ঢাকা, শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ৩১ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ১২:৪০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ১২:৪০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আবুসিনা ধ্বংসের নেপথ্যে এই নগরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি

আব্দুল করিম কিম

আবুসিনা ছাত্রাবাস ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে । এ ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য এ নগরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পরিশ্রম করেছেন । নিজেদের পদ-পদবী ব্যাবহার করে শত বছরের প্রাচীন একটি ভবনের প্রতি যে বৈরিতা এরা দেখিয়েছেন- তা ছিল বিস্ময়কর ! এ নিয়ে একদিন হয়তো বিস্তারিতভাবে আলোচনা হবে, গবেষণা হবে। এসব ঘটনা মুছে যায় না । এখনো মানুষ 'মধুবন আন্দোলন' নিয়ে কথা বলে ।

আবুসিনা ছাত্রাবাস রক্ষায় গত ৭ মার্চ থেকে ফেইসবুক পোষ্টের মাধ্যমে আমার সংযুক্তি । পরবর্তিতে আন্দোলনের নানান পর্যায়, নানান ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে চলে যায় প্রায় ৫ মাস সময় । এই সময়ের নানান স্মৃতি । মানুষের দায়িত্বশীলতা দেখেছি, মানুষের কূপমুন্ডকতা দেখেছি । পাঁচ মাসে অসংখ্যবার ভবনটির আঙিনায় দাঁড়িয়ে ইতিহাসের স্পর্শ খুঁজেছি ।

নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামকে তুচ্ছো করে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ভবন ভাঙ্গার কাজ চলতে থাকে । আমরা যখন শেষবার ভবনটি বাঁচানোর আশা নিয়ে মিছিল সহ ভবন প্রাঙ্গনে যাই তখন ভবনটি প্রানহীন । ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা শুরু হওয়ার পর ওই এলাকা দিয়ে যেতে খারাপ লাগে । মাদ্রাসা মাঠে বিভাগীয় বৃক্ষমেলায় ভুমিসন্তান বাংলাদেশ-এর বৃক্ষভিক্ষা কর্মসুচিতে যাওয়ার একাধিকবারের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছি । যেতে ইচ্ছে হয়নি । এখানে একদিন আঠারো তালা হাসপাতাল হলে যেতে তো হবে ।

কোন কিছুই অবিনশ্বর নয় । সবকিছুই একদিন শেষ হয় । দেশ শেষ হয়, সভ্যতা শেষ হয় । আর এতো ভবন ! এই ভবনো একদিন হারিয়ে যেতো । এমন স্থাপনা একদিন হারাবে এটা সত্য । কিন্তু হারাবে জানার পরেও বাঁচানোর চেস্টা করতে হয় । সব মানুষ একদিন মরবে জানার পরেও বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয় । যার কাছে যা বাঁচানো জরুরী, সে তা বাঁচাতে চায় । আমাদের কাছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মাক্ষর এই ভবন বাঁচানোর চেষ্টা করাটা জরুরী ছিলো । কারন আমরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছি । সিলেটের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ-এই ভবন রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে । অধিকাংশ কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ এই ভবনের বাঁচানোর জন্য কথা বলেছে । অনেকে আকাশে শুকুনের ডানা ঝাপটানো দেখে বুঝেছে, বাঁচানো যাবে না । এরা তখন নিরব হয়ে গেছে ।

আমরাও জানতাম বাঁচানো কঠিন তবুও মূমূর্ষ ভবনটিকে বাঁচাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলাম । আমরা চেয়েছিলাম শুশ্রূষা করে প্রায় দেড়শত বছর বয়সী ভবনটিকে আরো কিছুদিন টিকিয়ে রাখতে । কিন্তু একটি গোষ্টি ভবনটি গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছে । এদের স্বার্থ ছিল । কয়েক কোটি টাকা মূল্যের এই ভবন মাত্র কয়েক লাখ টাকায় বিনিময় মূল্যে ভেঙ্গে নিতে দেয়া হয়েছিল । আমাদের আন্দোলনে এরা চোখে অন্ধকার দেখে । তখন এরা কৌশলে কয়েকটি পক্ষকে মাঠে নামায় । এদের মধ্যে দুটি পক্ষের পুরো ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার দাবি ছিল আর আরেকটি পক্ষের দাবি ছিলো- 'পুরো বাঁচানো লাগবে না, মেরে ফেলো তবে মাথাটা ঐতিহ্যের স্মারক হিসাবে রাখতে হবে" । সরকার মাথা বা পাছা কিছুই রাখেনি । ডোমদের হাতে তুলে দিয়ে বলেছে সব শেষ করে দাও । ডোমেরা সব শেষ করে দিয়েছে ।

এতোদিন পরে আজকের এই নিউজ দেখে ভালো লাগলো । কেউ অন্তত 'ঐতিহ্যের স্মারক রক্ষা'র অভিনব দাবীদারদেরকে প্রশ্ন করলো- মাথা না পাছা পেলেন ? সত্য কথা এরা মাথাও না পাছাও না, অন্য কিছুর জন্য এই হুতাশন ছিক্রিয়াই । যা এরা পেয়েছে । তাই আর কোন প্রতিক্রিয়া নেই । আমরা পুরো ভবন চেয়েছি । নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চেয়েছি । জনমত সৃষ্টি করে চেয়েছি । আমাদের সাথে এই নগরের বাছাই করা মানুষদের সংহতি ছিল ।

এরা ভবনের স্মারক রক্ষার জন্য মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি নিয়ে ছুটে গিয়েছিল । আবু সিনা ছাত্রাবাস ভবন রক্ষার আন্দোলন শুরু করা একজন পরিবেশকর্মীর নাম উল্ল্যেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছিল, সিলেটের ৯৯% ভাগ মানুষ ভবন ভাঙ্গার পক্ষে । শুধুমাত্র "...সহ কিছু ছেলেপেলে ভবনটি রক্ষার নামে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে বাঁধা দিচ্ছে । যদিও ঐ স্মারক কমিটির নেতা ৯৯% মানুষের মতামত কোন জরিপ থেকে নিয়েছিলেন এ নিয়ে মুখোরোচক আলোচনা আছে । সেই নেতার পরিবারের ৯৯% ভাগ লোক ছিলেন ঐতিহ্য রক্ষার পেছনে । ঘরের জরিপ অবজ্ঞা করে তিনি ভাঙ্গারীদের জরিপকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন ।

সেদিন এরা খুব পরিকল্পিতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিল । স্মারক রক্ষার পক্ষ গিয়েছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিছু ভুঁইফোঁড় মানুষ নিয়ে স্মারকলিপি জমা দিতে । এরা স্মারকলিপি দেয়া শেষ করতেই আরেক পক্ষের নেতা, যিনি পুরো ভবন ভেঙ্গে দ্রুত আবু সিনার নামে হাসপাতাল করার দাবিতে অনলাইন-অফলাইন-চ্যাটলাইনে ব্যাস্ত তিনি মাননীয় মন্ত্রীর মুখে বুম ধরে প্রশ্ন- হাসপাতালের কাজ কবে শুরু হচ্ছে । ব্যাস মন্ত্রী দেখলেন দুই মেরুর দুই পেশাজীবী নেতা, কিছুদিন পূর্বেও যারা একের বিরুদ্ধে অন্যে অভিযোগ করেছে আজ একসুরে কোরাস গান গাইছে 'হাসপাতাল চাই, হাসপাতাল' । মন্ত্রী খুশির ঠেলায় এই মনে করেন হেলিকপ্টারে ঘুরতে এসে বলে দেন দ্রুত হাসপাতালের কাজ শুরু হচ্ছে । ব্যাস দুই বৈরী শক্তি এক হাসপাতালের রোগী । দুই দিন আগে কেক কাটতে এক ফ্রেমে যারা আসতে নানান নখরা দেখিয়েছে, এরাই এক ফ্রেমে দাঁড়িয়ে পানি পান করিয়েছে ।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক , বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

লেখকের ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়