ঢাকা, রোববার   ১৭ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ২ ১৪২৮

প্রকাশিত: ০৮:৫৯, ২২ মে ২০১৯
আপডেট: ১০:১৮, ২২ মে ২০১৯

ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক

ফিচার ডেস্ক: মাথায় লাল-সবুজ রঙের একটি ছাতা, পায়ে এক জোড়া পুরোনো কেডস আর সাইকেল। এ নিয়েই ওয়াহিদ সরদার ছুটে বেড়ান যশোর, ঝিনাইদহ মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায়। খুঁজে বের করেন পেরেক আর লোহা সাপ্টানো গাছগুলোকে। । বিভিন্ন প্রতিষ্টানের প্রচারবোর্ড লাগানোরর  জন্য গাছে গাছে যে পেরেক মারা হয় তা দেখে কাদে ওয়াদিন সরকারের মন আর সেই সচেতনতা থেকেই এখন পর্যন্ত ৫০০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন রাস্তার গাছ থেকে ১২৭ কেজি পেরেক তোলেছেন তিনি। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী তিনি। ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে কাজ করলেও মনের মধ্যে আছে তাঁর সবুজের হাতছানি। গাছ দেখেই যেন প্রশান্তি পান তিনি। গাছকে ভালবাসেন তীব্রভাবে। কিন্তু গাছের নিরাপত্তাহীনতা প্রতিনিয়ত ভাবায় ওয়াহিদ সরদারকে। শিক্ষা জীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিও পেরোতে পারেন নি ওয়াহিদ সরদার। কিন্তু লোকমুখে শোনেছেন বিজ্ঞান বলে গাছেরও জীবন আছে, আছে প্রাণ । গাছও কষ্ট পায় এটি উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনি। নিজের জায়গা থেকে গাছের সেই কষ্টকে আংশিক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।  গাছের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকে বৃক্ষরাজি রক্ষার ব্রত নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেফিরে গাছ থেকে পেরেক অপসারণ করছেন গাছ বন্ধু ওয়াহিদ সরদার। [caption id="attachment_4136" align="alignnone" width="679"] সংগৃহীত[/caption] ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে গাছের পেরেক অপসারণ শুরু করেন ওয়াহিদ সরদার। যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা এ তিনটি জেলার বিভিন্ন জায়গায় সাইকেলে চড়ে রাস্তার ধারে থাকা গাছ থেকে ব্যানার, পেরেক অপসারণ করে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন রাস্তার গাছ থেকে ১২৭ কেজি পেরেক তোলেছেন তিনি। ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজ খরচে এবং বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় গাছ লাগিয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার। তবে গাছ রক্ষার এই কাজটি নিজের তীব্র ভালোবাসা থেকে করলেও পরিবারের সমর্থন ছিলো না তাঁর এ কাজে। কারণ এতে করে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো ওয়াহিদ সরদারের পরিবারের ভবিষ্যত। কিন্তু অভাবের এই কড়াঘাত তাঁর পথ অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে নি। গাছের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিই বড় ছিলো ওয়াহিদ সরদারের কাছে। গাছ থেকে পেরেক তোলা আর গাছ লাগানো তাঁর নেশা। পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁর এই নেশার কথা বুঝতে পারেন তখন আর বাঁধা দেন নি কেউ। মালয়েশিয়ায় থাকা ছেলেটিই সংসারের হাল ধরেন তখন থেকে। অন্যদিকে ওয়াহিদ সরকার করছেন গাছ রক্ষার লড়াই। বলছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই গাছকে আগলে রাখবেন তিনি। লোহার পেরেক থেকে রক্ষা করবেন গাছেদের জীবন। ওয়াহিদ সরদার জানান, ‘গাছকে আমি অনেক ভালোবাসি, গাছ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, গাছ মারা যাচ্ছে তার কাঁটার আঘাতে। বিজ্ঞান বলছে গাছের জীবন আছে, যেহেতু জীবন আছে তার মানে তার যন্ত্রণা, ব্যাথা আছে। এ কারণে আমি এ কাজটি করছি।‘ গাছ থেকে পেরেক অপসারণের এই কাজটি করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে ওয়াহিদ সরদারকে। শোনতে হয়েছে বিভিন্ন জনের কটুকথা, অনেক সময় তিরষ্কারের শিকার হয়েছেন তিনি। তবুও দমে যান নি। বরং সেখান থেকেই আবার নতুন করে শুরু করেছেন তাঁর গাছ রক্ষার এই অভিযান। তাঁর মতে ভালো কাজ করতে গেলে সমালোচনার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। তাই মানুষের সমালোচনা নিয়ে বিশেষ করে কিছু ভাবেন না তিনি। ওয়াহিদ সরকারের ক্ষোভ সমাজের শিক্ষিত এবং উচ্চ শ্রেণীর উপর। তাঁর মতে সমাজের শিক্ষিত মানুষেরাই গাছের গায়ে লোহার পেরেক, বিলবোর্ড, ব্যানার লাগান। যারা এসব করছেন তারা সব শিক্ষিত, পয়সাওয়ালা। তাই পেরেক তোলতে গিয়ে নিরাপত্তার একটা হুমকি ছিলো। কারণ গাছের গায়ে পেরেক দিয়ে বা ব্যানারে দেওয়া তাদের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা তিনি তোলে ফেলছিলেন। কিন্তু মনের ভেতরে ভয় কাজ করলেও মুখে সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছেন ওয়াহিদ সরকার। গাছের গায়ে পেরেক, ব্যানার, বিলবোর্ডে গাছের ক্ষতি হয়, গাছ কষ্ট পায়- এটি বুঝাতে বুঝাতেই গাছ রক্ষার এই কাজটি চালিয়ে যান ওয়াহিদ সরকার। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে গাছ থেকে পেরেক তোলতে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করতো গাছ থেকে পেরেক তোলে তিনি কি করেন? উত্তরে ওয়াহিদ সরদার সংরক্ষণের কথা বললে অনেকেই অবিশ্বাস করতো তাকে। অনেকেই বলতো, আপনি এসব পেরেক তোলে নিয়ে বিক্রি করেন, এতে প্রচুর টাকা পাওয়া যায়! এ ধরনের বিভিন্ন ক্ষোভ বুকে নিয়েও গাছ রক্ষার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ওয়াহিদ সরদার। কারণ গাছ রক্ষার এই অভিযানকে ওয়াহিদ সরদার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার একটি সু-পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যানারকে জাদুঘরে না নিবে ততক্ষণ তিনি এটা চালিয়ে যাবেন।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়