ঢাকা, মঙ্গলবার ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৭ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮:৫৭, ৪ অক্টোবর ২০২০

লিবিয়ার হামলায় আহতদের ফেলে দেওয়া হয় ময়লার স্তুপে

লিবিয়ার হামলা থেকে বেঁচে ফেরত আসা ফিরোজ বেপারী

লিবিয়ার হামলা থেকে বেঁচে ফেরত আসা ফিরোজ বেপারী

লিবিয়ার মিজদা শহরে মানবপাচাকারী মাফিয়াদের হামলার শিকার হয়ে আহত হওয়া বাংলাদেশিদের ময়লার স্তুপে ফেলা দেওয়া হয়। গত ২৮ মে এ হামলার  থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগিদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা যায়।

লিবিয়ার ওই হামলায় গুরুতর আহত ১২ বাংলাদেশির মধ্যে নয়জনকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে তারা হলেন- ফিরোজ বেপারী, জানু মিয়া, ওমর শেখ, সজল মিয়া, তারিকুল ইসলাম, বকুল হোসেন, মোহাম্মদ আলী, সোহাগ আহমেদ এবং সাইদুল ইসলাম। যাদের আনা সম্ভব হয়নি তারা হলেন- বাপ্পীদত্ত, সম্রাট খালাসী ও সাজিদ।

এর মধ্যে জানু মিয়ার বক্তব্যে উঠে এসেছে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানানো এই নির্যাতনের চিত্র। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায়। স্থানীয় এক লোকের মাধ্যমে তার ঢাকার মতিঝিলে অফিসের সোহাগ আর শ্যামলের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারা প্রথমে জানু মিয়াকে ভারতের ভিসা করিয়ে দেন।

জানু মিয়া বলেন, ভারতের ভিসা করিয়ে দেয়ার পর ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাকে ঢাকায় আসতে বলে। ওইদিন রাতেই বাসে করে নেওয়া হয় বেনাপোল বর্ডারে। পরেরদিন সকালে বেনাপোল বর্ডার ক্রস করে আমাকে নেওয়া হয় কলকাতা নিউ মার্কেট। ওই এলাকার নিউ সিটি হোটেলে তিনদিন থাকি। তিনদিন পর কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে যাই মুম্বাইতে। মুম্বাইতে এক বাংলাদেশি দালাল আমাকে দুবাইয়ের ভিসা ও টিকিটের ব্যবস্থা করে দেয়। পর দিনই আমি মুম্বাই থেকে দুবাই যাই।

‘দুবাইতে আবার শ্যামল আর সোহাগের পরিচিত এক দালাল আমাকে রিসিভ করে শারজাহ তার নিজের বাড়িতে রাখে। সেখানে ১০ দিন অবস্থানের পর আমাকে পাঠানো হয় মিশরে। মিশরে যাওয়ার পর সেখানে স্থানীয় দালাল আমিসহ প্রায় ১০০ বাঙালিকে নিয়ে যায় লিবিয়ার ব্যানগাজি এয়ারপোর্টে। সেখানে যাওয়ার পর সোহাগ আর শ্যামলের লিবিয়ান দালাল ছিলো। ওই দালাল আমাকে রিসিভ করে। সেই দালাল আবার আমাদেরকে আরেক বাঙালি দালাল রাহাতের কাছে হস্তান্তর করে।’

ওইখানে একটা ক্যাম্পে নেওয়ার পর আমিসহ আরো দু’জনের কাছ থেকে ৫০ ডলার করে নেয় এক সপ্তাহের খাওয়ার খরচ হিসেবে। তখন আমি সোহাগকে ব্যাপারটা জানালে সোহাগ বলে, তুই চিন্তা করিস না ব্যাপারটা পরে দেখবো। এরপর তারা আর আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি।’

তিনি বলেন, এক সপ্তাহ পর যখন আমার টাকা শেষ হয়ে যায় তখন ওই দালাল আমাদের খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর আমি সোহাগ আর শ্যামলকে ফোন দিলে তারা আমার ফোন রিসিভ না করে নাম্বার বন্ধ রাখে। বাধ্য হয়ে আমি বাড়িতে ফোন দিলে আমার পরিবার ৫০ ডলারের পরিমাণ টাকা বাঙালি দালালের বাড়িতে পাঠায়। টাকা পেয়ে তারা আবার দুই দিন পর আমাকে খাবার দেয়। এরপর সেখানে আরো এক সপ্তাহ থাকার পর আমাদেরকে আরেক দালালের বাসায় আরো এক সপ্তাহ রাখা হয়।

