ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৭ জানুয়ারি ২০২২,   মাঘ ১৩ ১৪২৮

জীবন পাল

প্রকাশিত: ২২:৫০, ১৪ জানুয়ারি ২০২২
আপডেট: ২২:৫২, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

‘সংক্রান্তিতে অন্যদের বাড়িতে গিয়ে পিঠা খাওয়ার মধ্যেই বেশি আনন্দ’

পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মায়ের সাথে মিলে মালপোয়া, মুগপাকন, বকফুল, সবজিপুলি, দুধপুলি, সুজিপিঠা, চিড়ার লাড়ু, মুড়ির লাড়ু ও তিলের লাড়ু বানিয়েছে পুনম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মা-মেয়ে মিলে হরেক রকমের পিঠা বানিয়েছে তারা।

সংক্রান্তি নিয়ে নিজেদের অভিমত প্রকাশ করেছেন মা-মেয়ে দুজনেই। পুনমের মা পুস্পা পাল মনে করেন, ‘নিয়ম তো তাই মানতে হচ্ছে। পালন করতে হচ্ছে। তবে মকর সংক্রান্তির এই উৎসবটা আগে ভাল লাগতো। এখন ভাল লাগেনা। এখন ঝামেলা মনে হয়। সামাজিকতা রক্ষায় বাধ্য হয়ে করা আরকি। এই উৎসবের আনন্দটা ভাল করেই উপভোগ করতে পেরেছিলাম সেই ছোটবেলাতেই।’

মায়ের অভিমত শেষে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেছে নবম শ্রেণির ছাত্রী পুনম পাল। পুনমের মতে, ‘পিঠা বানিয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের বাসায় বাসায় পিঠা পাঠানোর মধ্যেই তার আনন্দ। সংক্রান্তির সময় পিঠা বানিয়ে নিজে খাওয়ার চাইতে বন্ধুদেরকে বাসায় নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে তার বেশি ভাল লাগে।’ 

আরও পড়ুন- পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব

সংক্রান্তিকে পিঠা খাওয়ার উৎসব মনে করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী বন্যা বৈদ্য। দিনটি কিভাবে উদযাপন করলো জানতে চাইলে বন্যা জানায়, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে তৈরি মেরামেরির ঘরে আগুন জ্বালিয়ে পিঠা খেয়েছি। তারপর আশেপাশের বাড়িতে পিঠা বিতরণ করেছি। বান্ধবীর বাসায় পিঠা খেতে গিয়েছি। বাসায় ফিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছি।’

পৌষ সংক্রান্তি নিয়ে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করতে গিয়ে যমুনা টেলিভিশনের সহকারী প্রযোজক তৌহিদুল ইসলাম তুষার বলেন, ‘বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব পৌষ সংক্রান্তি পৌষের সমাপনী দিনে উদযাপিত হয়। একই দিনে পুরান ঢাকা মাতে সাকরাইন উৎসবে।’

সিলেটসহ কিছু কিছু অঞ্চলে সংক্রান্তিকে পিঠা উৎসব হিসেবে মহাসাড়ম্বরে পালন করা হয়ে থাকে। বাড়িতে বাড়িতে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। সকাল থেকে পিঠা খাওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবটি পালন করা হয়ে থাকে।

ক্যাফে লকডাউন টি এন্ড ফাস্টফুড এর পরিচালক নাইমুল ইসলাম সুমনকে তার দোকানে গিয়ে পিঠা খেতে দেখা গেল। পিঠা খেতে খেতে সুমনের মন্তব্য, ‘পাড়া প্রতিবেশীরা সংক্রান্তির পিঠা পাঠিয়েছেন।  প্রতি বছরই আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশীরা বিভিন্ন ধরনের পিঠা বানিয়ে এভাবে পাঠিয়ে থাকেন। 

আরও পড়ুন- রাজনগর থানার ওসির বিরুদ্ধে পতাকা অবমাননার অভিযোগ

সংক্রান্তি উৎসবের কথা বলতে গিয়ে সুমন বলেন, আসলে সংক্রান্তিটা এখন আর একটি ধর্মের অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজকে আমার বাসাতেও পিঠা বানানো হয়েছে। মূলত পিঠা উৎসব মনে করেই অধিকাংশ মানুষ পিঠা বানিয়ে থাকেন।

তাছাড়া পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে আমাদের এখানে যে মাছের মেলা হয়ে থাকে সেই মেলাটাও কিন্তু এখন আর কোন ধর্মের উৎসবের মেলার অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।  সব ধর্মের মানুষই কিন্তু মেলা থেকে মাছ ক্রয় করে থাকেন। 

