ঢাকা, শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১২ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:০৬, ৯ জানুয়ারি ২০২১
আপডেট: ১২:৪৯, ১০ জানুয়ারি ২০২১

‘দিহান কখনোই আমার মেয়ের বন্ধু হতে পারে না’

অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহান

অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহান

ধর্ষণের পর হত্যার শিকার রাজধানীর ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থীর দাফন তাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের গোপালপুর কবরস্থানে সম্পন্ন হয়েছে। আজ (শনিবার) জানাজায় নিহতের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী অংশ নেয়। দাফন শেষে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে স্থানীয়রা।

এ সময় তারা ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহানের কঠোর শাস্তিসহ সংশ্লিষ্ট সবার তদন্তপূর্বক আইনের আওতায় আনার দাবি জানায়।

মেয়ের দাফন শেষে ক্ষোভের কথা জানালেন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া শিক্ষার্থীর মা-বাবা। ওই শিক্ষার্থীর বাবা মো. আল আমিন অভিযোগের সুরে বলেন, থানায় মামলা দিতে গেলে আমি বারবার বলেছি মেয়ের জন্ম ২০০৩ সালে। পাসপোর্ট দেখিয়ে বলেছি মেয়ের বয়স ১৭। কেন তাকে ১৯ বানানো হলো?’

আর মায়ের প্রশ্ন- মামলা দিতে গেলে দিহানসহ চারজনকে আসামি করার কথা বলা হয়। কিন্তু পুলিশ কেন একজনকে আসামি করল? 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কিশোরীর মা আরো বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি সিটি করপোরেশনে কর্মস্থলে চলে যান। তার স্বামীও কারখানায় চলে যান। বেলা ১১টায় মেয়ে ফোন করে জানায়, পড়াশোনার কাগজপত্র আনতে বাসার বাইরে যাবে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে সে বাইরে যায়। বেলা ১টা ১৮ মিনিটে মেয়ের ফোন থেকে দিহান পরিচয় দিয়ে এক ছেলে জানান, তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এমন কথা শোনার পর দ্রুত তার (মায়ের) এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান। 

‘বেলা দুইটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে চার ছেলেকে বসে থাকতে দেখেন। এ সময় এক ছেলে দিহান পরিচয় দিয়ে বলেন, মেয়ে তাদের বাসায় ছিল। সঙ্গে তারা চার ছেলেবন্ধু ছিলেন। এমন কথা শোনার পর বাকি তিনজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বাসায় থাকার কথা স্বীকার করেন। সে সময় বাসায় আর কেউ ছিল না বলেও জানান তারা।’

তিনি আরো বলেন, দ্রুত তিনি মেয়েকে দেখতে যান। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ মেয়েকে দেড় ঘণ্টা দেখতে দেয়নি। দেড় ঘণ্টা পর তিনি ও তার বান্ধবী মেয়ের হাত ও কোমরে কালচে দাগ দেখেন এবং সে সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।

ফারদিন ইফতেখার ওরফে দিহান সম্পর্কে কিশোরীর মা বলেন, এই ছেলেকে আগে কখনো তিনি দেখেননি। মেয়েও তাকে কোনো দিন কিছু বলেনি। জানতে পেরেছেন দিহান অন্য স্কুলের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র। সে কখনোই তার বন্ধু হতে পারে না। হয়তো ফেসবুকে যোগাযোগ করে কৌশলে তাকে (মেয়ে) বাসায় নিয়ে গেছেন।

কিশোরীর বাবা অভিযোগ করে বলেন, থানা-পুলিশকে বলা হয়েছিল, চারজনকেই আসামি করতে। কিন্তু মামলা দুর্বল হয়ে যাবে, এমন কথা বলে পুলিশ একজনকে আসামি করে। কিন্তু পুলিশ কেন এমন করল, তা বুঝতে পারছেন না। চার বন্ধুকেই আইনের আওতায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি। কিশোরীর বাবা আরো বলেন, ঘটনার দিন তার মেয়ে দুপুর ১২টা ১৯ মিনিটের দিকে তাকে ফোন দিয়েছিল। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি ফোন ধরেননি। পরে বেলা দেড়টার পর তার মা ফোন করে জানান, মেয়ে মারা গেছে। হাসপাতালে লাশ পড়ে আছে।

মা-বাবা দুজনই মেয়ের বয়স নিয়ে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিড়ম্বনায় ফেলেছে বলে অভিযোগ করেন। 

তারা বলেন, তাদের মেয়ে ২০০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছে। ‘এ’ লেভেলে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোচিং করছিল। পাসপোর্ট ও জন্মসনদ অনুযায়ী মেয়ের বয়স ১৭ বছর। মামলা দুর্বল করতে বয়স ১৯ লেখা হয়েছে। পুলিশকে বারবার বলা হয়েছে চারজনকে আসামি করতে। তবু পুলিশ একজনকে আসামি করার কথা জানায়। 

ঢাকায় ফিরে প্রয়োজন হলে আরো একটি মামলা করার কথা জানান মেয়ের মা। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে অপহরণের মামলা করা হবে। আমার ইমম্যাচিউরড (অপ্রাপ্তবয়স্ক) মেয়েকে কৌশলে তারা নিয়ে হত্যা করেছে। এটা অপহরণ ও ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড। এটা কোনো মা-বাবাই মেনে নিতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই মা-বাবা বলেন, মামলাটি যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয় এবং প্রত্যেক আসামিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার এজাহারে যা আছে-

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে ওই কিশোরীর বাবা মো. আল আমিন উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে আমার স্ত্রী ও আমি বের হই। পরে আমার মেয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় তার মাকে ফোন দিয়ে বলে সে কোচিংয়ের পেপার্স আনতে বাইরে যাচ্ছে। দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে দিহান আমার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলে আমার মেয়ে তার বাসায় গিয়েছিল। সেখানে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেছে। এ কথা শুনে আমার স্ত্রী দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে হাসপাতালে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন আমাদের মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে।

পরে আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পারি দিহান আমার মেয়েকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তার বাসায় ডেকে নেয়। দিহান ফাঁকা বাসায় আমার মেয়েকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের সময় তার শরীর দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে অচেতন হয়ে যায়। পরে ধর্ষণের ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে দিহান চালাকি করে আমার মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফরেনসিক রিপোর্টে যা উঠে এসেছে-

ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, নিপিড়নের শিকার ওই শিক্ষার্থীর যোনি ও পায়ুপথে আঘাত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা গেছে। আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু হয়েছে তার।

তিনি আরো বলেন, এছাড়াও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছে কিনা, তার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে কেমিক্যাল পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। এসব রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে।

আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন আগামী ২৬ জানুয়ারি

ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার অভিযুক্ত তানভীর ইফতেখার ফারদিন দিহানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি ধার্য করেছেন আদালত। শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম মো. মামুনুর রশিদের আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে এ দিন ধার্য করেন।

এদিকে ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত দিহান। 

ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অভিযুক্তের তিন বন্ধুকে-

ইফতেখার দিহানের তিন বন্ধুকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ বলেছে, স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ওই তিন তরুণের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। 

পুলিশের নিউমার্কেট অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আবুল হাসান জানান, প্রাথমিক তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে ফারদিনের তিন বন্ধুর হত্যায় ও ধর্ষণে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাই তাদের তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়