এরপর জানুয়ারির ২৭ তারিখ আমাকে একটা কোম্পানিতে চাকরি দেওয়া হয়। দেশে আমাকে বলা হয়েছিল, সেখানে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করলে আমার বেতন হবে ৩০ হাজার টাকা। ওভারটাইমের ব্যবস্থা আছে। সেটা করলে বেতন ৪০ হাজার টাকার বেশি হবে। কিন্তু আমি সেখানে বেতন পেতাম ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

‘পরে ব্যানগাজি থেকে আমরা চেষ্টা করলাম ত্রিপলিতে যেতে। কেননা, ব্যানগাজিতে কাজের রেট কম। আর ত্রিপলিতে কাজের রেট বেশি। ব্যানগাজিতে যেই কাজের রেট ৫০ টাকা, ত্রিপলিতে সেই কাজের রেট ৬০ থেকে ৭০ টাকা।’

এই ব্যাপারে আমি যোগাযোগ করি তানজিরুলের সাথে। সেও আরেক দালাল। তার গ্রামের বাড়ি আমার গ্রামের বাড়ির সাথেই। তার সাথে আমার ৬০ হাজার টাকার মৌখিক কন্টাক হয়। ব্যানগাজি থেকে ত্রিপলির দূরত্ব প্রায় ১২০০ কিলোমিটার। এ রুটে সড়ক পথে প্রায়ই বিভিন্ন দুর্ঘটনা হয়। এমনকি কখনো কখনো মানুষকে মেরেও ফেলে। তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে বলে সড়কে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার আমার। এ জন্য অন্যদের তুলনায় বেশি টাকা নেয় সে। ব্যানগাজি থেকে ত্রিপলি যেতে অন্য দালালরা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা নিলেও তানজিরুল ৬০ হাজার টাকা দাবি করে। এই বেশি টাকা দিলে পথে আর কোন সমস্যা হবে না।

পরে আমি দেশে যোগাযোগ করলে তানজিরুলের বড় ভাইয়ের কাছে আমার বড় ভাই ৬০ হাজার টাকা দেয়। এরপর ১৫ মে আমরা ভৈরবের আট ও মাদারীপুরের দুইজনসহ মোট ১০জন একটা মাইক্রোতে করে ত্রিপলির উদ্দেশে রওনা দেই। রাস্তায় আরো দুইটা গাড়িতে করে আরো ২০ জন আমাদের সাথে যোগ হয়। তিন গাড়িতে থাকা মোট ৩০ জন, আমরা সবাই বাঙালি ছিলাম।

ব্যানগাজি থেকে ত্রিপলি যেতে প্রায় তিন-চারদিন লাগে। কেননা পথে হামলার আশঙ্কা থাকলে রাস্তায় দীর্ঘ বিরতি দিতে হয়। ত্রিপলি শহরের আগে আরেকটা শহর আছে নাম মিশ্রতা। এই মিশ্রতা শহরে ঢুকার একটু আগেই ১৬ মে সন্ধ্যায় মাফিয়ারা আমাদের গাড়ি বহরে হামলা চালিয়ে ২৯ জনকে নিয়ে যায়। এরমধ্যে একজনকে নিতে পারেনি, তিনি গাড়ির মধ্যেই কৌশলে লুকিয়ে ছিলেন।

আমাদেরকে নিয়ে মাফিয়ারা একটা ক্যাম্পে আটক করে রাখে। সেখানে আমাদের কোন খাবার দেওয়া হতো না। শুধু সন্ধ্যার সময় একটু পানি দেওয়া হতো। এভাবে তিনদিন পার হওয়ার পর মাফিয়ারা আমাদেরকে অন্য আরেকটা গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে ২০ মে নতুন মাফিয়াদের আস্তানায় গিয়ে দেখি সেখানে আরো নয়জন বাঙালি আগের থেকেই বন্দি আছেন। আমরা ২৯ ও আগের নয়জন মিলে সেখানে বাঙালি ছিলাম ৩৮ জন। আর সুদান, নাইজেরিয়া ও ঘানার ৩০ থেকে ৩৫ জন নারীসহ তারা প্রায় দেড়শ জনের মতো ছিলেন।

