সংগ্রাম দত্ত
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া—কমলেশ বেদজ্ঞ হত্যার ৫৩ বছর
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া—কমলেশ বেদজ্ঞ হত্যার ৫৩ বছর। ছবি: আই নিউজ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু বিজয়ের গৌরবগাথা নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক অসমাপ্ত অধ্যায়ও। সেই অসমাপ্ত অধ্যায়গুলোর একটি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বামপন্থী নেতা কমলেশ বেদজ্ঞের হত্যাকাণ্ড। স্বাধীনতার মাত্র দুই বছর পর ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিচারহীনতার এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও উত্থাপন করে।
কমলেশ বেদজ্ঞ ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই তরুণ নেতা ছোটবেলা থেকেই মেধা, সাহস ও নেতৃত্বগুণের জন্য পরিচিত ছিলেন। জীবনের একটি পর্যায়ে তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীতে কাজ করেন। পরে দেশে ফিরে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি এলাকায় শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কমলেশ বেদজ্ঞ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি হেমায়েত বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্থানীয়ভাবে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন বলে সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বহু সম্মুখ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রেখে সংগঠনের কাজ চালিয়ে যান।
স্বাধীনতার পর টুংগীপাড়া ও কোটালীপাড়ায় বামপন্থী রাজনীতির সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-১২ (বর্তমান কোটালীপাড়া) আসনে ন্যাপ (মোজাফফর) প্রার্থী হিসেবে ‘কুড়েঘর’ প্রতীক নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু ভোটের মাত্র তিন দিন পরই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা, যা স্থানীয় রাজনীতির ইতিহাসে গভীর দাগ রেখে যায়।
১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া এলাকায় একটি রাজনৈতিক সভা শেষে ফেরার পথে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলার শিকার হন কমলেশ বেদজ্ঞ। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হেমায়েতের নেতৃত্বে একটি দল এই হামলা চালায়। সেই হামলায় কমলেশ বেদজ্ঞ ছাড়াও নিহত হন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু এবং ছাত্র ইউনিয়নের দুই নেতা বিষ্ণু ও মানিক।
ওয়ালিউর রহমান লেবুও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। যুদ্ধের সময় তিনি ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি চাকরির সুযোগ ত্যাগ করে গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং উলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর গোপালগঞ্জে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ১২ মার্চ শহরে হরতাল পালিত হয় এবং গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজ মাঠে একটি বড় প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কমিউনিস্ট নেতা আশু ভরদ্বাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সমাবেশে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বক্তব্য রাখেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কমরেড মণি সিং, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ, ন্যাপ নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, শওকত হোসেন চৌধুরী, ছাত্রনেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ইসমত কাদির গামা, গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. ফরিদ আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম রইসসহ অনেকে। বক্তারা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং দ্রুত বিচারের দাবি তোলেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বক্তব্যে বলেন, “হত্যাকারী যেই হোক না কেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই।” সেই বক্তব্য তখন অনেকের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই আশার বাস্তবায়ন আর হয়নি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মুক্তিযুদ্ধকালীন তথ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জানা যায়, কমলেশ বেদজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সম্পদের বিবরণ নিজের ডায়েরিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এসব কারণ অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলাটি পরবর্তী কয়েক দশকে নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। গত ৫৩ বছরে অন্তত ছয়বার হাইকোর্টে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। ২০১৩ সালে মামলাটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা কার্যকরভাবে এগোয়নি। ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্ট একজন আসামির আপিল খারিজ করলেও বিচার এখনও নিম্ন আদালতে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মামলার অধিকাংশ আসামিই মারা গেছেন। ২৩ জন আসামির মধ্যে ২০ জন ইতোমধ্যে প্রাকৃতিক মৃত্যু বরণ করেছেন বলে জানা যায়। ফলে বিচার প্রক্রিয়া এখন আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি। পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের নাম এখনও সরকারি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি মামলার এক আসামিকে পরবর্তীকালে একটি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের দায়িত্বশীল পদে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অবশ্য ইতিহাসের বিচার সব সময় আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের স্মৃতিতেও তার প্রতিফলন ঘটে। কমলেশ বেদজ্ঞ এবং তাঁর সঙ্গে নিহত তিন নেতার স্মৃতি সেই অর্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার দাবি করে, তখন সেই রাষ্ট্রের কাছে ন্যূনতম প্রত্যাশা থাকে—যে মানুষগুলো স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, তাদের জীবনের মূল্য ও মর্যাদা যেন ইতিহাসের ভেতরে হারিয়ে না যায়।
৫৩ বছর পরেও কমলেশ বেদজ্ঞ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পূর্ণ না হওয়া সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে আনে: স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কি আমরা সত্যিই পূরণ করতে পেরেছি?
ইএন/এসএইচআরএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ
























