ব্রিটেনে ঈদের ইতিহাস ও বহুসংস্কৃতির গল্প
ব্রিটেনে ঈদের ইতিহাস ও বহুসংস্কৃতির গল্প
প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে, ব্রিটেনে ঈদ উদযাপন করলাম। আগে থেকেই আমার একটা আগ্রহ ছিল—এখানে প্রবাসীরা, বিশেষ করে বাঙালিরা, কীভাবে ঈদ উদযাপন করেন তা দেখার। যেখানে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ বসবাস করেন—এক কথায়, বহুজাতি, বহুভাষা ও সংস্কৃতির এক মিলনমেলা, অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ জন্য প্রবীণ-নবীন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। পাশাপাশি Office for National Statistics, Muslim Council of Britain, East London Mosque, UK National Archives, BBC News এবং Wikipedia ঘেঁটে তথ্য জানার চেষ্টা করেছি।
১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশি অভিবাসন বাড়ে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মানুষ ব্রিটেনে আসেন।
এর পর থেকেই ঈদের চিত্র বদলাতে শুরু করে। কমিউনিটি বড় হয়। মসজিদ বাড়ে। রেস্টুরেন্ট, দোকান, সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে।
লন্ডনের ইস্ট লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার—এসব শহরে ঈদ ধীরে ধীরে বড় জমায়েতে রূপ নেয়।
তথ্য বলছে, ব্রিটেনে বর্তমানে প্রায় ৩.৯ মিলিয়ন মুসলিম বসবাস করেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, পাকিস্তান ও ভারতের মুসলিমরাও এখানে আছেন।
ব্রিটেনে আমার ঈদ উদযাপন
ব্রিটেনে আসার পর আমি রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় আড়াইশ মাইল দূরে, নিউক্যাসল আপন টাইন অঞ্চলের নর্থ শিল্ডস এলাকায় বসবাস করছি।
এবার ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছি সাগরপারের উইটলি বে মসজিদে। ছোট, পরিপাটি এই মসজিদে মুসল্লিদের বড় অংশই ছিলেন সিলেট অঞ্চলের বাংলাদেশি। এ ছাড়া কিছু পাকিস্তানি এবং আফ্রিকান-ক্যারিবিয়ান মুসল্লিও ছিলেন।
উইটলি বে ছাড়াও নিউক্যাসল সেন্ট্রাল মসজিদ, ওয়েস্ট এন্ড মসজিদসহ আশপাশে আরও কয়েকটি মসজিদ রয়েছে।
ঈদের নামাজ শেষে পরিচিত-অপরিচিত সবাই একে অপরকে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা জানান। এরপর ঘরে ফিরে সেমাই, পোলাও, মাংস আর রুটির আয়োজন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই আসেন। আমরাও যাই।
তবু কোথাও যেন একটু অপূর্ণতা থেকে যায়। দেশের সেই ঈদের আমেজ নেই। ঘর থেকে বের হলে এই মফস্বল এলাকায় ঈদের বিশেষ কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না।
তবে রাজধানী লন্ডনে চিত্রটা ভিন্ন। বাঙালি ও এশিয়ান অধ্যুষিত এলাকায় ঈদের আলাদা রঙ আছে। আছে উৎসবের ছোঁয়া। কিন্তু সেখানেও কাজের চাপ আর ছুটি না পাওয়ার এক ধরনের আক্ষেপ রয়ে যায়।
লন্ডনে ঈদ-উল ফিতর ২০২৬
বরাবারের মতো লন্ডনে এবারো ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব লন্ডনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০ হাজার মুসলমান এখানে ঈদের নামাজ পড়েন।
