নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ১২:৪৮, ৫ এপ্রিল ২০২১
লকডাউনে বাংলাদেশ
ফাইল ছবি
সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশে আবারও শুরু হলো এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’। করোনা সংক্রমণ শুরুর এক বছরের মাথায় অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দ্বিতীয়বার ‘লকডাউন’ হলো সারাদেশ।
সোমবার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে কার্যকর হওয়া এ ‘লকডাউন’ চলবে আগামী ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত। আগের দিন লকডাউনের খবর প্রচারের পরপরই মানুষের মধ্যে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। দীর্ঘ যানজটে দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পরদিন থেকে শুরু হওয়া এই সাত দিনের ‘লকডাউনে’ একগুচ্ছ বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের চলাফেরা ও সামাজিক গতিশীতলতা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার চেষ্টা করবে সরকার। এর লক্ষ্য একটাই করোনার সংক্রমণ ও প্রাণহানির লাগাম টেনা ধরা, এবং মানুষ যেনো জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পায়।
দেশজুড়ে যোগাযোগ সীমিত এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধ্যকতা তৈরি হওয়ায় এখন থেকে অনেক কিছুই করা যাবে না, মানতে হবে ‘অপ্রিয়’ কিছু নিয়মও।
গত বছর সংক্রমণ কমাতে ঘোষণা করা হয়েছিল সাধারণ ছুটি, যার মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রমণের হার কম থাকায় গত কয়েক মাসে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ছন্দ ফিরতে শুরু করে। তবে এ সময় স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষায় ঢিলেঢালা ভাব দৃশ্যামান হয়ে ওঠে। এর জেরে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত শনিবার ‘লকডাউনে’র ঘোষণা দেয় সরকার। পরদিন এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এ সময়ে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না তা সুষ্পষ্ট করে।
‘লকডাউনে’র সময় মানুষের কাজ ও চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জরুরি সেবা ছাড়া প্রায় সবকিছুই বন্ধ থাকবে। চলবে না কোনো গণপরিবহন। অভ্যন্তরীণ পথে উড়বে না বিমানও। তবে জরুরি কাজের জন্য সীমিত পরিসরে খোলা থাকছে অফিস । এ ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যবস্থায় কর্মীদের অফিসে আনা-নেওয়া করতে হবে। একইভাবে শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার শর্তে শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজ চালু রাখা যাবে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে লেনদেন সময় কমানো হয়। এ রকম ১১ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করে রবিবার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অবশ্য প্রজ্ঞাপনে লকডাউন শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। তবে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ ছুটির এই সাত দিনকে ‘লকডাউন’ বলেছেন।
বিধিনিষেধ অনুযায়ী, এই এক সপ্তাহ সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ করা যাবে। কোনও অবস্থাতেই হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খাবার গ্রহণ করা যাবে না।
১১ দফা নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, শপিং মলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে। তবে দোকানে পাইকারি ও খুচরা পণ্য অনলাইনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বাবস্থায় কর্মচারীদের মধ্যে আবশ্যিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কোনও ক্রেতা সশরীরে যেতে পারবে না। পাশাপাশি কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করতে হবে।
১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গত বছর সাধারণ ছুটির সময় সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী নামানো হয়েছিল।
সেতুমন্ত্রী তার প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান এক সপ্তাহের জন্য সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করছে সরকার।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এ কথা বলা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, দ্রুত ছড়াতে থাকা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার দুই-তিন দিনের মধ্যে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের চিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।
- [আরও পড়ুন: লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে শিল্পকারখানা]
উল্লেখ্য, গত ২৯ মার্চ করোনাভাইরাসের এই ‘দ্বিতীয় দফা’য় আক্রমণ ঠেকাতে নাগরিকদের জন্য কিছু বিষয়ে কড়াকড়ি বিধিনিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা চূড়ান্ত করেছে সরকার।
নির্দেশনাগুলো হলো-
১) সব ধরনের জনসমাগম (সামাজিক/ রাজনৈতিক/ ধর্মীয়/অন্যান্য) সীমিত করতে হবে। উচ্চ সংক্রমণযুক্ত এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হলো। বিয়ে/ জন্মদিনসহ যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে;
২) মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে;
৩) পর্যটন/ বিনোদন কেন্দ্র সিনেমা হল/ থিয়েটার হলে জনসমাগম সীমিত করতে হবে এবং সব ধরনের মেলা আয়োজন নিরুৎসাহিত করতে হবে;
৪) গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং ধারণ ক্ষমতার ৫০ ভাগের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না;
৫) সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে আন্তঃজেলা যান চলাচল সীমিত করতে হবে; প্রয়োজনে বন্ধ রাখতে হবে;
৬) বিদেশ হতে আগত যাত্রীদের ১৪ দিন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক (হোটেলে নিজ খরচে) কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে;
৭) নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী খোলা/উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনপূর্বক ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে; ওষুধের দোকানে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে;
৮) স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো মাস্ক পরিধানসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে;
৯) শপিং মলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে;
১০) সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে;
১১) অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা/ আড্ডা বন্ধ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাত ১০টার পর বাইরে বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;
১২) প্রয়োজনে বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক পরিধান না করলে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
১৩) করোনায় আক্রান্ত/ করোনার লক্ষণযুক্ত ব্যক্তির আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা অন্যান্যদেরও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে;
১৪) জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস/প্রতিষ্ঠান শিল্প কারখানাগুলো ৫০ ভাগ জনবল দ্বারা পরিচালনা করতে হবে। গর্ভবতী/ অসুস্থ/ বয়স ৫৫-ঊর্ধ্ব কর্মকর্তা/ কর্মচারীর বাড়িতে অবস্থান করে কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে;
১৫) সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা যথাসম্ভব অনলাইনে আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে;
১৬) সশরীরে উপস্থিত হতে হয় এমন যেকোনো ধরনের গণপরীক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে;
১৭) হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে ধারণ ক্ষমতার ৫০ ভাগের বেশি মানুষের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে;
১৮) কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং অবস্থানকালীন সর্বদা বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়াও সরকার করোনা প্রতিরোধ করতে লক্ষ্মীপুর-২ এবং সব ইউপি নির্বাচন স্থগিত করেছে । এছাড়াও আগামী ১১ এপ্রিল থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেনের সকল টিকেট বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংশোধনীও এসেছে ট্রেনে।
- [আরও পড়ুন: লকডাউনে বন্ধ থাকবে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল]
- [আরও পড়ুন: জেলখানায় বন্দিদের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ]
এছাড়াও, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের যেকোনো দেশ থেকে ফিরলেই যাত্রীদের সরকারি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বা সরকার নির্ধারিত আবাসিক হোটেলে (নিজ খরচে) ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সর্বশেষ, করোনা রোধ করতে জেলখানায় বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা- সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। দেশের ৬৮টি কারাগারে অধিদপ্তর থেকে বিশেষ বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।
শনিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মোমিনুর রহমান মামুন এ তথ্য জানান।
আইনিউজ/এসডি
- বেইলি রোডে আগুন : ৩ জন আটক
- এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী
- 'জাতীয় মুক্তি মঞ্চ' গঠনের ঘোষণা
- কাল থেকে যেসব শাখায় পাওয়া যাবে নতুন টাকার নোট
- এক বছরেই শক্তি, ক্ষিপ্রতা জৌলুস হারিয়ে 'হীরা' এখন বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী
- ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক
- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিকথা (প্রথম পর্ব)
- এবার ভাইরাস বিরোধী মাস্ক বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো বাংলাদেশ
- মায়েরখাবারের জন্য ভিক্ষা করছে শিশু
- ২৫ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক























