ঢাকা, সোমবার   ২৯ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩:৩৯, ২২ অক্টোবর ২০২১
আপডেট: ১৫:০০, ২২ অক্টোবর ২০২১

কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার ইকবাল এখন কুমিল্লায়

গ্রেফতার ইকবাল হোসেন।

গ্রেফতার ইকবাল হোসেন।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখা সেই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তার নাম ইকবাল হোসেন। প্রধান সন্দেহভাজন এই ইকবালকে কক্সবাজারে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করে কুমিল্লায় নিয়ে এসেছে পুলিশ।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সোহান সরকার এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, দুপুর ১২টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ইকবালকে কুমিল্লা পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়েছে। এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে নানুয়া দীঘির পাড়ে দর্পন সংঘের পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির কোলে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন রাখা দেখে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। হামলা, ভাংচুর চালানো হয় অন্তত আটটি মন্দিরে। তার জের ধরে সেদিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে মন্দিরে হামলা হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় পাঁচজন।

এর পরের কয়েকদিনে নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়। তাতে নোয়াখালীতে নিহত হয় দুজন। এর মধ্যে কুমিল্লা পুলিশ বুধবার নানুয়া দীঘির পাড়ের দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে ইকবাল নামে ওই যুবককে শনাক্তের কথা জানায়। ঘটনার পর থেকে ইকবাল পালিয়ে যান।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার সৈকত এলাকায় ঘোরাফেরা করার সময় ইকবালকে আটক করে পুলিশ। পরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ভোর পাঁচটার দিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের একটি টিম কক্সবাজারে পৌঁছান। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে আটক ইকবালকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপরই কুমিল্লা জেলা পুলিশের ওই টিম ইকবালকে নিয়ে কুমিল্লার পথে রওয়ানা দেয়। দুপুর ১২টার আগেই তাকে কুমিল্লায় আনা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর কুমিল্লা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানান, এই ইকবালই সিসিটিভি ক্যামেরায় শনাক্ত হওয়া ইকবাল বলে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।

এই ইকবালের পরিচয় কী?

আটক ইকবালের বাড়ি কুমিল্লা শহরেরই সুজানগরের খানকা মাজার এলাকায়। ওই এলাকার নূর মোহাম্মদ আলমের ছেলে ইকবাল পেশায় রঙমিস্ত্রি।

ইকবালের মা বিবি আমেনা বেগম জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। ইকবাল সবার বড়।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই মাদক সেবন শুরু করে। ১০ বছর আগে বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেছেন ইকবাল। তার এক ছেলে। বিয়ের পাঁচ বছর পর স্ত্রীর সঙ্গে ইকবালের ডিভোর্স হয়। তারপর চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে বিয়ে করেন। এই সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে। ইকবালের স্ত্রী-সন্তান এখন কাদৈর গ্রামে থাকেন।

ইকবাল যে মাদকসেবী, তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় অনেকেই। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল বলেন, ১০ বছর ধরে ইকবালকে চিনি। প্রায় সময় আমার কার্যালয়ের আশপাশেই থাকে। রঙমিস্ত্রির কাজ করতো। মাঝে মধ্যে নির্মাণ শ্রমিকের কাজও করতো। ইয়াবা সেবন করে। 

ইকবাল হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র

তিনি আরও বলেন, ইকবালকে নিয়ে অনেকেই অভিযোগ দিতো। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। তবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নয়। কোনও দলের কর্মী কিংবা সমর্থকও নয়। কয়েক বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আমার মনে হয়, তার মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় পক্ষ কাজটি করেছে। পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ঘৃণা প্রকাশ করছে। বিস্তারিত...

সিসিটিভি ফুটেজে ইকবাল শনাক্ত

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে কোনো একসময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

এতে দেখা যায়, কোরআন শরিফটি রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি রাত তখন সোয়া ৩টার মতো।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মণ্ডপে যিনি ভোররাতের দিকে কোরআন শরিফ রেখেছেন, তাকেও চিহ্নিত করা গেছে। মণ্ডপটিতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মূল অভিযুক্তের ছবি। যেকোনো সময়ে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আশাবাদী পুলিশ কর্মকর্তারা। বিস্তারিত...

পরিবারের দাবি ইকবালের শাস্তির

পূজামণ্ডপে কোরআন রেখে সারাদেশে অশান্তির সৃষ্টি করা এই ইকবালের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তার মায়েরও। ইকবালের মা আমেনা বেগম জানান, ইকবাল নেশাগ্রস্ত হয়ে নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের অত্যাচার করতো। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটে মানুষকে হয়রানি করতো। গোসলখানায় দরজা বন্ধ করে ইয়াবা সেবন করতো। ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতো। বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেতো। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।

ইকবালের মা আরও বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। ১০ বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার কিছু ছেলের মারামারি হয়। এ সময় ইকবালের পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। তখন থেকে ইকবাল অসুস্থ। উল্টাপাল্টা চলাফেরা করায় বিভিন্ন সময় চোরের অপবাদ দিয়ে তাকে স্থানীয়রা মারধর করতো। পরে তারাই আক্ষেপ করতো। ভালো ক্রিকেটও খেলতে পারতো ইকবাল।

সম্প্রতি ইকবালের মণ্ডপে কোরআন কাহিনী নিয়ে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে কাউন্সিলরের কাছ থেকে শুনেছি, ইকবাল পূজামণ্ডপ থেকে হনুমানের গদা নিয়ে আসে। এরপর থেকে এলাকায় তাকে নিয়ে চলছে আলোচনা।

ইকবালের মা আমেনা বেগম বলেন,

‘ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে। তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।’

শুধু মা নয়, ইকবালের বিচার দাবি করেন তার ছোট ভাই রায়হানও। রায়হান বলেন, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশের সঙ্গে গত শুক্রবার থেকেই আছি। ইকবাল ভালো কোরআন তিলাওয়াত করতে পারেন।

রায়হান জানান, তার ভাই যদি অন্যায় করে থাকেন, যদি তা সত্য হয়, তাহলে তার শাস্তি হোক। তবে ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারেন।

ইকবালের নানি রহিমা বেগম জানান, ১৩ দিন আগে ঘর থেকে ইকবালকে বের করে দিয়েছি। ব্লেড দিয়ে পাঁচটি হাঁস জবাই করেছে। ইকবালের অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ। বিস্তারিত...

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়