ইস্ট লন্ডনের ইস্টহাম সেন্ট্রাল পার্কে প্রায় ২ হাজার মুসল্লি একসাথে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। এছাড়াও ব্রিকলেন, নিউহাম, মিল্যান্ড পার্ক, স্ট্র্যাটফোর্ড পার্ক, বার্কিং, হাম্পস্ট্যাড, মেনর পার্ক ইত্যাদি স্থানের স্থানীয় মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টারেও ঈদের নামাজ হয়েছে। নামাজ শেষে বাংলাদেশিরা একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
তবে অনেকেই ঈদের নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করে ছুটে যান নিজ কর্মস্থলে। ঈদ উপলক্ষে কোনও ছুটি না থাকায় অনেকেই দু:খ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ঈদ উপলক্ষে পিঠা, সন্দেশ, মিষ্টি, সেমাই, কোরমা-পোলাও ইত্যাদি আয়োজন করা হয়। খাওয়া-দাওয়া আর কুশলাদি বিনিময়ের পাশাপাশি চলে ঈদের গান আর দেশের ফেলে আসা স্মৃতি।
ব্রিটেনে ঈদ এখন প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের সামাজিক উৎসব। শহর থেকে শহরতলি—সবখানেই ঈদের দিন আলাদা আবহ। রঙিন পোশাক, জমজমাট নামাজ, উৎসবের আমেজ। তবে এই অবস্থায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে বহু বছর।
গ্রিন স্ট্রিটে চাঁদরাত
লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত গ্রিন স্ট্রিট-আপটন পার্ক এব হোয়াইট চাপল। সেখানে চাঁদরাতে উপচেপড়া ভিড় জমে। ঈদের পোশাক কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় কাটান বাঙালিরা। যেন সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবো মৌলভীবাজারের পশ্চিমবাজার।
শুরুটা ছিল খুব ছোট
ব্রিটেনে মুসলিমদের উপস্থিতি নতুন নয়। ১৯শ শতকের শেষ দিকে কিছু মুসলিম এখানে বসতি গড়েন। তখন সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ১৮৮৯ সালে প্রথম বড় আকারে ঈদের জামাত হয় ওয়াকিংয়ের শাহজাহান মসজিদে। উপস্থিতিও ছিল সীমিত। কয়েক ডজন মানুষ। কূটনীতিক, নাবিক আর কিছু ধর্মান্তরিত ব্রিটিশ মুসলিম।
তখন ঈদ ছিল নিভৃত আয়োজন। কোনো উৎসবের আমেজ ছিল না।
জাহাজি লস্করকদের হাত ধরে বিস্তার
বিশ শতকের শুরুর দিকে বাঙালি নাবিকরা ব্রিটেনে আসতে শুরু করেন। তাঁরা ‘লস্কর’ নামে পরিচিত ছিলেন। জাহাজের শ্রমিক হিসেবে জাহাজি নামেও পরিচিত ছিলেন্ লন্ডন, কার্ডিফসহ বন্দর এলাকায় তাঁরা বসবাস করতেন।
ঈদের দিন তাঁরা ছোট ঘর বা ভাড়া করা হলে নামাজ পড়তেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ছোট কমিউনিটি।
১৯৪০-এর দশকে লন্ডনে স্থায়ী মসজিদ গড়ে ওঠে। এতে ঈদের আয়োজন কিছুটা সংগঠিত রূপ পায়।
সত্তরের দশকে বদলে যায় দৃশ্য
১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশি অভিবাসন বাড়ে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মানুষ ব্রিটেনে আসেন।
এর পর থেকেই ঈদের চিত্র বদলাতে শুরু করে। কমিউনিটি বড় হয়। মসজিদ বাড়ে। রেস্টুরেন্ট, দোকান, সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে।
লন্ডনের ইস্ট লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার—এসব শহরে ঈদ ধীরে ধীরে বড় জমায়েতে রূপ নেয়।
মাঠে নামাজ, হাজারো মানুষের সমাগম
একসময় মসজিদে জায়গা হতো না। তাই ঈদের জামাত চলে যায় খোলা মাঠে।
এখন ব্রিটেনের বিভিন্ন পার্কে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়েন। বার্মিংহামের স্মল হিথ পার্কে লাখের কাছাকাছি মানুষ জমায়েত হওয়ার নজিরও আছে।
