ঢাকা, রোববার   ১৭ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ২ ১৪২৮

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:০০, ২৬ জুলাই ২০২১
আপডেট: ০০:৩৯, ২৭ জুলাই ২০২১

মধ্যনগর নিয়ে সুনামগঞ্জ এখন ১২ উপজেলার জেলা

সুনামগঞ্জের মধ্যনগরকে নতুন উপজেলার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে ১২ উপজেলার জেলা এখন সুনামগঞ্জ। এর মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরবাসীর দুই দশকের দাবি পূরণ হলো। 

সোমবার (২৬ জুলাই) সুনামগঞ্জের মধ্যনগরকে নতুন উপজেলা হিসেবে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

সুনামগঞ্জের উত্তর-পশ্চিম অংশের ২২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন ও প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিয়ে মধ্যনগর এলাকা। বিগত দুই দশক ধরে মধ্যনগরবাসীর স্বপ্ন ছিলো এটিকে উপজেলায় উন্নীত করার। সরকারের এ সিদ্ধান্তে তাদের এই স্বপ্ন পূরণ হলো, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তারা। 

তাৎক্ষণিকভাবে মধ্যনগরবাসীরা এই সিদ্ধান্তে শহরের রাস্তায় আনন্দ মিছিল করেছেন বলেও জানা গেছে। একইসাথে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও স্থানীয় এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে ধন্যবাদ জানান।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, তিনটি নতুন উপজেলার সঙ্গে একটি উপজেলার নাম পরিবর্তন, একটি সিটি কর্পোরেশন, দুটি পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা হলো ৪৯৫টি।

দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকটি হয়। গণভবন প্রান্ত থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যরা যুক্ত হন সচিবালয় থেকে।

সুনামগঞ্জের নতুন উপজেলা মধ্যনগরের বিষয়ে বৈঠকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার নাম পরিবর্তন করে 'শান্তিগঞ্জ' নামকরণ করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলার পরিচিতি

সুনামগঞ্জ জেলা

আয়তন: ৩,৬৬৯.৫৮ বর্গ কিমি। অবস্থান: ২৪°৩৪´ থেকে ২৫°১২´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°৫৬´ থেকে ৯১°৪৯´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। সীমানা: উত্তরে মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা, পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলা। ১৮৭৭ সুনামগঞ্জ মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা জেলায় রূপান্তর করা হয়। পৌরসভা গঠিত হয় ১৯৬০ সালে। জেলার এগারটি উপজেলার মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলা সর্ববৃহৎ (৪৯৬.০৩ বর্গ কিমি) এবং সবচেয়ে ছোট উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর (১৯৪.২৫ বর্গ কিমি)।

জনসংখ্যা 

২০১৩৭৩৮; পুরুষ ১০৩৬৬৭৮, মহিলা ৯৭৭০৬০। মুসলিম ১৭১৫০৩৩, হিন্দু ২৯৪৭৬৫, বৌদ্ধ ২৮৪৩, খ্রিস্টান ১৩৬ এবং অন্যান্য ৯৬১। এ জেলায় মনিপুরী, খাসিয়া, হাজং, গারো প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।

নামকরণ

‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামক উক্ত মোগল সৈন্যের কোন এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুনামদিকে এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসাবে দান করা হয়। তাঁর দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তাঁরই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল। এভাবে সুনামগঞ্জ নামের ও স্থানের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।

ইতিহাসের সন – গতিধারায় সুনামগঞ্জের ইতিহাস

  • ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দ মুবারক দৌলা মালিক লাউরের উজির হন
  • ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ খাসিয়া কর্তৃক সেলবরষ, রামধীঘা ও বংশীকুন্ডা পরগনা আক্রমণ ও ৩০০ লোক হত্যা
  • ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ ছাতকে ইংলিশ কোম্পানি স্থাপন
  • ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ দশসনা বন্দোবস্ত
  • ১৭৮৮-৯০ খ্রিস্টাব্দ হস্তবোধ জরিপ
  • ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
  • ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ মরমী কবি রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের জন্ম
  • ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ মরমী কবি হাছন রাজার জন্ম
  • ১৮৬০-৬৬ খ্রিস্টাব্দ থাকবাস্ত জরিপ
  • ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ বৃহত্তর সিলেট জেলাকে আসামের অন্তর্ভূক্ত করণ
  • ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ মহকুমা স্থাপন
  • ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ সদর থানা স্থাপন
  • ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
  • ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ ভয়াবহ ভূমিকম্প
  • ১৯০২ খ্রিস্টাব্দ গৌরীপুর জমিদার কর্তৃক ছাতকের ইংলিশ কোম্পানি ক্রয়
  • ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ বঙ্গভঙ্গ
  • ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ বঙ্গভঙ্গ রোধ
  • ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ মরমী কবি রাধারমণ দত্তের মৃত্যু
  • ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ শাল্লা থানা স্থাপন ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রতিষ্ঠা
  • ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ মরমী কবি হাছন রাজার মৃত্যু, ছাতক ও জগন্নাথপুর থানা স্থাপন
  • ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ সিলেট প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন
  • ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ জামালগঞ্জ থানা স্থাপন ও ছাতক সিমেন্ট কারখানা প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ দিরাই, তাহিরপুর ও ধর্মপাশা থানা স্থাপন
  • ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ সাধারণ নির্বাচন
  • ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ গণভোট ও দেশ বিভাগ
  • ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ পূর্ববাংলা প্রজাস্বত্ব আইন ও জমিদারী প্রথা বিলোপ
  • ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও ছাতকে রেল লাইন প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ মহকুমা আইনজীবী সমিতি প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ স্বাধীনতা লাভ
  • ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুর থানা স্থাপন
  • ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ অফিসার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ সুনামগঞ্জ মহকুমা জেলায় উন্নীত
  • ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ সিলেট বিভাগ এর কার্যক্রম শুরু
  • ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানা স্থাপন

