ঢাকা, শনিবার ২২ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৬ ১৪৩৩

রিপন দে

প্রকাশিত: ১৯:৫৪, ২০ জুন ২০২১
আপডেট: ২১:১৭, ২০ জুন ২০২১

যার সাথে কথা বলে অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী

কে এই শিলা গুহ?

প্রধানমন্ত্রীর সাথে লাইভে কথা বলছেন শিলা গুহ। ছবি: আইনিউজ।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে লাইভে কথা বলছেন শিলা গুহ। ছবি: আইনিউজ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২য় পর্যায়ে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলে সবার দৃষ্টি কেড়ে দেশব্যাপ আলোচিত হয়েছেন বীরাঙ্গনা শিলা গুহ। শিলা গুহের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার কথায় অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান্না গোটা অনুষ্ঠানকে আবেগমথিত করে রাখে।

অনুষ্ঠানে শিলা গুহ বলেন, “যুদ্ধের সময়ও তিনি বুঝেননি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেষ বয়সে শিলা গুহদের দেখে রাখবেন। তিনি বলেন “কালকে ছিলাম পথের ভিখারি আজকে হলাম (ঘর পেয়ে) লক্ষপতি। স্বর্গ থেকে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গমাতা আজ এই খুশির মুহূর্তটি দেখছেন এবং তাঁদের আত্মা শান্তিতে ভরে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যেন করোনা ভাইরাস কিংবা কোনো বিপদ আক্রান্ত করতে না পারে এজন্য তিনি প্রতিদিন দুই টাকার মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে আসছেন। এইসময় বীরাঙ্গনা শিলা গুহ তার বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শ্রীমঙ্গলে তার দেয়া ঘর দেখতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন প্রধানমন্ত্রী সেখানে গেলে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরা দিয়ে তাঁকে তরকারি রান্না করে খাওয়াবেন। এ সময়ে শ্রীমঙ্গলসহ সকল অনুষ্ঠানস্থল তুমুল করতালিতে মুখরিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু কে এই শিলা গুহ? কি তার জীবন কাহিনী?  কিভাবে তিনি বীরাঙ্গনা হলেন? কি ছিল তার প্রতি নির্যাতনের ভয়াবহতা? 

যাত্রা শিল্পী শিলা গুহের বাড়ি ছিল বাগেরহাট। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন কুড়িগ্রামের একটি যাত্রা দলে। কুড়িগ্রামের অলিপুর বালিকা বিদ্যালয়ে থাকাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নির্যাতিতা হন শিলা তখন তার নাম ছিল শিলা সাহা পরে পিরোজপুরের যতীন গুহকে বিয়ে করে শিলা গুহ নাম ধারণ করেন। 

পাকিস্তানিরা মৃত ভেবে ফেলে রাখে তাই বেঁচে যান, নির্যাতনের কথা জানতে পেরে দুই মেয়েসহ শিলা গুহকে ফেলে যান স্বামী যতিন। জায়গা হয়নি বাগেরহাটে বাবার বাড়িতে। আবারও যোগ দেন যাত্রা দলে। বিয়ে দেন দুই মেয়েকে, এরই মধ্যে বয়স বাড়তে থাকে, কমতে থাকে কাজ করার ক্ষমতা। দুই মেয়ের এক মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে ফিরে আসে মায়ের কাছে। মেয়েকে নিয়ে শেষ দিনগুলিতে মানুষের ঘরে ঘরে কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন শিলা গুহ। যদিও আজ তিনি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া একটি ঘর পেয়ে আনন্দিত। 

শিলা গুহ জানিয়েছেন তার জীবনের নির্যাতনের কথা তার করুণ ইতিহাসের কথা। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে যাত্রাদলের সঙ্গে কুড়িগ্রামে ছিলাম। দলের সঙ্গে অলিপুর স্কুলের একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা হয়। পাশেই নাটমন্দির। সেখানে যাত্রাপালা হওয়ার কথা ছিল। এই সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

তখন এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষদের পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দিত। এছাড়া তরুণী ও কম বয়সী গৃহবধূদের খান সেনাদের হাতে তুলে দিত।

অলিপুরের রাজাকার শাহাব উদ্দিনসহ তার অন্য সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনাদের নারী সরবরাহ করত বলে স্থানীয়রা জানান।

