ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১০ ১৪৩৩

রাকিবুর রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৩৬, ৬ মার্চ ২০২১
আপডেট: ১১:০৬, ৭ মার্চ ২০২১

উত্তাল মার্চের এই দিনে

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির একটাই প্রতীক্ষা- ‘কী ভাষণ দেবেন জাতির পিতা’

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের দিন যত যাচ্ছিল, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল অসহযোগ আন্দোলনের গন্তব্য। দেশব্যাপী চলছিল লাগাতার হরতাল। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দৃষ্টি একদিকে- ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে কী ভাষণ দেবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল সেই ভাষণের। ওইদিন ঢাকায় লাগাতার ছয় দিনের হরতাল পালনকালে রাস্তায় নেমে আসে সর্বস্তরের জনতা।

শহীদ জননী জাহানার ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে ১৯৭১ সালের ৬ মার্চের ঘটনা বর্ণনায় লিখেছেন, ‘আগামীকাল রেসকোর্সে গণজমায়েতে শেখ সাহেব কী বলবেন, তা নিয়েও লোকজনের জল্পনা-কল্পনার অবধি নেই। এক তারিখে হোটেল পূর্বাণীতে তিনি বলেছিলেন- বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের কর্মসূচির ঘোষণা তিনি সাত তারিখে দেবেন। কিন্তু এ কদিনে ঘটনা তো অন্য খাতে বইছে। এত মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ, কারফিউ ভঙ্গ, গুলিতে শত শত লোক নিহত- এর প্রেক্ষিতে শেখ সাহেব আগামীকাল কী ঘোষণা দেবেন? কেউ বলছে, উনি আগামীকাল স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কেউ বলছে, দুর তা কী করে হবে? উনি নির্বাচনে জিতে গণপ্রতিনিধি, মেজরিটি পার্টির লিডার, উনি দাবির জোরে সরকার গঠন করবেন, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করবেন। এখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সেটা তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বে। কেউ বলছে, আগামীকাল মিটিংয়ের ব্যাপারে ভয় পেয়ে ইয়াহিয়া আজ ভাষণ দিচ্ছে।’

৬ মার্চ দুপুরে বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ভাষণে তিনি বলেন, যাই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব। এ সময় তিনি ১০ মার্চ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।

তার এই ভাষণের পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির এক যুক্ত জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক ঘণ্টার ওই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনা হয় ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। আলোচনা শেষে ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু জানান, শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন না।

এদিকে, ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পরপরই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বের হয় প্রতিবাদ মিছিল।

স্বাধীনতাকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। উত্তেজিত জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে- ‘রক্ত চাও নেবে তবু স্বাধিকার দিতেই হবে।’

রাস্তায় রাস্তায় তৈরি হলো ব্যারিকেড। ঘন ঘন যাতায়াত করছিল সশস্ত্র-বাহিনীর ট্রাক আর অ্যাম্বুলেন্স। তবুও বন্ধ ছিল না মুক্তিকামী বাঙালির মিছিল-মিটিং।

স্লোগান উঠছিল- ‘জয় সর্বহারার জয়, জয় বিদ্রোহী বাংলার জয়, জয় নিপীড়িত মানুষের জয়’। একটি স্লোগান সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হতে থাকলো- ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।

৬ মার্চ বেলা ১১টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেট ভেঙে পালিয়ে যান ৩৪১ জন কয়েদি। পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে মারা যান ৭ কয়েদি। এছাড়া আহত হন আরও ৩০ জন।

রাজশাহীতে মিছিলকারীদের ওপর গুলি চালায় সশস্ত্র বাহিনী। সেই গুলিতে সেখানে একজনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ১৪ জন। খুলনায়ও গুলিবর্ষণে ১৮ জন নিহত ও ৮৬ জন আহত হন।

সেই দিনের (৬ মার্চ) স্মৃতিচারণ করে যুগান্তরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ লেখেন, ‘সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। বিগত কয়েকদিনে সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ সবাই স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হতে থাকেন।

তিনি আরও লেখেন, ‘এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক শাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সরিয়ে তদস্থলে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’খ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে উভয় পদে নিযুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকের পর ফের ৬ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান দ্বিতীয় দফা বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন- পরিস্থিতি রক্ষা করার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। বাকি বিষয় আগামীকাল শেখ মুজিবের বক্তৃতায় জানতে পারবেন।’

তথ্যসূত্র- জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, ইত্তেফাক, যুগান্তর ও একাত্তরের বিভিন্ন সংবাদপত্র।

আইনিউজ/আরআর

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়