ঢাকা, শুক্রবার ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ২০ ১৪৩৩

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ৩ জুলাই ২০২০

বাংলাদেশের ভ্যাকসিন বাজারে আসতে পারে ডিসেম্বরেই

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। ভ্যাকসিনের অগ্রগতি জানিয়ে প্রশংসাও কুড়াচ্ছে দেশজুড়ে। এরইমধ্যে বড় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না আসলে ট্রায়াল শেষে আগামী ডিসেম্বরে এ ভ্যাকসিন বাজারে আনতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ।

শুক্রবার বাংলানিউজকে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন আবিষ্কার বিষয়ক দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। 

আপনাদের ভ্যাকসিন এখন কোন পর্যায়ে, সামনে আর কয় ধাপ বাকি পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য?

ড. আসিফ মাহমুদ: ভ্যাকসিনটি প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা পাঁচটি খরগোশের ওপরে ট্রায়াল করি। আমরা যেহেতু তিনটা ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছি, সে কারণে তিনটা ক্যান্ডিডেট আমরা তিনটি খরগোশের শরীরে প্রয়োগ করি। এরপর একটা খরগোশ কন্ট্রোলড থাকে, যেটাতে আমরা কোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগ করিনি। আরেকটি খরগোশের শরীরে আমরা প্লাসিবো দিই, সেখানে ভ্যাকসিনের অ্যাক্টিভ ম্যাটারিয়াল ছিল না, শুধু ফর্মুলেশন বাফার দেয়া হয়। কন্ট্রোলে যেটা ছিল, সেটাতে কোনো কিছুই ইনজেক্ট করা হয়নি। আর যে খরগোশটিকে প্লাসিবো দেয়া হয়, সেটি নরমাল ছিল। এরপর ১৪তম দিনে আমাদের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা তিনটি খরগোশের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করি। রক্ত থেকে সিরাম আলাদা করে আমরা দেখতে পাই তিনটি খরগোশের শরীরেই যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।

আমরা মোট চারটি ক্যান্ডিডেট এবং তিনটি ডিফারেন্ট ডেলিভারি মেকানিজম নিয়ে কাজ করছি।‌ আমাদের বর্তমান ট্রায়ালে তিনটি টার্গেট। একটি ডেলিভারি মেকানিজম নিয়ে। আমরা আরো ব্যাপকভাবে এনিমেলের ওপর ট্রায়াল করব। সেখানে আরো নয়টি ক্যান্ডিডেটের ট্রায়াল হবে। সার্বিক ফলাফল পর্যালোচনা করে যে ক্যান্ডিডেটের রেজাল্ট বেশি সুইটেবল হবে, আমরা সেটা নিয়েই হিউম্যান ট্রায়ালে যাব।

এ বিষয়ে আপনারা কতটুকু আত্মবিশ্বাসী?

ড. আসিফ মাহমুদ: আমি প্রথমেই বলেছি, আমরা একটি বায়ো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। বায়ো ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি হিসেবে বায়োলজিকস প্রডাক্ট বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। সেই অভিজ্ঞতা আমরা এখানে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছি। বায়োলজিকস প্রডাক্ট কোয়ালিটি অত্যন্ত কঠিনভাবে মেইনটেইন করতে হয়। আমরা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করতে গিয়েও সেই কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করেছি। টোটাল প্রসেসিং কোয়ালিফাইড করেই আমাদের ফাইনাল ফর্মুলেশন প্রোডাক্টটা তৈরি করতে পেরেছি। সে কারণে আমরা ইনিশিয়াল ট্রায়ালে কোনো ধরনের টক্সিসিটি পাইনি। সুতরাং আমরা বলতে পারি এটা মানুষের শরীরেও কোনো ধরনের টক্সিসিটি তৈরি করবে না। এখন মূল কথা, মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারবে কি-না, সেটা শরীরে প্রয়োগ করলেই জানা সম্ভব। আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা হচ্ছে, বিশ্ববিখ্যাত যত ভ্যাকসিন কোম্পানির নাম শুনবেন, যেমন আমেরিকার মর্ডানা, তারা একটিমাত্র ক্যান্ডিডেট এবং একটি ডেলিভারি সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। কিংবা যুক্তরাজ্যের ড. সারাহ গিলবার্ট টিমের কথা শুনবেন, তারাও ভাইরাল ফ্যাক্টর ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। তবে আমরা একইসঙ্গে ১২টি ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছি। তাই আমাদের টিকার সফলতার হার নিয়ে গভীর আত্মবিশ্বাসী।

ভ্যাকসিন উন্নয়নে আপনারা কতজন গবেষক কাজ করছেন?

ড. আসিফ মাহমুদ: করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রজেক্টটা তৈরি করেছি বায়োটেক লিমিটেডের পক্ষ থেকে। এটা একটা বায়ো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। আমরা বায়োলজিকস ড্রাগ তৈরি করি। কিন্ত গত ৮ মার্চ যখন দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়, তখন আমরা দৃষ্টি দিই কোভিড-১৯ রোগের দিকে। আমরা একসঙ্গে তিনটা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। রিসার্স এবং ডেভেলপমেন্ট টিমের নেতৃতে আমি রয়েছি। আর আমাদের ওভারঅল সবগুলো প্রোজেক্টের প্ল্যানিং এবং তত্ত্বাবধান করেন গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও গবেষক দলের প্রধান ড. কাকন নাগ এবং প্রতিষ্ঠানের সিওও ড. নাজনীন সুলতানা। এছাড়াও আমাদের কোম্পানির আরো অনেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন এবং করছেন।

ওই ভ্যাকসিন সফল হলে দাম কেমন হবে, গরিবের সক্ষমতার মধ্যে থাকবে কি-না?

