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে সকল ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান সংগঠন  মিলে নগ্নপায়ে যাত্রা করে যাওয়া হতো শহীদ মিনারের দিকে। সবার কণ্ঠে প্রতিধ্বণিত হতো- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ সেই একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাতফেরীর সাথে বর্তমানের মিলে নেই বললেই চলে। একুশ উদযাপনের সবচেয়ে পবিত্রতম ও আন্তরিকতাপূর্ণ  ছিল প্রভাতফেরী- একুশে ফেব্রুয়ারী ভোরে স্বত:স্ফূর্ত নগ্ন পদযাত্রা মানুষের শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে। কেউ একা একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কখনও বা যুথবদ্ধভাবে। ভোরের আলো ফুটছে, মানুষের শান্ত মিছিল চলছে ধীর পায়ে শহীদ মিনারের প্রতি, পুরুষদের পরিধানে পাজামা-পাঞ্জাবী, নারীদের সাদা শাড়ী, কালো পাড়। হাতে ফুলের মালা, পুস্পস্তবক। শিশুরাও আছে মা-বাবার হাত ধরে, তাদের কচি হাতেও ফুল।

সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ সে অমর গানের প্রতিধ্বনি  ছড়িয়ে পড়তো আকাশে-বাতাসে।

এখন নেই সেই বজ্রধ্বনি, নেই প্রভাতফেরী মমতা মাখানো ভালোবাসার সেই আয়োজন।  জুতা পায়ে দিয়ে কোনরকম শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দায় সারছেন। 

এমন দৃশ্য দেখে অনেকেই আক্ষেপ করে বলেছেন,  প্রভাতফেরী পরিচিত দৃশ্য এখন অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। কবি ও আবৃত্তিশিল্পী সুনীল শৈশব বলেন ছোটবলা আমরা বাসায় জুতা রেখে আসতাম। শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে খালি পায়ে প্রভাতফেরীতে অংশ নিতাম, ' আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি গেয়ে শহীদ মিনারে যেতাম পুষ্পস্তবক অর্পণ করতাম। সে এক অন্যরকম অনুভুতি অন্যরকম ভালোলাগা ছিলো। বর্তমানে যে চর্চা হচ্ছে ধীরে ধীরে প্রভাতফেরীর আবেদন ম্লান হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রভাতফেরী আবেদন সম্পর্কে জাগ্রত করা এখন সময়ের দাবী। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তৌহিদুল হক বলেন- একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে সরকারি কোন নীতিমালা না থাকলেও দীর্ঘদিনের চর্চা এবং অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। এবং এই চর্চা ও অনুশীলন ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে গভীরভাবে স্মরণ ও শ্রদ্ধার মধ্যে নিহিত । বর্তমানে দামি পোশাক, বিভিন্ন ভাবে ব্যক্তি প্রদর্শনের ফলে শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদশর্ন করা হচ্ছে  না।নতুন প্রজন্মকে প্রভাতফেরী ও একুশ উদযাপনে আরো বেশি করে চর্চায় নিয়ে আসা জরুরী। পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আইনিউজ/এইচকে

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়