নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ১৭:৪৮, ১০ জানুয়ারি ২০২১
আনুশকার বয়স ১৭ আর ১৯ নিয়ে কেন জটিলতা
ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া শিক্ষার্থী ও অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহান
রাজধানীর কলাবাগানে নিহত মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনের (১৭) বয়স নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও মামলার এজাহারে দুই রকমের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে ১৯ ও এজাহারে ১৭ বছর বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে আনুশকার পরিবার ও সংবাদকর্মীদের সাঝে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।
তবে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, বিষয়টি নিয়ে জটিলতার কিছু নেই। মামলার সুরতহাল প্রতিবেদনে বয়স ১৯ উল্লেখ থাকলেও মামলার এজাহারে ঠিকই ১৭ দেওয়া হয়েছে। মামলার সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয় প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে। যেখানে আনুশকাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে তার বয়স ১৯ উল্লেখ করা হয়েছে। তা দেখেই পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদনে বয়স ১৯ উল্লেখ করেছে।
আনুশকার সুরতাহল করা কলাবাগান থানার এসআই বলেন, যেকোনো ঘটনায় পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন করে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে। এই মামলার ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে। আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমি সেখানে বয়স ১৯ উল্লেখ করেছি।
পাশাপাশি ময়নাতদন্তের মাধ্যমে তার প্রকৃত বয়স নির্ধারণের জন্য চিকিৎসকের মতামত চাওয়া হয়েছে। এছাড়াও তিনি গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, ভেজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ পরীক্ষা, ভিকটিমের ডিএনএ টেস্ট ও ঘটনার সময় আনুশকাকে মাদক জাতীয় কোন কিছু খাওয়ানো হয়েছিলো কিনা তারও পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, সুরতহাল করা হয়েছে ঘটনার দিন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে। ওইদিন রাতেই মামলা করা হয়। মামলার সময়ে আনুশকার অভিভাবকরা তার বয়স নির্ণয়ের জন্য পাসপোর্ট নিয়ে আসলে সেই অনুযায়ীই বয়স ১৭ উল্লেখ করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এটাই সঠিক বয়স বলে ধরা হবে।
এদিকে, গত শুক্রবার আনুশকারের বয়স জটিলতার বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, বয়স নির্ধারণের জন্য আমরা এক্স-রে বিভাগে পাঠিয়েছি। শুক্রবার এই বিভাগ বন্ধ থাকায় পুলিশ জানিয়েছে সেটা করতে পারেনি। যেহেতু এক্স-রে হয়নি তাই তার বডির (শরীর) গঠন দেখে, দাঁত দেখে এবং তার যে ডকুমেন্ট আছে সেগুলো দেখে আমরা একটা বয়স নির্ধারণ করতে পারবো। এখানে একটা ক্যালকুলেশনের ব্যাপার আছে। এখনই আমরা এ বিষয়ে বলবো না।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত সার্টিফিকেটে বয়স কম থাকে, এক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণ কিভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাজ হলো তার প্রকৃত বয়সটা বের করা। যেহেতু আমরা এক্স-রে করতে পারিনি, তাই কিছু মাইলফলক আছে সেগুলো দেখে, তার ডকুমেন্টগুলো নিয়ে আমরা একটা বয়স বলতে পারবো।
এদিকে, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার অভিযুক্ত তানভীর ইফতেখার ফারদিন দিহানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি ধার্য করেছেন আদালত। শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম মো. মামুনুর রশিদের আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে এ দিন ধার্য করেন। ওই দিনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত দিহান।
প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। পুলিশের তদন্ত সূত্রে জানা যায়, প্রায় আড়াই মাস আগে আনুশকা ও দিহানের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে তারা বাইরে দেখা-সাক্ষাৎও করেছেন। যার প্রমাণ এরইমধ্যে পুলিশ সংগ্রহ করেছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা প্রায় সারাক্ষণই কথা বলতেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় দিহানের তিন বন্ধুকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে পুলিশের নিউমার্কেট অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে ফারদিনের তিন বন্ধুর হত্যায় ও ধর্ষণে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাই তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
রমনা জোনের উপ-পুলিশ (ডিসি) কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আসামি দিহানও আদালতে বলেছে তার তিন বন্ধু এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। আসামি নিজেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রাথমিকভাবে দিহানের তিন বন্ধুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই শুক্রবার রাতেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে যেকোনো তথ্যের জন্য জিজ্ঞাসাবাদে তাদের ডাকা হতে পারে বলেও জানান সাজ্জাদ হোসেন।
এই তিনজনকে ছেড়ে দেওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে আনুশকার পরিবার। তাদের দাবি এ ঘটনায় ওই তিনজনও জড়িত। এ ব্যাপারে আনুশকার বাবা আল আমিন আহম্মেদ বলেন, ওই তিনজন আমার স্ত্রীরে কাছে বলেছে তারা সেখানে ছিলো। অথচ পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশের সূত্র বলছে, এই ঘটনায় ওই তিনজন জড়িত না। ঘটনার পর আনুশকা জ্ঞান হারিয়ে ফেললে দিহান তার মুখে ও মাথায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানো চেষ্টা করে। এরপরও জ্ঞান না ফিরলে সে আনুশকাকে নিয়ে নিচে নেমে দারোয়ানের সহযোগিতায় তাকে গাড়িতে তোলে। এরপর গাড়িতে বসেই ওই তিনজনকে ফোন দিয়ে হাসপাতালে আসতে বলে। আর আনুশকার এক বান্ধবীকে ফোন দিয়ে তার মায়ের নম্বর নেয়। পরে তাকে (আনুশকার মা) ফোনে জানায়, আপনার মেয়ে অসুস্থ, সে আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে আছে।
পুলিশের সূত্র বলছে, কল লিস্টের সূত্র ধরে তারা এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
কিন্তু আনুশকার মা ও পরিবারের দাবি, আনুশকার নাম্বার থেকেই তার মা’কে ফোন করা হয়েছে। অথচ মামলার এজাহারেও উল্লেখ আছে, দিহান নিজের নম্বর থেকে ফোন দিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে আনুশকার বাবা বলেন, কোথাও একটা প্রবলেম হচ্ছে, সেটা কোথায় হচ্ছে তা বুঝতেছি না।
আনুশকার বাবা আল আমিন আহম্মেদ অভিযোগ করে বলেন, ১৬ জানুয়ারির মধ্যে চিকিৎসককে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দিতে বলেছেন আদালত। পুলিশ আমার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। যেহেতু পুলিশ বলেছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দিহানের তিন বন্ধুর সংশ্লিষ্টতা পেলে তাদেরকেও আসামি করা হবে, তাই তাদেরকে বাদ দিয়ে ফরেনসিক রিপোর্ট করার জন্য তদবির করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে ওই কিশোরীর বাবা মো. আল আমিন উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে আমার স্ত্রী ও আমি বের হই। পরে আমার মেয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় তার মাকে ফোন দিয়ে বলে সে কোচিংয়ের পেপার্স আনতে বাইরে যাচ্ছে। দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে দিহান আমার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলে আমার মেয়ে তার বাসায় গিয়েছিল। সেখানে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেছে। এ কথা শুনে আমার স্ত্রী দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে হাসপাতালে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন আমাদের মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে।
পরে আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পারি দিহান আমার মেয়েকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তার বাসায় ডেকে নেয়। দিহান ফাঁকা বাসায় আমার মেয়েকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের সময় তার শরীর দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে অচেতন হয়ে যায়। পরে ধর্ষণের ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে দিহান চালাকি করে আমার মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, নিপিড়নের শিকার ওই শিক্ষার্থীর যোনি ও পায়ুপথে আঘাত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা গেছে। আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু হয়েছে তার।
তিনি আরো বলেন, এছাড়াও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছে কিনা, তার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে কেমিক্যাল পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। এসব রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে।
- বেইলি রোডে আগুন : ৩ জন আটক
- এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী
- 'জাতীয় মুক্তি মঞ্চ' গঠনের ঘোষণা
- কাল থেকে যেসব শাখায় পাওয়া যাবে নতুন টাকার নোট
- এক বছরেই শক্তি, ক্ষিপ্রতা জৌলুস হারিয়ে 'হীরা' এখন বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী
- ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক
- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিকথা (প্রথম পর্ব)
- এবার ভাইরাস বিরোধী মাস্ক বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো বাংলাদেশ
- মায়েরখাবারের জন্য ভিক্ষা করছে শিশু
- ২৫ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক
