এদিকে সারাদিন ব্যস্ত থাকায় সন্ধ্যার পর  ১২ বছর বয়সী মেয়ে তৃপ্তি একটি হটপটে করে গরম গরম পিঠা নিয়ে এসেছে পুনমদের জন্য। সারাদিন ব্যস্ত থাকার কারণে সন্ধ্যার পর নিজ হাতে পিঠা বানিয়ে এভাবেই মেয়ের হাতে প্রতিবেশীদের জন্য সংক্রান্তির পিঠা পাঠাচ্ছেন তৃপ্তির মা। 

ফেলে আসা দিনের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাসন্তী জানান, ‘বিয়ের আগে বাবার বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে সংক্রান্তিটা বেশ উপভোগ করেছি। রাতে সবাইকে নিয়ে পিকনিক করছি। রাত জেগে পিঠা বানিয়েছি। যা এখন বিয়ের পর সম্ভব হচ্ছেনা। ছোট বাচ্চাকে নিয়ে সেসব করা সম্ভব হয়না। সত্য কথা বলতে গেলে সেই দিনগুলোর মত ইচ্ছেও করেনা।’

সংক্রান্তি উপলক্ষে সকলের বাসা থেকে নিমন্ত্রণ পাওয়াটার মধ্যেই বেশি আনন্দ বলে মনে করে রাজেশ। 

সংক্রান্তি উপলক্ষে কেমন পিঠা খাওয়া হলো,কোন ধরনের পিঠা বেশি পছন্দ এমন প্রশ্ন করা হলে রাজেশ জানায়, ‘মিষ্টি পিঠার চাইতে ঝাল পিঠাটাই আমার কাছে বেশি প্রিয়। সকালে মাসির বাসায় গিয়ে পাটিসাপটা খেয়েছি। নিজের বাসায় মালপোয়া, ঝালপিঠা,বকফুলসহ আরো কয়েক আইটেমের পিঠা খেয়েছি। তবে নিজের বাসার চাইতে মানুষের বাসায় বাসায় গিয়ে পিঠা খাওয়ার মধ্যে আমি বেশি আনন্দ খুঁজে পাই।’

উল্লেখ্য, মকরসংক্রান্তি’ শব্দটি দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী, ‘সংক্রান্তি’ একটি সংস্কৃত শব্দ। এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। ১২টি রাশি অনুযায়ী এরকম সর্বমোট ১২টি সংক্রান্তি রয়েছে।

আরও পড়ুন- প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থক হওয়ায় জন্মনিবন্ধনে স্বাক্ষর করছেন না মেম্বার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তিতে মূলত নতুন ফসলের উৎসব ‘পৌষ পার্বণ’ উদযাপিত হয়। নতুন ধান, খেঁজুরের গুড় ও পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় চালের গুঁড়া, নারিকেল, দুধ আর খেঁজুরের গুড়। 

মকর সংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পঞ্জিকা মতে, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়। এই দিনে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত সাগরদ্বীপে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সহস্রাধিক পুণ্যার্থী ও অন্যান্য রাজ্য থেকে আগত দর্শনার্থীদের সমাগম হয় এই মেলায়।

এদিকে,বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে পৌষ মাসের শেষ দিনটি কোথাও কোথাও মকর সংক্রান্তি হিসেবেও পালন করা হয়। গ্রাম বাংলায় এই উৎসবে বাড়িতে বাড়িতে পিঠার আয়োজন করা হয় আগে থেকেই। আয়োজন করা হয় ঘুড়ি উৎসবেরও। এই সংক্রান্তিতে মেলাও হয়।

পৌষ বিদায় নিচ্ছে। আর শুক্রবার এই পৌষের সমাপনী দিনে উদযাপিত হচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব পৌষ সংক্রান্তি। একই দিনে পুরান ঢাকা মাতবে সাকরাইন উৎসবে। অনেক আগে থেকেই পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয় দিনটি।  মুঘল আমল থেকে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। উৎসবে অংশ নেন সবাই। পুরান ঢাকা এলাকার মানুষ এ উৎসবে দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়ান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে বাড়তে থাকে ঘুড়ির সংখ্যা, বাড়ে উৎসবের রঙ। সব মিলিয়ে রঙিন ঘুড়িতে ছেয়ে যায় ঢাকার আকাশ। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোর পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে উৎসবের সমাপ্তি করা হয়।

আইনিউজ/জীবন পাল/এসডিপি 

আইনিউজ ভিডিও

ওমিক্রন এক চেনা উদ্বেগ, করোনাভাইরাসের `ভয়াবহ` ভ্যারিয়েন্ট

যেসব দেশে যেতে বাংলাদেশিদের লাগবে না ভিসা

সাজেক: কখন-কীভাবে যাবেন, কী করবেন? জেনে নিন বিস্তারিত

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়