ঢাকা, শনিবার   ১৩ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪৩৩

সীমান্ত দাস

প্রকাশিত: ১২:২৬, ৯ আগস্ট ২০২১
আপডেট: ১৩:৩৬, ৯ আগস্ট ২০২১

বিশ্ব আদিবাসী দিবস

আত্মপরিচয় হারাতে বসেছে চা শ্রমিক আদিবাসীরা

নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা থেকে সরে যাচ্ছে চা বাগানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। দারিদ্র্যতা অসচেতনতা এবং বিচ্ছিন্নভাবে চা বাগানগুলোতে বসবাসের কারনে নিজেদের ভাষা ও কৃষ্ঠি জানেনা এ প্রজন্মের অনেকেই। চা বাগানে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাথে সহাবস্থানের কারনে ’চা শ্রমিক’ হিসেবে তাদের পরিচয় তৈরী হয়েছে। যার কারনে তাদের নৃতাত্বিক পরিচয় পড়ে যাচ্ছে আড়ালে। 

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, রাজনগরসহ ৭টি উপজেলায় ৯২টি চা বাগান রয়েছে। আর এসব চা বাগানে চা শ্রমিক হিসেবে মুণ্ডা, সাঁওতাল, ওঁড়াও, মাহালি, শবর, পাসি, রবিদাস, হাজরা, নায়েক, বাউরি, তেলেগু, তাঁতি, কৈরী, দেশওয়ারা, বর্মা, কানু, পানিকা, কুর্মী, চাষা, অলমিক, মোদি, তেলি, পাত্র, মাঝি, রাজবংশী, মোদক, বাড়াইক, ভূমিজসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করেন। 

এদের অধিকাংশ মানুষ অতি দরিদ্র শ্রেণিতে বসবাসের কারনে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা সম্ভব হয়না। নিজেদের ভাষা কৃষ্ঠি ও সংস্কৃতি চর্চা কমে আসায় নিজেদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় পড়েছে সংকটে। আর্থ সামাজিক অবস্থার কারনেও তারা তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধরে রাখতে পারছেনা।

চা শ্রমিকেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূজপুরী ভাষায় কথা বলেন। যার ফলে নিজেদের ভাষা ব্যাবহারের ক্ষেত্র কমে গেছে। 

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের বয়ো মুণ্ডা জানান, ছেলেমেয়েরা এখন মুণ্ডা ভাষা শিখতে চায়না। পরিবারে থাকলে দু’একটি কথা বলে কিন্তু বাইরে গেলে বাংলা ভাষাতেই কথা বলে। মিরতিংগা চা বাগানের আদিবাসী মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর মেয়ে সাবি’র সাথে কথা হয়।

সাবি জানায়, সে স্থানীয় কমলগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। মা মারা গেছেন অনেক আগে। চা শ্রমিক বাবার অল্প আয়ে চলেনা তাদের পাঁচ জনের সংসার। তাই মাটি কাটা কখনো ইট ভাঙার কাজ করে নিজের পড়ালেখার খরচ যোগায় সে। সংসার চালাতেও সহযোগীতা করে সে। সে জানেনা নিজের আত্মপরিচয়, ভাষা কৃষ্ঠি ও সংস্কৃতি।

শুধু সাবি নয় এই অবস্থা তার বান্ধবী দিপালী মুণ্ডারও। দিপালী জানায়, তাদের আলাদা সংস্কৃতি কী তা সে জানেনা। সবার সাথে যে ভাষায় (বাংলা ও ভূজপুরী ভাষায় মিশ্রণ) কথা বলে পরিবারেও সে ভাষায়ই কথা বলে। নিজেদের কোন ভাষা আছে সে তা জানেনা।

কমলগঞ্জ উপজেলার দেওরাছড়া চা বাগানের অর্জুন ওঁড়াও জানান, তাদের নামের পরে তারা পদবী লিখেন উড়াং। আসলে যে তারা আদিবাসী ওঁড়াও এটা তিনি জেনেছেন কয়েক দিন আগে তাদের সমাজের এক সভায়।

একই বাগানের সত্যজিৎ ওঁড়াও জানান, ওঁড়াও না উড়াং তা নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা নেই। টিকে থাকতে তাদের সংগ্রাম করতে করতেই জীবন পার হচ্ছে অন্য কিছু ভাবার সময় নেই তাদের।

সাঁওতাল মেয়ে মমতা জানায়, দেওরাছড়া চা বাগানে তারা মাত্র কয়েকটি পরিবার বাস করে। এখানে তারা সংখ্যায় অল্প বলে নিজেদের অনুষ্ঠাদি তেমন হয়না। যার ফলে তারা তেমন কিছু শিখতে পারছেনা। সে আরো জানায়, সাঁওতালি কিছু নাচ সে জানে তবে তাদের ভাষা সে জানেনা। 

চা শ্রমিক আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন লোক গবেষক আহমদ সিরাজ। তিনি বলেন, ’তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গেছে এখন অনেকে তাদের আত্মপরিচয় যেমন ভুলেছে তেমনি অনেকে আত্মপরিচয় গোপন করছে বাধ্য হয়েই। কারন আদিবাসী চা জনগোষ্ঠীর মানুষ সমাজের মূলস্রোত হবে বিচ্ছিন্ন। তারা সংখ্যালঘু ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং সমাজে তাদের খাটো করে দেখার জন্য তারা ভাবে এই সমাজে তারা গ্রহণীয় নয়। তাই অনেকেই নিজেদের পরিচয় গোপন করছেন। যেমন দলিত নৃগোষ্ঠী শব্দকর সমাজের অনেকেই এখন ’শব্দ’ বাদ দিয়ে শুধু ’কর’ লিখেন। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রায় সকল সূচকে পিছিয়ে পড়া এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সংঘটিতভাবে তাদের জীবন চর্চা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যকে লালন করার মাধ্যমে এরা রক্ষা পাবে। আর এই দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।’

এই বিষয়ে জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা জ্যোতি সিনহা বলেন, ’তাদের ভাষা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে পারলে তাদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এজন্য সরকারের কিছু উদ্যোগ রয়েছে। আমার জেলার সকল ক্ষুদ্র জাতীগোষ্ঠীর মানুষকে একত্রিত করে আগামীতে অনুষ্ঠান আয়োজন করবো যাতে তারা নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে। আর তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সরকার ব্যাবস্থা নিচ্ছে। আমরা তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছি।’

গবেষকরা বলছেন তাদের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষা করতে হলে এখনি এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে নয়তো একসময় তাদের আসল পরিচয় হারিয়ে যেতে পারে। আর এদের রক্ষা করতে না পারলে আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র ও একদিন হারিয়ে যাবে।

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়