ঢাকা, রোববার ২৩ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৮ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ০৬:৫০, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ০৬:৫৯, ৭ নভেম্বর ২০১৯

একজন 'করিম ভাই' এবং রাজনীতি

আব্দুল করিমকে বাউল সম্রাট বলা হলেও এটা নিঃসন্দেহে স্বীকার করে নিতে হয় যে আব্দুল করিম নিজেকে বাউল সত্তারও উর্ধে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাই অনেকেই আব্দুল করিমকে শুধুমাত্র বাউল বলেই থেমে থাকতে পছন্দ করেন না। যেখানে বাউলরা তাদের একজীবন দেহ সাধনার মধ্যে কাটিয়ে দেন সেখানে আব্দুল করিম শুধু দেহ সাধনার গোলকে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। গানের মাঝেই ফুটিয়ে তোলেছিলেন গণমানুষের দুঃখ, দুর্দশার কথা। তাই শেষ জীবনে শাহ আব্দুল করিম হয়ে ওঠেছিলেন গণ মানুষের কবি। আরেকটু ঘুচিয়ে বললে গণসঙ্গীতের একজন সুদক্ষ পদকর্তা।

 

তাত্ত্বিক গান রেখে আব্দুল করিম যখন গণমানুষকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তখন তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের নিপীড়িত মানুষের কাছেও হয়ে ওঠলেন তাদেরই একজন। তাঁর গানের কথা তখন হয়ে ওঠতে থাকে সমাজের দশজন হাভাতে মানুষের জীবনের কথা। গানের প্রবাহমান সুরে তাঁর এই গণদুঃখের কথা পৌছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। রাজনীতিক মহলও তাঁর গানের মধ্য দিয়েই বুঝতে শুরু করেন ভাটির মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা। গণমানুষকে নিয়ে আব্দুল করিমের গান ভাবনার অগ্নিস্ফুরণ দেখেই কাগমারী সম্মেলনে মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘গানের সাধনায় একাগ্র থাকলে তুমি একদিন গণ মানুষের শিল্পী হবে।‘ আব্দুল করিম তাই হয়েছিলেন।

 

রাজনীতির মাঠে আব্দুল করিম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও তাঁর গণসঙ্গীত আকারে লেখা গানগুলো মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী সমাজেরই প্রতিচ্ছবি ছিলো। তাই প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে এসব গান লিখতে গিয়েই আব্দুল করিম ভেতরে ভেতরে হয়ে ওঠেছিলেন একজন ভাটির রাজনৈতিক নেতা। যার গানের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভাটি পাড়ের সাধারণ মানুষের কথা।

 

রাজনীতির মাঠে শাহ আব্দুল করিমকে দেখা যায় ৫৪’র নির্বাচনকালীন সময়টাতে এসে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সিলেটে গণসংযোগে আসতেন তখন শাহ আব্দুল করিম হতেন তাদের সফরসঙ্গী।

 

গণমানুষের কাছে আব্দুল করিম ছিলেন তাদেরই এক স্বজনের মতো। তাই গণ মহলে তিনি ছিলেন করিম ভাই। ১৯৬৭ সালে শেখ মুজিব পাকিস্তানের দুর্নীতিদমন মন্ত্রী থাকাবস্থায় একবার সুনামগঞ্জে প্রথম সরকারি সফরে আসেন। অজানা কারণে সেদিন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর জনসভা বর্জন করেছিলেন। সভা বর্জন করার ফলে আশাহত হয়ে সভায় আসা লোকজন চলে যেতে শুরু করে। সেদিন সেই সভায় শাহ আব্দুল করিম এসে গান ধরলে জনসভাস্থল লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে।

 

১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জের জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে করিমের গণসংগীত শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে শেখ মুজিব মাইকে দাড়িয়ে বলেছিলে, 'শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে করিম ভাইও বেঁচে থাকবেন, করিম ভাই যেখানে শেখ মুজিব সেখানে।' ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের ভাটি অঞ্চল নির্বাচনী প্রচারাভিযানে একমাত্র মধ্যমণি ছিলেন শাহ আব্দুল করিম। ১৯৮৬ সালে শেখ হাসিনা যখন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালাতে ভাটি অঞ্চলে আসেন তখন তার সফরসঙ্গী ছিলেন শাহ আব্দুল করিম।

 

করিমের গানেরপ্রেম থেকে বাদ পড়েন নি বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ১৯৯৫ সালে দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় শেখ হাসিনা শাহ আব্দুল করিমকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আমার বাবা যার গানের ভক্ত ছিলেন, আমি তাকে উপযুক্ত সম্মান দেব।’

২০০১ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে এক কর্মীসভায় বলেছিলেন, সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠায় শাহ আব্দুল করিমের ভূমিকা অন্যতম। শাহ আব্দুল করিম ৫৪ এর নির্বাচন, ৬৯ এর গণআন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে স্বরচিত গণসংগীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশ মাতৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন।

বাংলার বাঘ খ্যাত রাজনীতিবীদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শও পেয়েছিলেন শাহ আব্দুল। তাঁর গণসংগীত শুনে আব্দুল করিমকে ১৮৫ টাকা দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

দেশের গণমানুষের ব্যাপারে আব্দুল করিম ছিলেন সজাগ। গানে তাই তাদের কথা তোলে এনেছেন আঞ্চলিক উপাদান দিয়ে। সুরে সুরে পৌছে দিয়েছেন দেশের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে। তাই বলতে হয় মূলত আব্দুল করিম একজন ভাটির কবি হলেও তাঁর ভেতরে লালিত হচ্ছিলো এদেশের গণমানুষের ভাবনা। যা তাকে ভেতর থেকে গড়ে তোলেছিলো একজন সুদক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে।

লেখক: হেলাল আহমেদ, সংবাদকর্মী এবং লোক গান সংগ্রাহক 
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়