ড. আসিফ মাহমুদ: দামের বিষয়টি নিয়ে আসলে এখনই এভাবে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে আমার যেটা মনে হয়, যেহেতু এই টিকা বাংলাদেশে তৈরি করতে পারব, তাই দাম বিদেশ থেকে আনা ওষুধের চেয়ে অবশ্যই অনেক কম হবে। তবে সার্বিক খরচটা নির্ভর করছে হিউম্যান ট্রায়ালের ওপরে। কারণ আপনারা জানেন ফেস-১, ফেস-টু, ফেস-৩ সহ আরো বিভিন্ন ধাপে এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়। যেহেতু একটা থার্ডপার্টি দিয়ে সিআরও করাতে হয়, তাদের খরচ কেমন, সার্বিকভাবে সবকিছু বিবেচনা করে একটি ড্রাগের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে আমরা বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করেছি একটা উদ্দেশ্য নিয়েই, যেন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিনটা দিতে পারি। সুতরাং মানুষের কেনার সক্ষমতার মধ্যে দাম থাকবে বলে আশা করছি।

বিশ্বের বিখ্যাত সব বিজ্ঞানী করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন আবিষ্কারের বিষয়ে কাজ করছেন, সেখানে আমাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি করছে, এটা অবশ্যই আশা জাগানিয়া। তবে বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. আসিফ মাহমুদ: আমরা গতকাল প্রেস কনফারেন্সে সবকিছু বিস্তারিতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এরপরও কিছু সীমাবদ্ধতা এবং গোপনীয়তার কারণে আমরা সব ডাটা তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের সব ডাটা এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সে কারণে আবার কেউ যেন মনে না করেন আমাদের ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা নেই। আমরা বায়োলজিকস প্রোডাক্ট ২০১৬ সাল থেকে তৈরি করে আসছি। ছয়টা বায়োলজিকস প্রোডাক্টস ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রটোকল আমরা বিএমআরসিতে ইতোমধ্যে জমা দিয়েছি। তারা অনুমতি দিলে সিআরও দিয়ে আমরা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করব। এই প্রক্রিয়াটির সঙ্গে আমরা ভালোভাবে পরিচিত। সুতরাং কেউ যদি আমাদের ছোট করে দেখে, তাহলে আমাদের কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ‘জেনোম সিকোয়েন্স’ ভিন্ন রকমের, আপনাদের ভ্যাকসিন কি সব জিনোম সিকোয়েন্সের ক্ষেত্রে সঠিককভাবে কাজ করবে?

ড. আসিফ মাহমুদ: আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। এ জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এটার উত্তরে আমি বলতে চাই, আমরা কিন্তু পুরো ভাইরাসকে ভ্যাকসিনের টার্গেট হিসেবে গ্রহণ করিনি। টার্গেট হিসেবে আমরা করোনাভাইরাসের একটি পোর্শন নিয়েছি। কোন পোর্শন নেব, সেটার জন্য আমাদের কিছু বায়োইনফরমেটিক্স সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়েছে। আমরা যেটা করেছি, যখন টার্গেট সিলেক্ট করি, তখন ডাটাবেজে যতগুলো সিকোয়েন্স সাবমিটেড হয়েছিল, এরমধ্যে বাংলাদেশের সিকোয়েন্সও ছিল, সবগুলো সিকোয়েন্স এনালাইসিস করেই আমরা টার্গেট করি। প্রতিনিয়ত যত নতুন নতুন সিকোয়েন্স আসছে, সেগুলোকেও আমরা কনসিডার করছি। আমরা যে টার্গেট সেট করেছি, সেটা কতটা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট হলো, সেটাও দেখছি। ওই টার্গেটের মাঝখানে কোনো মিউটেশন হলো কি-না, সেটাও দেখছি। এসব আবার আমাদের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরিতে কোনো ধরনের বাধা দেবে কি-না, সেটাও খেয়াল রাখছি। এরপরেও ভ্যাকসিন প্রতিনিয়ত আপডেট করার সুযোগ রয়েছে।

আপনাদের ভ্যাকসিন সফল হলে বাজারে আসতে প্রায় কতদিন লাগতে পারে?

ড. আসিফ মাহমুদ: আমরা আপাতত ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় নিচ্ছি আমাদের রেগুলেটেড এনিমেল ট্রায়াল করতে। এরপর আমরা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রটোকল বিএমআরসিতে (বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ) জমা দেব। বিএমআরসির অথোরাইজেশন বোর্ড আমাদের অনুমতি দিলে সিআরও দিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যাব। এরপর আমরা মার্কেট অথোরাইজেশনের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কাছে যাব। এখানে কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমাদের হাতের নাগালে নেই। যেহেতু এই ভ্যাকসিনটা আমাদের দেশে প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছে, সেহেতু এটা সবার জন্যই নতুন একটি অভিজ্ঞতা। এখানে পদে পদে যেসব প্রতিবন্ধকতা আসবে, সেগুলো আমরা যদি একে একে সমাধান করতে পারি, তাহলে আমি আশা করছি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই করোনাভাইরাসের এই ভ্যাকসিন আমরা বাজারে আনতে পারব।

সূত্র: বাংলানিউজ২৪

আইনিউজ/এসবি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়