ঢাকা, শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৩ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০

ভাসানচরে খুশি রোহিঙ্গারা

ছবি: আইনিউজ

ছবি: আইনিউজ

নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ দ্বিতীয় ধাপে কক্সবাজার থেকে আরো ১ হাজার ৮শত ৪ জন রোহিঙ্গা পৌঁছেছে। আজ (মঙ্গলবার) বেলা ১টায় নৌ-বাহিনীর ছয়টি জাহাজে করে ভাসানচরে পৌঁছান তারা।

এর আগে, সকাল ৯ টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নৌবাহিনীর জেটি থেকে ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় তাদের বহনকারী জাহাজগুলো।

সুযোগ-সুবিধার কথা জেনে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের আশায় তারা ভাসানচরে স্বেচ্ছায় এসেছে। তাদের চোখে-মুখে ছিল আনন্দ, ছিল না দুশ্চিন্তার ছাপ। বেশির ভাগকেই দেখাচ্ছিল প্রাণবন্ত। পরিবার নিয়ে জাহাজে ওঠার পর নির্ধারিত আসনে বসার পর দেওয়া হয় লাইফ জ্যাকেট। জীবনে প্রথমবারের মতো লাইফ জ্যাকেট পরা ওই রোহিঙ্গাদের অনেককে এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে দেখা যায়। লাইফ জ্যাকেটে থাকা বাঁশি বাজাতে শুরু করে রোহিঙ্গা শিশুরা। তখন জাহাজে অন্য রকম এক পরিবেশ। নেই কোনো উৎকণ্ঠা। বরং সবার চোখে-মুখে আশার ছাপ।

জাহাজে মোহাম্মদ ইসমাইল নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে মিয়ানমারে জেনোসাইড থেকে প্রাণে বাঁচতে সপরিবারে কক্সবাজারে পালিয়ে এসেছিলেন। ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় এখনো মিয়ানমারে ফিরতে পারছেন না। এদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ কারণে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কক্সবাজার ছেড়ে ভাসানচরে যাওয়ার।

মো. ইউনুস নামে এক রোহিঙ্গা মাঝি জানান, ভাসানচরে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের আশায় তারা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের বলা হয়েছে, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বা তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাবেন।

দুপুরে ভাসানচরের কাছাকাছি পৌঁছার পর পর রোহিঙ্গারা উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকে তাদের সবুজ ঠিকানা। এ সময় জাহাজের প্রায় সব রোহিঙ্গাকে নিজ নিজ আসনের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নতুন আবাসস্থলের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতে ও কথাবার্তা বলতে দেখা গেছে।

মোহাম্মদ ইয়াসিন নামের এক রোহিঙ্গা তার আট বছর বয়সী মেয়েকে ভাসানচর দেখিয়ে বলছিলেন, ভাসানচরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের মতো কষ্টের জীবন হবে না। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ পাবেন— এটাই তার আশা।

ভাসানচরে নামার পর বিপুল সংখ্যক নৌবাহিনী, পুলিশ, এপিবিএন সদস্য তাদের স্বাগত জানান। হাত নেড়ে স্বাগত জানান সেখানে কর্মরত বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধিরাও।

জাহাজগুলো এক এক করে ভেড়ার পর রোহিঙ্গাদের সারিবদ্ধভাবে নামিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এরপর তাদের পাঠানো হয় ওয়্যার হাউসে। সেখানে সবাই সমবেত হওয়ার পর এক রোহিঙ্গা ইমাম দোয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। দোয়ায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও ভাসানচরে আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের মঙ্গল কামনা করা হয়।

ভাসানচরে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আসা শুরু হয়েছে। এতে তিনি আনন্দিত। তিনি আশা করেন, রোহিঙ্গারা ভাসানচরে কক্সবাজারের চেয়ে ভালো পরিবেশ পাবে। 

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসান বিষয়ক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, ২২টি এনজিও কাজ করছে। তারাই আগামী দিনে রোহিঙ্গাদের খাবারসহ অন্যান্য চাহিদা মেটাতে কাজ করবে।

বেসরকারি সংস্থা স্কাসের চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা বলেন, স্কাসসহ ২২টি এনজিও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে ২ বছর আগে তাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার।

মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা ২ ধাপে ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে আগেই ভাসানচরে রাখা হয়েছিল।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১৩ হাজার একর আয়তনের এই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন জানান, দ্বিতীয় দফায় নৌবাহিনীর ছয়টি জাহাজে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টায় নোয়াখালীর ভাসানচর এসে পৌঁছায় এক হাজার ৮ শত ৪ জন রোহিঙ্গা।

তিনি আরো জানান, ভাসানচরে আসা সকল রোহিঙ্গার প্রথমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তারপর ওয়ার হাউজে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের ব্রিফিং শেষে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ক্লাস্টারে বসবাসের জন্য তাদের পাঠানো হয়। আগামী এক সপ্তাহ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদেরকে খাবার সরবরাহ করা হবে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখানো ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, ভাসানচরের দ্বিতীয় দফার দলটি আসার পর তাদের বিশ্রাম গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর সেখানে তাদের সামনেই প্রথম দফায় যাওয়া রোহিঙ্গারা ফুটবল খেলতে নামে। 

পাশাপাশি আরেকদল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের জন্য এখানে একটি ফুটবল মাঠ, দুটো ভলিবল মাঠ, সাংস্কৃতিকর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রোহিঙ্গা শিল্পীদের পছন্দ অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়েছে।  এখানে আসার পর তাদের সুকুমার বৃত্তির চর্চার সুযোগ পেয়ে রোহিঙ্গারা আপ্লুত। তারা জানান, ক্যাম্প থেকে যাতে না আসেন সেজন্য অনেকে অনেক রকম ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু, সে ভয়কে পাত্তা না দিয়ে আগে আসা আত্মীয় স্বজনের কথা শুনে স্বেচ্ছায় তারা এসেছেন। এখানে এসে জায়গাটি দেখে তাদের খুব ভালো লাগছে।  

গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শরনার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসানচরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে একাংশ ভাসানচরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে এক হাজার ৬ শত ৪২ জন রোহিঙ্গা ভাসানচর যান।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়