ইতিহাস

সুনামগঞ্জের ইতিহাস অতি প্রাচীন। অসংখ্য কিংবদন্তী এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও তথ্যাবলীতে সমৃদ্ধ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সুনামগঞ্জের লাউড় পরগনায় এখনো প্রবাদ হিসেবে কথিত আছে লাউড় পাহাড়ের উপরই কামরূপের রাজা ‘ভগদত্তের’ রাজধানী ছিল। এ ভগদত্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন বলেও কিংবদন্তী রয়েছে। টাংগাইলের মধুপুর বনেও উক্ত রাজবাড়ীর চিহ্ন ছিল বলে জানা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এ ভগদত্ত ও মহাভারতের ভগদত্ত এক ব্যক্তি নন, বরং কথিত ভগদত্ত মহাভারতের অনেক পরের কালের মানুষ। এটাই সত্য। কারণ কিংবদন্তী ও ইতিহাস যেখানে মিল হবে না সেখানে ইতিহাস ভিত্তি ধরাই বিধেয়।

বৃহত্তর সিলেট সুদূর অতীতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এ রাজ্যগুলো হচ্ছে লাউড়, গৌড় ও জয়ন্তিয়া। অনুমান করা হয়, এ লাউড় রাজ্যের সীমানা বর্তমান সমগ্র সুনামগঞ্জ জেলা ও ময়মনসিংহ জেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে গঠিত ছিল। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল লাউড়। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া নামে পরিচিতি গ্রামে লাউড়ের রাজা বিজয় সিংহের বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে এটি হাবেলী (হাওলী) নামে পরিচিতি।

লাউড় রাজ্যের নৌঘাঁটি ছিল দিনারপুর নামক স্থানে। এটি বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। রাজধানী লাউড় থেকে নৌঘাঁটি পর্যন্ত সারা বছর চলাচল উপযোগী একটি ট্রাংক রোডের অস্তিত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের সমর্থন পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জের তদানীন্তন ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব স্কুলস জনাব মুহাম্মদ ওয়াসিল উক্ত ট্রাংক রোডের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ তথ্য উদঘাটন করেছিলেন। মনে করা হয় লাউড় অধিপতি কর্তৃক এ ট্রাংক রোডটি নৌঘাঁটিতে সংযোগ স্থাপনের জন্যই নির্মিত হয়েছিল।

অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার বেশীর ভাগ অঞ্চল এককালে একটি সাগরের বুকে নিমজ্জিত ছিল যা কালে কালে পলি ভরাট জনিত কারণে ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সূত্র ধরে ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জের ভূগর্ভে চুনা পাথরের খনি ও কয়লা আবিষ্কারের ফলে এরূপ চিন্তার সক্রিয় সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া এখানকার শত শত হাওরের গঠন প্রকৃতি (basin type) বিশ্লেষণ করেও এ মতের সমর্থন দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট প্রাপ্ত চুনাপাথর এক ধরণের ক্যালসিয়াম যা সামুদ্রিক প্রাচীন শামুক ও শৈবাল দ্বারা সৃষ্ট। এতেও পূর্বোক্ত ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক যোগ সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রায় সব ঐতিহাসিক সূত্র মতে, সুনামগঞ্জের বিশাল ভূখণ্ড যে সাগর বক্ষ থেকে জেগে উঠেছে সে সাগরকে ‘কালিদহ’ সাগর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কালিদহ সাগর সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র খান বাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক রোজনামচাতেও এর উল্লেখ রয়েছে; রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক গান, পালা-পার্বণের অনুষ্ঠানগুলিতেও।

সিলেটের কালেক্টর মিঃ লিন্ডসের অষ্টাদশ শতাব্দীতে লিখিত বর্ণনা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন- “In the pre Historic days the southern part of Sadar Subdivision and the northern part of Moulivibazar and Habiganj Subdivision and nearly the entire Sunamganj Subdivision were a part of Bay of Bengal.”