আমাদের সবাইকে বড় একটা রুমে আটকিয়ে রেখে প্রচুর নির্যাতন চালায়। তখন আমরা একজন আফ্রিকান নাগরিকের মরদেহ দেখতে পাই, মূলত মাফিয়ারা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। তখন আমাদেরকে বলা হয়, তোরা যদি প্রতিজন ১২ হাজার করে ইউএস ডলার না দেস, তাহলে তোদেরও একই অবস্থা হবে। তাড়াতাড়িতে বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা নিয়ে আয়। 

তারা প্রতিদিনই দুই তিনবার করে আমাদেরকে মারধর করতো। কোনো খাবার দিতো না। শুধু রাতে স্থানীয় এক ধরনের খাবার দিতো যা খাওয়ার যোগ্য না। আবার না খেলেও মারধর করতো। তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই তিনজন করে প্রতিদিন মারাও যেত। আর আমাদের বলা হতো, তোরা টাকা না দিলে একই অবস্থা তোদেরও হবে।

এরপর স্থানীয় সময় ২৭ মে দুপুর আনুমানিক ১ টার দিকে ক্যাম্পে এসে লিবিয়ার মাফিয়ারা সবাইকে মারধর করে চলে যায়। পরে আবার বিকেল ৪টার দিকে আসে। বিকেলে যখন মাফিয়ারা মারধর শুরু করলো তখন ঘানা, নাইজেরিয়া ও সুদানের লোকজন উল্টো মাফিয়ার উপর হামলা চালালে সে মারা যায়। তখন মাফিয়ার লোকজন এসে আমাদের উপর এলাপাতাড়ি গুলি চালায়। এসময় ২৬জন বাঙালিসহ আমরা ১২ জন মারাত্মকভাবে আহত হই।

পরে সেখান থেকে আমাদের উদ্ধার করে একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে সেখানে রাখেনি। চিকিৎসকরা বলেছেন, এদের বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। এরপর ওইখান থেকে অন্য একটা হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেও আমাদেরকে রাখা হয়নি। পরে ভোর বেলায় আমাদের ১২ জনকে মরুভূমির একটি ময়লার স্তুপে ফেলে দেয়া হয়।

সেখান থেকে আমরা দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার হাটার পর এক উট ছড়ানো সুদানি নাগরিকের বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেখানে আমাদেরকে এক লিবিয়ান নাগরিক দেখতে পেয়ে সেনাবাহিনীকে খবর দেয়। সেনাবাহিনী এসে আমাদের ত্রিপলি ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে ভর্তি করানোর পরও আমাদের চিকিৎসা শুরু করানো হয়নি। শুধু হাসপাতালের বারান্দা আমদের ফেলে রাখা হয়।

এরপর আমাদের দূতাবাসে খবর দেওয়া হলে তারা এসে আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এরপর রাত ১টায় আমার অপারেশন হয়। একেকজনের প্রায় ২ থেকে পাঁচটি পর্যন্ত গুলি লাগে। মাফিয়ারা আমাদের লক্ষ্য করে ককটেল ছুঁড়ে মারে। এতে আমাদের একজনের দুই আঙুল হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমার পেটের বাঁ দিক দিয়ে গুলি ঢুকে ডান দিক দিয়ে বের হয়ে যায় বলেন- জানু মিয়া।

স্ট্রেচার ভর দিয়ে সিআইডির কার্যালয়ে ফিরোজ বেপারী জানান, এই হামলায় আমি চিরতরে পঙ্গু হয়ে গিয়েছি। সারাজীবন আমাকে পঙ্গুত্ব নিয়েই বাঁচতে হবে। নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য বদলের জন্য লিবিয়ায় গিয়েছিলাম। পরিবারের বোঝা হয়ে ফিরে আসলাম। যারা আমাদের সাথে এমন প্রতারণা করেছে আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

এদিকে, সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি আবদুল্লাহ হেল বাকী জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে সিআইডি তদন্ত করছে ১৫টি মামলার। এরইমধ্যে ৪৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া অন্য যেসব সংস্থা কাজ করছে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যাদেরকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তারা যাদের নাম বলবে তাদেরকে খুঁজে বের করা হবে। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত ৮ থেকে ১০ জন আসামিদের গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।

গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে মানবপাচারকারীদের হাতে ২৬ বাংলাদেশি বাংলাদেশীসহ ৩০ জন মারা যান। গুরুতর আহত হন ১২ বাংলাদেশি।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়