আপডেট: ০৯:৫৭, ২০ আগস্ট ২০১৯
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান: বাংলার ইকারুসের প্রয়াণ দিবস আজ
একটি যুদ্ধে কেবল অস্ত্র নয়, অস্ত্র ছাড়াও অংশগ্রহণ করা যায় নিজের জায়গা থেকে একদম খালি হাতেও। এর জন্য দরকার হয় প্রবল দেশপ্রেম আর বুক ভরা সাহস। যার প্রমাণ বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধে দিয়েছে। আর পাকিস্তানে বসেই পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অন্যরকম এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পুরো পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলো এক বাঙালি পাইলট। তাঁর নাম মতিউর রহমান। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।
একদিকে তুমুল যুদ্ধ চলছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে অনিচ্ছা সত্তেও পাকিস্তানী বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন বাঙালি পাইলট মতিউর রহমান। কিন্তু ভেতরে ভেতরে দেশের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা। সে ইচ্ছার বাস্তবিক রূপ দিতে একটা প্ল্যান করলেন। সারাদেশে য যুদ্ধ চলছে তা বিশ্ব মহলে জানানোর দরকার ছিলো। কিন্তু কিভাবে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া যায় বাংলাদেশে যুদ্ধ চলছে, নির্বিচারে এদেশের মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে। মতিউর ভাবলেন একটা বিমান ছিনতাই করলে সেটা বিশ্ব মহলে প্রভাব ফেলবে। আর এতে করে সহজেই জানিইয়ে দেওয়া যাবে দেশের যুদ্ধাবস্তার কথা।
মতিউর রহমান ছিলেন বিমানবাহিনীর বৈমানিকদের প্রশিক্ষক। ২০ আগস্ট শুক্রবার রাশেদ মিনহাজ নামে তাঁর এক অধস্তন অফিসার একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একটি টি-৩৩ বিমান সে জন্য প্রস্তুত ছিল। মতিউর সেটা ছিনতাই করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সময় কন্ট্রোল টাওয়ারে দায়িত্বরত ছিলেন ফরিদউজ্জামান নামের একজন বাঙালি অফিসার এবং একজন পাকিস্তানি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল টাওয়ারের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর বিমানটি নিয়ে ২৭ নম্বর রানওয়েতে ঢোকার জন্য ৪ নম্বর ট্যাক্সি ট্র্যাক দিয়ে এগিয়ে যান। মতিউর তখন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে দ্রুত সেখানে চলে যান এবং রাশেদ মিনহাজকে থামার সংকেত দেন। মতিউর ছিলেন ফ্লাইট সেফটি অফিসার; কন্ট্রোল টাওয়ারের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরও ফ্লাইট সেফটি অফিসার বিমান থামানোর সংকেত দিলে সেই নির্দেশ পালন করাই নিয়ম। রাশেদ মিনহাজ ট্যাক্সি ট্র্যাকের মাঝখানে বিমানটি দাঁড় করিয়ে বিমানের ক্যানোপি তুলে মতিউরকে জিজ্ঞাসা করেন, কী হয়েছে? তখন মতিউর লাফ দিয়ে বিমানটির ককপিটে উঠে পড়েন।

তার পরের ঘটনার বিবরণ সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষ্য পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, মতিউর রাশেদ মিনহাজকে চেতনানাশক দিয়ে সংজ্ঞাহীন করে বিমানটি চালিয়ে ভারত সীমান্তের দিকে উড়ে যেতে থাকেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর রাশেদ মিনহাজ সংজ্ঞা ফিরে পান এবং দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ফলে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে দুজনই মারা যান। অন্য একটি ভাষ্যে বলা হয়, দুজনের মধ্যে শুরু থেকেই ধস্তাধস্তি চলে এবং বিমানটি একাত-ওকাত হয়ে আকাশের দিকে উঠে যেতে থাকে। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বিমানটির পাখা দুটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে দেখে রাশেদ মিনহাজকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। কিন্তু রাশেদ মিনহাজের কাছ থেকে কোনো উত্তর আসে না। বিমানটি খুব নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, সম্ভবত রাডারে ধরা পড়েনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি কন্ট্রোল টাওয়ারের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কন্ট্রোল টাওয়ার তখন বেস কমান্ডারকে বিষয়টি জানায়। তারা আশঙ্কা করে, বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুটি এফ-৮৬ জঙ্গি বিমান সেই টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমানের খোঁজে আকাশে উড়ে যায়। কিন্তু সেটির কোনো হদিস তারা পায়নি।