হাওর শব্দটি সায়র (সাগর) থেকে এসেছে। বর্ষাকালে সুনামগঞ্জের হাওরগুলো এখনো সে রূপই ধারণ করে। সুদূর অতীতে এই কালিদহ সাগর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার উপর দিয়ে ১০১১ খ্রিষ্টাব্দে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং জাহাজে করে সরাসরি তাম্রলিপ্ত থেকে সিলেট পৌঁছেছিলেন বলে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়। তাঁর মতে, নহরী আজরক নামে একটি নদী কামরূপের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে হাবাং শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদী দিয়ে বাংলা ও গৌড়ে যাওয়া যেত। এ নদীকে প্রাচীন সুরমা বলে ঐতিহাসিকরা মনে করে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি

১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল ছাতক উপজেলায় পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং ১১ জন আহত হন। ২৯ জুলাই জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১২ আগস্ট তেলিয়া গ্রামে পাকসেনারা ৮ জন সাধারণ লোককে হত্যা করে। ২৫ আগস্ট দিরাই উপজেলায় পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ২ জন আহত হন। ৩১ আগস্ট জগন্নাথপুর উপজেলায় শান্তি সভার নামে রাজাকাররা শ্রীরামসী হাইস্কুলে স্থানীয় শিক্ষক, কর্মচারী, ইউপি সদস্যসহ গণ্যমান্য ও সাধারণ লোকজনের একটি সমাবেশের আয়োজন করে। রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা উক্ত সভার ১২৬ জন লোককে হত্যা করে এবং গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়। এছাড়া ৮ সেপ্টেম্বর পাকসেনারা এ উপজেলার রাণীগঞ্জ বাজারে ৩০ জন লোককে হত্যা করে এবং ১৫০ টি দোকান জ্বালিয়ে দেয়। সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজ ও আহসানমারা ফেরী ঘাট এলাকায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ চলাকালে পাকবাহিনীর আক্রমণে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মঙ্গলকাটার কৃষ্ণনগরে ৪৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ডলুরায় তাদের সমাহিত করা হয়। ৭ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা শত্রু-মুক্ত হয়।

প্রধান নদী

  • সুরমা, কুশিয়ারা, ধামালিয়া, যাদুকাটা, বাগড়া, ডাহুকা, সোমেশ্বরী, বাউলী।

বধ্যভূমি

  • ৩ (জগন্নাথপুরের শ্রীরামসী, রাণীগঞ্জ), গণকবর: ৪ টি।

স্মৃতিফলক

  •  ৩ (১৯৮০ সালে শ্রীরামসীতে নির্মিত স্মৃতিফলক, ১৯৮৯ সালে রাণীগঞ্জে স্মৃতিফলক),

স্মৃতিস্তম্ভ

  • ৫ (ছাতকের শিখা সতের ও স্মৃতিসৌধ)।

শিক্ষার হার

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৩৪.৪%; পুরুষ ৩৮.১%, মহিলা ৩০.৫%। পি টি আই ১, কলেজ ৩০, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৬৮, প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০৫০, কারিগরি স্কুল ৫, কিন্ডার গার্টেন ২০, কমিউনিটি বিদ্যালয় ৭২, মাদ্রাসা ১৬৫।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:

সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ (১৯৪৪), সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ (১৯৮৪), জয়নাল আবেদীন মহাবিদ্যালয় (১৯৯২), সাল্লা মহাবিদ্যালয় (১৯৮৬), জামালগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ (১৯৮৫), বড়খাল বহুমূখী স্কুল ও কলেজ (১৯৭০), বাদশাগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ (১৯৯৪), মধ্যনগর বিপি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ (১৯৫২), দিরাই ডিগ্রী মহাবিদ্যালয় (১৯৭৯), ছাতক ডিগ্রী কলেজ (১৯৭২), ছাতক টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৯৮১), দিগেন্দ্রবর্মন কলেজ (১৯৯২), জগন্নাথপুর মহাবিদ্যালয়, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৮৭), জয়কলস উজানীগাঁও রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৬), তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫০), সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪০), জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪৮), জগন্নাথপুর স্বরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৬), পাইলগাঁও বি এন উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৯), দিরাই উচ্চ বালক বিদ্যালয় (১৯১৫), রাজানগর কৃষ্ণচন্দ্র পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯০৩), চন্দ্রনাথ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৫৭), সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৩), আশারকান্দি জাকির মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৮৮৭), সৈয়দপুর সৈয়দিয়া শামছিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯০৩), বাহারা প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৮৩১), আনন্দপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯২৫), দিরাই আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৮০৫), শাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯০৫), বিশ্বম্ভরপুর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯২৮)।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরনা) এসে মিশেছে এই হাওরে। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ বসতি ও কৃষিজমি। একসময় গাছ-মাছ-পাখি আর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে 'রামসার স্থান' (Ramsar site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইসিইউএন এই হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। সুইস অ্যাজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) এবং আইসিইউএন ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে 'টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা' প্রকল্প পরিচালনা করছে।

শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে উঠলে শুধু কান্দার ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে, আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় কৃষকেরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন। এ সময় এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা —রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়। কান্দাগুলো এখন (২০১২) আর দেখা যায় না বলে স্থানীয় এনজিও ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে পুঁতে দেয়া হয়েছে বাঁশ বা কাঠের ছোট ছোট বিশ্রাম-দণ্ড।

সূত্র: সিলেটপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়