ঈদ এখন দৃশ্যমান, উন্মুক্ত, প্রাণবন্ত।
এক সমাজ, বহু সংস্কৃতি
ব্রিটেনের মুসলিম সমাজ এখন বহুজাতিক।
বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান, আরব—সবাই মিলে এক বড় কমিউনিটি।
ঈদের দিন এই বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। পোশাকে, খাবারে, রীতিতে।
কোথাও সেমাই আর বিরিয়ানি। কোথাও আফ্রিকান রান্না। আবার কোথাও ক্যারিবিয়ান স্বাদের খাবার। পাকিস্তানের মুসলিমরা নিজেদের খাবার ও পোশাকে বড় একটা অংশে ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বাঙালিদের ঈদ
বাঙালি প্রবাসীরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পোলাও, মাংস, সেমাই—সবই আছে।
লন্ডনের ব্রিক লেন বা বার্মিংহামের আলুম রকে ঈদের আগের রাতে ‘চাঁদ রাত’-এর আমেজ দেখা যায়।
পোশাকেও বদল এসেছে। অনেকেই এখন পাঞ্জাবি, শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ পরেন। যেন এক টুকরো বাংলাদেশ।
নেটিভ ব্রিটিশদের অংশগ্রহণ
এখন অনেক ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করছেন। তাঁরা ঈদের আয়োজনে যুক্ত হচ্ছেন।
এতে ঈদ ধীরে ধীরে মূলধারার অংশ হয়ে উঠছে।
ট্রাফালগার স্কয়ারে ঈদ
লন্ডনের Trafalgar Square-এ এখন নিয়মিত ‘Eid in the Square’ আয়োজন হয়।
এটি শুধু মুসলিমদের অনুষ্ঠান নয়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে অংশ নেন। গান, খাবার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সব মিলিয়ে এক উন্মুক্ত উৎসব।
বাস্তবতার গল্পও আছে
সব প্রবাসীর জন্য ঈদ সহজ নয়। অনেকেই ছুটি পান না। কাজের চাপ থাকে।
ছোট শহরে বড় আয়োজনও হয় না।
তবু মানুষ চেষ্টা করেন। পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে। সন্তানদের শিকড়ের গল্প শোনাতে।
প্রবাসে ঈদের মানে
ব্রিটেনে ঈদ মানে শুধু নামাজ নয়। এটি পরিচয়ের দিন। সংস্কৃতির দিন।
একই সঙ্গে মিলনের দিন। ভিন্ন দেশ, ভাষা, সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
প্রার্থনা থেকে শুরু হয়ে যে পথচলা—আজ তা এক পূর্ণাঙ্গ উৎসব।
রেফারেন্স
1. The Shah Jahan Mosque Archive
2. The National Archives (UK)
3. The East London Mosque
4. BBC News
5. Greater London Authority
6. Muslim Council of Britain (MCB)
হাসানাত কামাল- সম্পাদক, EyeNews.news
Read More: How 3.9 Million Muslims Celebrate Eid in Britain — A Story Beyond
- ডিভি লটারি আবেদনের নিয়ম
- অস্ট্রেলিয়া ওয়ার্ক ভিসা ২০২৪ আবেদন করবেন যেভাবে
- লন্ডনের ওয়ার্ক পারমিট ভিসা তথ্য ২০২৩
- ইউরোপ যাওয়ার আগে যা জানা প্রয়োজন
- বিনা খরচে জার্মানি ওয়ার্ক ভিসা ২৬ হাজার কর্মী নিচ্ছে জার্মানি
- গ্রিসে নিখোঁজের দেড় মাসেও খোঁজ মিলেনি হবিগঞ্জের ওয়াহিদ আলীর
- বিদেশে বসে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে: আমিরাতে তথ্যমন্ত্রী
- স্বচ্ছতা আনতে উন্মুক্ত লটারীর মাধ্যমে ভাতা কার্ডের তালিকা তৈরি
- মালয়েশিয়া কোম্পানি ভিসা এবং ফ্রি ভিসা সুবিধা অসুবিধা
- ৬ লাখ টাকা বেতনে আইসল্যান্ড যাওয়ার সুযোগ Ireland Work Permit Visa

























