আই নিউজ ডেস্ক
ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরে সম্পর্কে বরফ গলার আভাস
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের রাজধানী দিল্লি সফর করেছেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)–এর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী। চলতি মাসের শুরুতে হওয়া এই সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে গত আড়াই বছর ধরে যে শীতলতা বিরাজ করছিল, এই সফরকে তার বরফ গলার সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখছে ভারতীয় গণমাধ্যম। ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট শিরোনাম করেছে—গত সপ্তাহের এই গোপন সফর দিল্লি–ঢাকা সম্পর্কে বরফ গলার ভিত্তি তৈরি করেছে। একইভাবে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, আলোচনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা দিল্লি সফর করেছেন। উভয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমি
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ভারতের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা কমেনি।
বাণিজ্য সংকোচন, ভিসা কার্যক্রম স্থগিত, কূটনীতিক তলবসহ নানা ঘটনার ফলে সম্পর্ক সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শীতল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
বিএনপি সরকারের পর নতুন বার্তা
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। ঢাকার পক্ষ থেকেও সেই বার্তায় ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় দিল্লি সফরে যান ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী। সফরে তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)–এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা
বৈঠক সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাতে দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, উভয় পক্ষের মধ্যে একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছানো হয়েছে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন এক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত থাকা যোগাযোগ চ্যানেলগুলো পুনরায় চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দুই দেশের বেশ কিছু যোগাযোগব্যবস্থা স্থগিত হয়ে যায়। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার আগে পর্যন্ত মূলত দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের (এনএসএ) কার্যালয়ের মাধ্যমেই যোগাযোগ চলছিল। বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বর্তমানে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খলিলুর রহমান ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালই দুই দেশের যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিএফআই প্রধানের সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাংলাদেশ নিয়ে নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশে সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে তা ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গত কয়েক মাস ধরেই নয়াদিল্লি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় আসেন। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন এবং নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো শোকবার্তা তুলে দেন।
পরে ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি উপস্থিত ছিলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত হিসেবেও ঘটনাগুলোকে দেখা হয়।
সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো
তবে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উঠেছে।
তবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু–কে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘জিম্মি’ করে রাখা হবে না।
দুই দেশের মধ্যে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। পাশাপাশি গত দুই বছরে আরোপ করা পারস্পরিক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধও এখনো বহাল রয়েছে।
নতুন ঘটনার ইঙ্গিত
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং সেই বিক্ষোভের একটি অংশ ভারতের দিকেও ক্ষোভ প্রকাশ করে।
প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সূচনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ঢাকা কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলেও জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ও যোগাযোগ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।
ইএন/এসএইচএ
- কাল থেকে যেসব শাখায় পাওয়া যাবে নতুন টাকার নোট
- 'জাতীয় মুক্তি মঞ্চ' গঠনের ঘোষণা
- বেইলি রোডে আগুন : ৩ জন আটক
- এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী
- এক বছরেই শক্তি, ক্ষিপ্রতা জৌলুস হারিয়ে 'হীরা' এখন বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী
- ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক
- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিকথা (প্রথম পর্ব)
- এবার ভাইরাস বিরোধী মাস্ক বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো বাংলাদেশ
- মায়েরখাবারের জন্য ভিক্ষা করছে শিশু
- ২৫ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক

