বিকেলের দিকে খবর আসে, ভারত সীমান্তের কাছে তালাহার নামের একটি জায়গায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে উভয় আরোহী মারা গেছেন। রাশেদ মিনহাজের দেহ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং মতিউর রহমানের দেহ অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় পাকিস্তান সরকার মিনহাজ কে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করে। তার নামে বিমান ঘাটি করা হয়। নাম করণ করা হয় অসংখ্য রাস্তার। আর আধা মাইল দূরে ছিটকে পরা, পাকিস্তান এয়ারফোর্সের সবচেয়ে মেধাবী অফিসার, ক্ষতবিক্ষত মতিউরের লাশ দাফন করা হয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দের কবরস্থানে। দেশ স্বাধীনের পর মতিউর কে দেওয়া হয় বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব।
২০০৬ সালে তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে এনে কবরস্থ করা হয়। তিনি বীর তো বটেই আমাদের ইকারুসও তিনি । গ্রিক পুরাণের ইকারুস আকাশে উড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সূর্যের তাপে পুড়ে গিয়েছিল তার পাখা। মতিউর রহমানও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উড়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নিয়তিও ইকারুসের মতো। তাই তিনি যথার্থই বাংলার ইকারুস।
[caption id="attachment_13444" align="aligncenter" width="377"]
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।[/caption]
মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯ আগা সাদেক রোডের পৈত্রিক বাড়ি "মোবারক লজ"-এ জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মতিউর ৬ষ্ঠ। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ, মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন।
[caption id="attachment_13446" align="aligncenter" width="281"]
কিশোর মতিউর।[/caption]
শিক্ষা জীবনে মতিউর ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে রিসালপুর পি,এ,এফ কলেজ থেকে কমিশন লাভ করেন এবং জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে নিযুক্ত হন। এরপর করাচির মৌরীপুরে জেট কনভার্সন কোর্স সমাপ্ত করে পেশোয়ারে গিয়ে জেটপাইলট হন।

১৯৬৫ তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার অবস্থায় কর্মরত ছিলেন। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। সেখানে ১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তারিখে একটি মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় আকাশে সেটা হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে দক্ষতার সাথে প্যারাসুট যোগে মাটিতে অবতরণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রানী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। রিসালপুরে দু'বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসাবে কাজ করার পর ১৯৭০ এ বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে। ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় ছুটিতে আসেন।
[caption id="attachment_13447" align="aligncenter" width="520"]
পরিবারের সাথে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।[/caption]
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে সর্বোচ্চ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। আজ এই বাংলার ইকারুসের প্রয়াণ দিবস।
- বেইলি রোডে আগুন : ৩ জন আটক
- এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী
- 'জাতীয় মুক্তি মঞ্চ' গঠনের ঘোষণা
- কাল থেকে যেসব শাখায় পাওয়া যাবে নতুন টাকার নোট
- এক বছরেই শক্তি, ক্ষিপ্রতা জৌলুস হারিয়ে 'হীরা' এখন বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী
- ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক
- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিকথা (প্রথম পর্ব)
- এবার ভাইরাস বিরোধী মাস্ক বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো বাংলাদেশ
- মায়েরখাবারের জন্য ভিক্ষা করছে শিশু
- ২৫ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক









