ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৫ মে ২০২৬,   বৈশাখ ২২ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ০৫:৩৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ০৭:২৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রমা চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

একাত্তরের জননী গ্রন্থের লেখক ও বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান।

মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম, ঘরবাড়ি, নিজের সৃষ্ট সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি, সর্বোপরি সন্তান হারানো এই জীবনসংগ্রামী তিন দশকের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিক্রি করতেন নিজের লেখা বই। নিজেকে তিনি বলতেন ‘একাত্তরের জননী’।

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)।

১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন। থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। তার স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তার ঘরে। এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তার কোলে। এরপরও তাকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তার ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে দেয় তার সব সম্পদ। নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে।

আমাদের সমাজে একজন ধর্ষিতা নারী ধর্ষণের পরে নিত্য ধর্ষিত হতে থাকে প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিতে আর বাক্যবাণে। সমাজের চোখে সে একজন ধর্ষিতা। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে সম্ভ্রম হারানোর পর কেউ কেউ হয়তো সহযোগিতার হাত নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নিকটজনসহ সমাজের কাছে শুরু হল তার দ্বিতীয় দফা লাঞ্ছিত হবার পালা। পাক-হানাদারদের কাছে নির্যাতিত হবার পর সমাজের লাঞ্ছনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন রমা চৌধুরী। পোড়া দরজা-জানালাবিহীন ঘরে শীতের রাতে বস্ত্রহীন থাকতে হয়েছে মাটিতে। গরম বিছানাপত্র নেই। সব পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দিনান্তে ভাত জুটে না। অনাহারে, অর্ধহারে ঠান্ডায় দু'সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে গেল। ১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সাগরের। ছেলেকে সুস্থ করতে তখন পাগলপ্রায় দশা রমা চৌধুরী'র। গ্রামের এক সাধারণ কাক-ডাক্তার চেষ্টা চালালেন। সেই চেষ্টায় কোনও কাজ হল না। ২০ ডিসেম্বর রাতে সাগর মারা গেল। প্রথম সন্তানকে হারিয়ে রমা চৌধুরী তখন প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। একই অসুখে আক্রান্ত হল দ্বিতীয় সন্তান টগরও। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্ধউন্মাদিনী রমা চৌধুরী নিজের ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গেলেন। নিজের অসাবধানতায় কখন যে ছেলে টগরের শ্বাসরোধ হয়ে গেল, টের পেলেন না রমা চৌধুরী। এভাবে টগরও মারা গেল।

ছেলেরা মারা যাওয়ার পর তিনি জুতা পরা বাদ দেন। পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা পায়ে দেননি। খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই মহিয়সি নারী।

২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন রমা চৌধুরী। যদিও তার লেখ্যবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তার জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন।

রমা চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য, একাত্তরের জননী, স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন, শহীদদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি।

আইনিউজ/এইচএ

Green Tea
সর্বশেষ