Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, মঙ্গলবার   ৩১ মার্চ ২০২৬,   চৈত্র ১৭ ১৪৩২

প্রকাশিত: ১৩:২৪, ২৩ জুন ২০১৯
আপডেট: ১৩:২৪, ২৩ জুন ২০১৯

শাহবাজপুর ব্রিজের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগে ২ কোটি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে তিতাস নদীর সেতুর স্পেন ভেঙ্গে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সিলেট বিভাগসহ আশেপাশের ২ কোটি মানুষ । বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রী, অসুস্থ যাত্রী, চাকুরীজীবী ও পর্যটকরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিনই যাত্রীরা কাউন্টারে এসে ভিড় করছেন। কার্যত ঢাকার সাথে এই এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন হয়ে গেছে। সিলেট থেকে সারাদেশে বাস যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে গ্রীন লাইন পরিবহন, লন্ডন এক্সপ্রেস, ইউনিক সার্ভিস, এনা ট্রান্সপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহনসহ বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাস। বাস যোগাযোগ বন্ধ রাখায় দূর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। বিত্তশালীরা ঢাকা সিলেট আকাশ পথে যেতে পারলেও ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে বিমানের টিকেট সংকট। অন্যদিকে রেলওয়েতে টিকেটের ব্যাপক চাহিদা তৈরী হওয়ায় কালোবাজারিরা যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ যাত্রীদের। শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকার একটি টিকেট ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হবার খবর পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন এসব এলাকার ব্যাবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ। বিশাল এ ক্ষতি আর দুর্ভোগের জন্য সড়ক বিভাগকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা । জানা যায়, গত ১৮ জুন বিকেলে শাহবাজপুরের তিতাস নদীর ওপর ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর চতুর্থ স্প্যানের ফুটপাতসহ রেলিং ভেঙে পড়ে। এর ফলে যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই সেতু দিয়ে সবধরনের ভারী ও মাঝারি যান চলাচল বন্ধের নির্দেশনা দেয় সওজ বিভাগ। যানবাহনগুলোকে বিকল্প সড়ক হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-নাসিরনগর ও হবিগঞ্জের লাখাই-হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ সড়ক ব্যবহার করার জন্য বলা হয়। তবে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে বিকল্প সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে করে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। ছোট এই রাস্তা দিয়ে বড় যানবাহন চলতে গিয়ে সৃষ্টি হয় ১০ থেকে ২০ ঘন্টার যানজট। যানজটের তীব্রতা এতই বেড়েছে যে যা্ত্রীদের অনেকটা অনাহারে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্রাহ্মনবাড়িয়ার বিভিন্ন সংগঠন ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে আটকে পড়া মানুষের জন্য  ফ্রি খাবার ও পানির ব্যবস্থা করছেন। বিকল্প হিসেবে চান্দুরা আখাউড়া হয়ে ঢাকা যাচ্ছে অনেক পরিবহন। আবার কিছু পরিবহন মাধবপুর উপজেলার রতনপুর-ছাতিয়াইন-নাসিরনগর হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিশ্বরোড হয়ে মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে। রতনপুর-ছাতিয়াইন-নাসিরনগর সড়কে ৫ দিন ধরে ভারি যানবাহন চলায় সড়কের অনেক এলাকা ভেঙে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। এতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়তি সময় ব্যয় হচ্ছে সড়কে। দুর্ভোগে পড়া সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কবির মিয়া বলেন, চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাতের দিন ছিল ২০ জুন। তাই বাধ্য হয়ে ঢাকা যেতে হয়েছে । ২৬ ঘটার দূর্ভোগ শেষে আমি বাড়ি ফিরতে পেরেছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবহেলায় এ রকম হয়েছে জানিয়ে সিলেট ময়মসিংহ রোডের পরিবহন ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদ খসরু বলেন, ‘গত ৩ বছর ধরেই এই ব্রিজটি খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু সড়ক বিভাগ এ দিকে খেয়াল করেনি । তাদের দ্বায়িত্বের অবহেলার কারণে এই অঞ্চলের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ।’ তিনি বলেন, ‘ছোট রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়, তাই আমিবাস বন্ধ রেখেছি, ৫ ঘন্টার রাস্তায় সময় লাগে ২৬ ঘন্টা। গত কয়েকদিন ধরে আমার স্টাফদের বসি বসিয়ে বেতন দিচ্ছি ।’ অন্যদিকে সিলেটের সঙ্গে ঢাকার বাস, ট্রাক সরাসরি চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। হবিগঞ্জের মাধবপুরে শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ আশেপাশে প্রতিটা জেলা উপজেলার ঘরে ওঠা শিল্প প্রতিষ্টাগুলো পড়েছে মহা বিপাকে । এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য ডেলিভারি যেমন বন্ধ রয়েছে, তেমনি কাঁচামালও সময় মতো পৌঁছাচ্ছে না। মাধবপুর উপজেলার একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার সঙ্গে সিলেটের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় গত চার দিন কাঁচামাল নিয়ে কোনো গাড়ি কারখানায় প্রবেশ করতে পারেনি। এছাড়া নির্মাণ সামগ্রী বালু, রড ও সিমেন্ট না আসাতে কোনো কোনো ফ্যাক্টরির নির্মাণ কাজও আটকে আছে। ফ্যাক্টরির কাজের বালু আশুগঞ্জ থেকে আনতে হয়। শাহবাজপুর এলাকার সেতুর রেলিং ভাঙার কারণে বালুবাহী অনেকগুলো ট্রাক রাস্তায় আটকা পড়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রে জানা গেছে, এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েক কোটি টাকা। অন্য দিকে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ আটকে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাধবপুর থেকে চান্দুরা ও শাহবাজপুর নৌ যোগাযোগ চালু হয়েছে। অনেক যাত্রী মাধবপুর সদর থেকে সোনাই নদী দিয়ে নৌপথে শাহবাজপুর সেতু পার হয়ে ঢাকার গাড়িতে উঠছেন। বিকল্প পথ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর-সরাইল ও হবিগঞ্জের লাখাই-হবিগঞ্জ সড়ক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের চান্দুরা-আখাউড়া সড়কে শুক্রবারও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে তীব্র যানজট দেখা গেছে। এতে যানবাহনে থাকা যাত্রীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। এদিকে অভিযোগ ওঠেছে এই সুযোগে রেলপথে অতিরিক্ত যাত্রী থাকায় অধিক মুনাফায় নেমেছে টিকেট কালোবাজারীরা। মৌলভীবাজারে একটি বেসরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, জরুরি কাজ থাকায় তিনি বাধ্য হয়ে কালোবাজারির কাজ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি টিকেট কিনেছেন, যা নির্দিষ্ট দামের থেকে ১০ গুণ বেশী। সেতুটি মেরামত কাজও হচ্ছে ধীরগতিতে। এতে ক্ষুব্ধ এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা। পাশাপাশি আটকে আছে শত শত পণ্যবাহী গাড়ী। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছতে পারছে না এসব পণ্যবাহী গাড়ি।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক জানান, সরাইল-নাসিরনগর বিকল্প সড়কটি আসলে গ্রামের ভেতরের সরু সড়ক। যা ভারী যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। এই সড়কে যান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তার ওপর দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এসব কারণে বাস মালিকরা বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শাহবাজপুর সেতু মেরামত করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত এই পথে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হবে। মাধবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. শাহজাহান বলেন, ‘সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।’ দ্রুত সেতু মেরামতের দাবি জানান তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন বলেন, ‘সেতুটি মেরামতের কাজ চলছে। আশা করি ১০-১১ দিনের মধ্যে মেরামত কাজ শেষ হবে। সিলেটের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকার সুযোগে যেসব যাত্রী অতি জরুরি কাজে বিকল্প পথে ঢাকা যাচ্ছেন কিংবা ঢাকা থেকে সিলেটে আসছেন তাদের কাছে থেকে পরিবহন শ্রমিকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।’
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়