ঢাকা, শনিবার ২৯ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৩ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:২১, ৩ ডিসেম্বর ২০২০
আপডেট: ১৩:০১, ৪ ডিসেম্বর ২০২০

একাত্তরে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ হয় শমসেরনগরে

শমরেসরনগর বধ্যভূমি। ছবি রণজিৎ জনি

শমরেসরনগর বধ্যভূমি। ছবি রণজিৎ জনি

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মুক্ত হয়েছিল শমসেরনগর। পাকিস্তানিদের হটিয়ে আজকের এই দিনেই শমসেরনগরের আকাশে উঠেছিল বিজয়ের পতাকা। একাত্তরে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ হয় মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শমসেরনগর ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাটি। যার কারণে এই অঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রাও ছিল বেশী। মুক্তিযুদ্ধের যে তিনটি সাব-সেক্টর নিয়ে নয় নাম্বার সেক্টর গঠিত হয়েছিল সেগুলো হচ্ছে টাকি, হেঙ্গলগঞ্জ ও শমসেরনগর।

শমশেরনগরে সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালে ২৮ মার্চ একজন ক্যাপ্টেনসহ ৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হয় মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস হানাদার বাহিনী শমশেরনগরে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে নারকীয়ভাবে নির্যাতন পরিচালনা করে অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছিল স্থানীয় বিমান বন্দরের রানওয়ের বধ্যভূমিতে। এখানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলায় টিকে থাকতে না পেরে হানাদার বাহিনী ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর ছেড়ে মৌলভীবাজার জেলা সদরের দিকে পিছু হঁটে যায়।

অক্টোবর মাসের শেষভাগে মুক্তিযোদ্ধারা শমসেরনগর চা বাগানে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। এখানে ছিল পাকবাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান। পাকবাহিনীর রসদ পরিবহনের জন্য এখানে গাড়ী জমা রাখা হতো। ২৫ অক্টোবর রাতে লেঃ কর্ণেল আলী ওয়াকিউজ্জামানের নেতৃত্বে ২০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাহাড়ী জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাটতে হাটতে রাত আড়াইটায় চা বাগানে প্রবেশ করে। দলটি ২ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি দল প্রবেশ করে চা বাগানের কারখানায় এবং অপর দলটি পাকবাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করতে অবস্থান নেয় সুবিধাজনক অপর এক স্থানে। রাত ৪টায় বিস্ফোরক দিয়ে ফ্যাক্টরীর জেনারেটর ও গাড়ীগুলো ধ্বংশ করে দিতে সমর্থ হন তারা। বিস্ফোরনের বেশ কিছুক্ষন পর পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চললেও মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই কোনরুপ ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিজ ক্যাম্পে ফিরে যেতে সক্ষম হন।

বিমানযোগে পাকসেনারা তখন শমসেরনর বিমানবন্দরে নামতো। বলা যায়, এ বিমান বন্দরকে ঘিরেই এতদাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল তাদের শক্ত ঘাটি। এখানে ঘাটি গাড়বার পর থেকেই তারা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। এর আগে মুক্তি বাহিনীর হাতে মার খাওয়ার প্রতিশোধ নিতে পাল্টা আক্রমনের প্রস্তুতি নিতে থাকে তারা। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। তার আগেই মুক্তিবাহিনী আক্রমন করে বসে তাদের উপর। ইপিআর এর ৩নং উইংয়ের সুবেদার শামসুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের এক বিশাল দল এই আক্রমনে অংশ নেন। পাল্টা আক্রমন চালিয়েও বেশীক্ষন টিকে থাকতে পারেনি পাকবাহিনী। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তারা পালিয়ে যায় বিমান বন্দর ছেড়ে। প্রথম দিনেই মুক্ত হয় শমসের নগর বিমানবন্দর। তবে এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় শমসেরনগর সম্মুখ সমরের স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শমসেরনগরের এই জায়গায় ৩টি কূপ খনন করে পাকিস্তানী সেনারা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

সরেজমিনে শমসেরনগরের ৭১ এর বধ্যভূমিতে গিয়ে দেখা যায়। সেখানের স্মৃতিস্তম্ভে গণহত্যার শিকার এগারো জনের নাম। তারা হলেন সোনাপুরের পিযুষ পাল ও প্রতাপ পাল, সারদপুরের মো আব্দুল বারি, কেছুলুটির মো: রুস্তুম আলী, শম বাজারের মো আমজদ আলী, সোনাপুরের মো. মবশ্বীর আলী, শিংরাউলীর আব্দুল হাই, মরহুমা জহুরা হাই, মোতাহির আলী, ভাদাইরদেউলের হাজী সাদ উল্ল্যাহ ও ডা: হোসেন আহমদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ২৯ তারিখ রাতেই মুক্তি বাহিনি ও মিত্র বাহিনী এক হয়ে চাতলাপুর জিওপিতে আক্রমণ করি। ৩০ তারিখ তারা সেখান থেকে চলে যায়। পরে তারা শমসেরনগর অবস্থান নেয়। আমরা শমসেরনগরেও তিন দিক থেকে আক্রমণ করি। বর্তমান এয়ারপোর্ট রোড থেকে এক পক্ষ ও চাতলাপুর বাগান থেকে আরেক পক্ষ হামলা চালাই। ভানুগাছ থেকেও আমরা আক্রমণ করি। এতে তিন দিক থেকেই আমরা আক্রমণ চালালে পাক বাহিনী শমসেরনগর ছেড়ে চলে যায়। পরে আমরা আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে শমসেরনগর সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটা ডাক বাংলো আছে, সেখানে পাকবাহিনীর ক্যাম্প ছিল সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি।’

আইনিউজ/ওমর ফারুক নাঈম

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়