Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২৬,   চৈত্র ১৯ ১৪৩২

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ০৯:২৪, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শূন্য থেকে স্বাবলম্বী নারীযোদ্ধা মর্জিনা

মর্জিনার যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর খেলার বয়স। ১৯৯৫ সালে মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই মর্জিনাকে বিয়ে দিয়ে দেন তাঁর বাবা। বিয়ে দেওয়ার পেছনে ছিলো অভাব। মূলত অভাবের সংসার হালকা করতেই মর্জিনাকে বিয়ে দেন বাবা। কিন্তু অন্যদিকে মর্জিনার স্বপ্ন ছিলো স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের হাল ধরার। কিন্তু অভাবের কাছে হার মেনে ভাগ্যকেই মেনে নিতে হয় তাঁর।

স্বামীর সংসারে গিয়েও সুখ কিংবা আয়েশি জীবন কাটান নি মর্জিনা। সহ্য করতে হয়েছে নানা যন্ত্রণা। তবে স্বপ্ন দেখা মর্জিনা দমে যান নি এতোটুকুতেই। ছেলেবেলার স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন আবারও চাড়া দিয়ে ওঠে মনে।

শুরুটা হয় বড় বোন মেরিনা বেগমের সহায়তায়। মেরিনার সহায়তায় পোশাক তৈরির কাজ শিখেন মর্জিনা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চালিয়ে যান পড়াশোনাও। আর এই পথই যেন সাফল্যকে এনে দিয়েছে মর্জিনার দাওয়ায়। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এখন গ্রামের অসহায় নারীদেরও বেঁচে থাকার গতি দেখিয়ে দিয়েছেন এক সময়ের অসহায় মর্জিনা।

নারীরা গোল হয়ে বসে বসে পুঁথির ব্যাগ, ওয়ালম্যাট, ফুলের টবসহ নানা জিনিসপত্র তৈরি করছেন এটা হচ্ছে মর্জিনার বাড়ির দৃশ্য। হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এখন স্বাবলম্বী। আর তাঁদের এ কাজে নেতৃত্ব দেন মর্জিনা।

সম্প্রতি বগুড়া জেলার শেরপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নের মদনপুর গ্রামের মূল সড়ক থেকে এগিয়ে নারী উদ্যোক্তা মর্জিনার টিনশেডের পাকা বাড়িতে গিয়ে এমনটাই দেখা যায়। মর্জিনা জানালেন, সেলাই ও হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে মর্জিনা এখন মাসে আয় করেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। গ্রামের অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী করার পথ দেখিয়েছেন তিনি। অবসর সময়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেন মর্জিনা। তার ভাষ্য, এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০০জন নারীকে কাজ শিখিয়েছি। তারা এখন স্বাবলম্বী। পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটান তারা। এটা আমার জন্যও বেশ আনন্দের ও সুখের।

মর্জিনার এই পথচলাটা সুখের ছিল না। এজন্য তাকে অনেক কাঠ-খড় পোহাতে হয়েছে। অতীতে নিজের কঠোর পরিশ্রমের কথা যেমন জানালেন, তেমনি বললেন নানা অর্জনের কথাও।

মদনপুর গ্রামের কৃষক সুজির উদ্দিনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে মর্জিনা চার নম্বরে। মা জয়গুন বিবি গৃহিণী। ১৯৯৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় মর্জিনার। শ্বশুরবাড়িও একই গ্রামে। স্বামী বাসচালকের সহকারী (হেলপার) ছিলেন। মর্জিনা বলেন, বিয়ের পর বাবা আমায় দুই বিঘা জমি দিয়েছিলেন। ওই জমির আয় থেকে জায়গা কিনে বসতবাড়ি করেছি। ওই বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে থাকতাম।

সংসার সামলানোর পাশাপাশি লুকিয়ে লেখাপড়াও চালিয়ে যান মর্জিনা। স্থানীয় মাদরাসা থেকে ২০০০ সালে দাখিল পাস করেন। পরে উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের সহায়তায় দুই বছরের প্রশিক্ষণ নেন। ২০১০ সাল থেকে ইউনিয়ন তথ্যসেবা ও ডিজিটাল সেন্টারেও কাজ করছেন তিনি।

তবে স্বামীর সঙ্গে ঠিক বনিবনা হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে ২০১৩ সালে স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে। পরের বছর আলিম পরীক্ষা দেন, পাসও করেন। ওই বছরই জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশের তালিকায় উপজেলা পর্যায়ে ২০১৪ সালে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী নির্বাচিত হন তিনি। সেই সঙ্গে তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও তালিকাভুক্ত সংগ্রামী নারী মর্জিনা।

তিনি বলেন, এ পর্যায়ে আসতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক মানুষের কটুকথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি আমার লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি। কাছের কিছু মানুষ আমায় নীরবে সহযোগিতা করে গেছেন। তাদের জন্যই আজ আমার এখানে আসা। মর্জিনার এ সাফল্যে আনন্দিত স্থানীয়রা। মির্জাপুর ইউনিয়নের মদনপুর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মমতাজ আলী বলেন, ইচ্ছা থাকলে যে উপায় হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ মর্জিনা। সে শূন্য থেকে শুরু করেছিল।

‘নিজ চেষ্টা আর পরিশ্রমে আজকের জায়গায় এসেছে। তার সাফল্যে আমরাও যারপরনাই খুশি। তার দেখাদেখি গ্রামের ও আশপাশের অনেকেই এখন স্বাবলম্বী,’ বলেন তিনি।

সূত্র: বাসস

আইনিউজ/এইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়