ঢাকা, বুধবার   ১০ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ২৭ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ১২:০৯, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ১২:০৯, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাগরতলের ছবির গল্প

শরীফ সারওয়ার

পরিষ্কার আকাশ রোদ ঝলমলে চমৎকার একটি দিন,সেন্টমার্টিনে আমরা বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞানীদের সাথে সাগরতলে স্কুবাডাইভিং করে সি উইড অনুসন্ধান করে ছবি তোলছি নমুনা কালেকশন করছি নানামুখী গবেষনার জন্য। প্রয়োজনীয় সবধরনের ইকুইপমেন্ট নিয়ে সবাই বোটে করে রওনা দিলাম সাগরে। বোটে করে অনেকক্ষন সাগরে ঘুরছি কিন্তু আজ সাগরতলের কোথায় নামবো তা মনের মত স্থান নির্ধারণ করতে পারছিলাম না। আন্ডারওয়াটার এক্সপ্লোরার ও স্কুবাডাইভিং বিশেষজ্ঞ আমাদের টিম লিডার আতিকুর রহমান বললেন, আজ একটু দূর সাগরেই অনুসন্ধান করবো, সেই মতেই আমাদের বোট ছুটে চলেছে দূর সাগরের দিকে .....অনেকক্ষণ পর হঠাৎ আতিক ভাই বললেন এখানেই বোট নোঙর করেন। বোট নোঙর করা হলো।

বাতাস বইছে তাই ঢেউ আছে। স্কুবা গিয়ারে সুসজ্জিত হয়ে আতিক ভাই আগে বোট থেকে ব্যাকড্রপ দিয়ে পানিতে এন্ট্রি করেন। উনি পানির নীচে পরিদর্শন করে এসে বললেন আপনারা আসেন। সবসময় উনি একা ঝুকি নিয়ে সাগরতলে গিয়ে দেখে আসেন। যদি নিরাপদ মনে করেন তবেই আমাকে নামতে বলেন। আর নিরাপদ মনে না করলে উনি আমাকে নামতে দেন না। আর এই জন্যই হয়তো আমি এখনও আছি তাই আমি উনার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ। তখনো ভাবতে পারিনি সাগরতলে আজ আমাদের জন্য কি বিস্ময় অপেক্ষা করছে। আমি আর বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোহাম্মদ শরিফ স্কুবা গিয়ারে সুসজ্জিত হয়ে বোট থেকে ব্যাকড্রপ দিয়ে পানিতে এন্ট্রি করে ধীরে ধীরে সাগরতলের মাটিতে গিয়ে পোঁছালাম। চমকে উঠলাম চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিনা প্রকৃতির এই রঙিন বিস্ময় ঠিক আমাদের বোটের নীচেই (আতিক ভাই কেমন করে পিন পয়েন্টে এনে বোট নোঙ্গর করতে বললো ভেবে অবাক হই। সপ্তাহ বা সারা মাস ডাইভিং করেও সাগরতলে এরকম একটা ডাইভিং সাইট আবিস্কার করা সম্ভব নয়)  চারিদিকে নানান ধরনের নানান রঙের gorgonian sea fan আর রঙ্গিন মাছের দল খেলা করছে, খাবার খাচ্ছে আমাদেরকে ঘিরে ঘুরছে । যেন এক স্বপ্নিল স্বর্গীয় অনুভুতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছি ।এরই মাঝে প্রয়োজনীয় ছবি তুলে যাচ্ছি ভিডিও করে যাচ্ছি। পানির ভিজিবিলিটি কম ছিল তাই বেশি দূর দেখা যাচ্ছিলোনা। সাগরতলে আতিক ভাই , শরীফ ভাই আর আমি আমাদের চোখগুলো খুজে যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য উপাত্ত। আর ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে জমা হচ্ছে দুর্লভ ছবি আর ভিডিও। সময় বয়ে যাচ্ছে শরীফ ভাই এর প্রেসার মিটার ৫০ এ নেমে এসেছে উনাকে সিগন্যাল দিলাম পানির উপরে উঠার জন্য, উনি আস্তে আস্তে পানির উপরে বোটে চলে গেলেন। স্রোতের টান অনুভব করছি একটু বেশী আর ভিজিভিলিটিও কমে এসেছে। সাগরতলে অতি সাবধানে দুজনে পাশাপাশি থেকে ছবি আর ভিডিও আর প্রয়োজনীয় সেম্পল কালেকশন করছি। একটু একটু করে দূরে যাচ্ছি নতূন কিছু পাবার আশায়। ইতিমধ্যে আমাদের প্রেসার মিটার প্রায় ১০ নেমে এসেছে,(প্রেসার মিটারে ৫০ হলেই উপরে চলে আসার নিয়ম) জলের তলে থাকা আর নিরাপদ নয় এখন উপরে উঠতেই হবে। প্রকৃতির অপার বিস্ময় পিছনে ফেলে আস্তে আস্তে আমরা নিরাপদে পানির উপর ভেসে উঠলাম। উপরে উঠেই বিশাল ঢেউ এর ঝাপ্টা খেলাম, বুঝতে পারলাম ছবি তুলতে তুলতে একটু দুরেই চলে এসেছি ।

দূরে দেখা যাচ্ছে আমাদের বোট বড় বড় ঢেউ এর মাথায় নাচছে, আতিক ভাই আমাকে সতর্ক করলেন এবং নিরাপদে কিভাবে বোটে পোঁছাতে পারব তা বুঝিয়ে দিলেন ,আমার কাছে থাকা কেমেরা আর কালেকশনকৃত নমুনার ব্যাগ আতিক ভাই এর হাতে ধরিয়ে দিলাম, ফলে উনার বুঝা ডাবল হলো, এগুলি আমার সাথে থাকলে আমি হয়তো বোটে পোঁছাতে পারব না। আমরা মাথা ঠান্ডা রেখে ধীরে ধীরে ঢেউ আর স্রোতের বিপরীতে বোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আর যাচ্ছি পথ যেন আর শেষ হয়না এদিকে আমার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে আসছে । আমি চেস্টা করে যাচ্ছি বোটে পোঁছাতে আর ঢেউ এসে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে প্রানপন চেস্টা করে বোটটি যখন ধরতে পারলাম অবশেষে যেন প্রান ফিরে পেলাম। আমার আর এক বিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট ছিলো না, বোট যদি আর ৫ ফুট দুরেও থাকতো তবে হয়তো আমি আর বোট ধরতেই পারতাম না। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট টীমের মো. শিমুল তার মোবাইলে আমাদের বোটে ফিরে আসার দৃশ্যগুলো ভিডিওতে ধারন করেছিলো ভিডিওটা যখনই দেখি বুকের ভিতরের ধুকধুককানিটা এখনো বেড়ে উঠে.........।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়