ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১০ ১৪৩৩

সুষ্মিতা দেব পূজা

প্রকাশিত: ১৫:০৯, ৭ মার্চ ২০২১
আপডেট: ১৬:৩৩, ৮ মার্চ ২০২১

করোনার সাথে বাংলাদেশের লড়াইয়ের এক বছর

করোনাকালীন বাংলাদেশ। ফাইল ছবি

করোনাকালীন বাংলাদেশ। ফাইল ছবি

বর্তমান সময়ের পরিচিত নাম করোনাভাইরাস। এখন উঠতে বসতে শুধু তারই চর্চা। আর হবে নাই বা কেনো? গেলো এক বছর জুড়ে ভাইরাসটির তাণ্ডবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বাংলাদেশেও ৮ হাজারের বেশি মানুষ ভাইরাসটির সংক্রমণে মারা গেছেন। বাংলাদেশে শনাক্তের পর করোনার এক বছর পূর্ণ হলো সোমবার ৮ মার্চ।

করোনা শনাক্তে প্রতিদিন চলে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা

বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত

২০২০ সালের ৮ মার্চ। সেদিন দুপুরের দিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর তৎকালীন পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা একটি ব্রিফিং করেন। সেখানে তিনি জানান, দেশে প্রথম তিনজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার দেয়া তথ্য মতে,  ইতালি থেকে করোনার সংক্রমণ নিয়ে দেশে ফেরেন দুই বাংলাদেশি। পরে তার দ্বারা আক্রান্ত হন পরিবারের আরেক সদস্য। এই ঘোষণা দেয়ার পর দেশের সকল মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানার আহবান জানানো হয়।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ৪৬২ জনের মৃত্যু দেখেছে

বাংলাদেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু

৮ মার্চ মীরজাদী সেব্রিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার মতো কোনো পরিস্থিতি হয়নি। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি।’ কিন্তু তার ১০ দিন পর অর্থাৎ ১৮ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে যা এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।

ঠিক সেদিনই ভাইরাসটির সংক্রমণে এক ব্যক্তির মৃত্যুও হয়। ফলে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। সেসময় স্বাস্থ্যবিধি মানতে আরও জোর দেয়া হয়। বাইরে বের হলে মাস্ক পড়ার পাশাপাশি ঘন ঘন হাত ধুতে পরামর্শ দিতে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

১৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে ৭ হাজার ৯৮০ জন মারা গিয়েছিলেন। আজ যে সংখ্যা ২৬ লাখ অতিক্রম করে গেছে। যেখানে বাংলাদেশে ৮ হাজার ৪৯১ জনের মৃত্যু ঘটেছে।

করোনা সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী আরোপ করা হয় লকডাউন। ছবি: রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মতিঝিল

বাংলাদেশে লকডাউনের সূচনা

করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সরকার লকডাউন জারির সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সকল অফিস আদালত বন্ধ রেখে যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যা কয়েক দফায় বাড়ানোও হয়।
২৬ মার্চ থেকে চলা টানা ৬৬ দিনের লকডাউন শেষে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই সাথে গণপরিবহন চালুরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য খাত তাদের কার্যক্রম  স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে।

মাস্ক হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের সঙ্গী

লকডাউনের প্রভাব

লকডাউনের প্রভাবে স্থগিত হয়ে যায় ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করলেও করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে পরীক্ষা ছাড়াই বিশেষ পদ্ধতিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের উত্তীর্ণ করে দেয়া হয়।
একই বছরের পিএসসি, জেএসসিসহ প্রথম থেকে নবম শ্রেণির  সকল শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করে দেয়া হয় পরবর্তী শ্রেণিতে। এতে ক্ষতি হয় দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর।

করোনাকালে অনেকই কাজ হারিয়ে না খেয়ে কাটিয়েছেন দিন

তবে লকডাউনের প্রভাবে সবচেয়ে দুর্বিষহ সময়ে কাটিয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার ফলে অনেকেই হারিয়ে ফেলে তাদের জীবিকা। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় সেই সময় অনেকেই বাইরে হতে পারছিলেন না। এতে করে তাদের না খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছে।

সেই সময় কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কাটছে কিংবা অর্ধেক বেতন দিচ্ছে, এমনকি বেতন দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ আসতে শুরু করে। যদিও প্রথম থেকেই বেতন না কাটতে আহবান জানিয়ে আসছিল সরকার। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে লকডাউন তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।\

করোনার কারণেই বর্তমানে হাত ধোয়ার প্রবণতা বেড়েছে

করোনাকালে জীবনযাত্রার পরিবর্তন

করোনা আসার পরে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আসে। বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার, ঘন ঘন হাত ধোয়াসহ নানা নির্দেশনা জুড়ে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেসময় বাইরে খাবার খাওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, অপ্রয়োজনে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে। যদিও তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

করোনাকালে বেড়েছে সঞ্চয়ের প্রবণতা

করোনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

করোনাভাইরাস দেশে সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ নিয়েছে। আক্রান্ত করেছে দেশের সাড়ে ৫ লাখের বেশি মানুষকে। তবে ভাইরাসটির কারণে দেশের মানুষ অনেক শিক্ষা পেয়েছে। যার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় করার অভ্যাসটি অন্যতম। এতে কমেছে খরচের খাত। এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মানতে শুরু করেছেন অনেকে। যা এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা।

করোনা প্রতিরোধে দেশব্যাপী চলছে করোনার টিকাদান কর্মসূচি

করোনার টিকাদান কর্মসূচি

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ করোনার টিকা নিয়েছেন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দুই চালানে সেরামের ৭০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন এসেছে। এছাড়া ভারত থেকে উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পাঠিয়েছে।দেশে টিকাদান অব্যাহত  রাখতে সরকার আরও টিকা কেনার চেষ্টা করছে।

টিকা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

রোববার (৭ মার্চ) স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে মারা গেছেন ৮ হাজার ৪৬২ জনে। তবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫ লাখ ৩ হাজার ৩ জন। 

মোট কথা হচ্ছে, গেলও এক বছরে করোনার কারণে বাংলাদেশ নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। তাই আশা করা যাচ্ছে, এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে করোনাকে জয় করতে পারবে।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়