বীরাঙ্গনা শিলা গুহ

একদিন সন্ধ্যার রাজাকাররা একটি জিপে করে পাকসেনা নিয়ে হাজির হয় অলিপুর গার্লস স্কুলে। যাত্রা দলের পুরুষরা তখন বাইরে ছিল। শিলা তখন স্কুলের বারান্দায় বসে ছিলেন। অস্ত্রের মুখে শিলা, সবিতা ও মিনু নামে যাত্রাদলের তিন তরুণীকে ধরে নিয়ে যায় স্থানীয় ডাক বাংলোয় সেনাবহিনীর ক্যাম্পে। এখানে আরও কয়েকজনের সঙ্গে শিলা নির্যাতনের শিকার হন। একাধিক সেনাসদস্যের ধর্ষণের শিকার হন তিনি।

দিনের পর দিন শিলা ও অন্য তরুণীদের আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে পাকিন্তানি সেনারা। কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে যেতেন তিনি। ওই অবস্থায় কখনও সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে, কখনও বা গরম চায়ের কাপে আঙুল ডুবিয়ে জ্ঞান ফেরাত সেনাসদস্যরা।

শিলা জানান, এভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন জ্ঞান না ফিরলে তারা শিলাকে মৃত ভেবে পাশে একটি ধান ক্ষেতে ফেলে দেয়। পরদিন সকালে সেখান থেকে স্থানীয় আবুল হোসেন ও তার ভাই সাত্তার লাশ দেখতে গিয়ে দেখেন শিলার শ্বাস রয়েছে। তখন তারা শিলাকে তাদের বাড়ির পাশে একটি হিন্দু বাড়িতে রেখে ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ করেন। তাদের দেখাশোনার জন্য জানানো হয় তাদের দলের মিনু ও তার স্বামী সুবাসকে। এই খবর খান সেনাদের কাছে গেলে তারা শিলাকে ক্যাম্পে পাঠাতে বলে। কিন্তু আবুল হোসেন ও সাত্তার তাকে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং আবুল পরে মধু নামে এক লোককে দিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। এরপর মধু পরিবারের লোকজনসহ শিলা ভারত চলে যান।

শিলা জানান, দেশ স্বাধীনের পর দেশে ফিরে শিলা বাগেরহাটের পেয়াজহাটির কচুর হাটখোলায় নিজের বাড়িতে আসেন। বাবা বিহারী লাল সাহা ইতিমধ্যেই মেয়েকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ পান দলের লোকজনের কাছে। অন্য ছেলে মেয়েদের কথা চিন্তা করে বাবা তাকে বাড়িতে জায়গা দেননি। 

শিলা বলেন, কয়েক বছর পর যাত্রাদলের গাড়ি চালক যতীন গুহের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শিলা সাহা থেকে তার পদবী হয় শিলা গুহ। তাদের সংসারে দুটি মেয়ে হয়। কিন্তু ছয় বছর পর স্বামী যতীন গুহ শিলার নির্যাতনের বিষয় জানতে পারেন। এরপর স্বামী যতীন পিরোজপুরে মাকে দেখতে যাওয়ার কথা বলে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। স্বামীকে বিভিন্ন স্থানে খুঁজে না পেয়ে শেষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল এসে আশ্রয় নেন শিলা। সেখানে গৃহস্থালী কাজ করে জীবন কাটাতেন। 

শিলা আরও জানান, ভারত থেকে ফিরে তিনি মিনারভা, নিউ মিনারভা, বনশ্রী, গীতাশ্রী, রংমহল, বঙ্গশ্রী, মুনলাইট, আর্জ অপেরা ও সাধনাসহ অনেক যাত্রা দলে কাজ করেছেন। আবার যাত্রার দুর্দিনে মানুষের বাসায় কাজ করে দুই মেয়েকে বড় করে তুলেন। কষ্ট করে বিয়েও দেন। বিয়ের পর বড় মেয়ে স্বামীর বাড়িতে সংসার করলেও ছোট মেয়ে এক সন্তান নিয়ে ফিরে আসেন তার কাছে।

শিলাগুহকে প্রধানমন্ত্রীর ঘর দেয়ার আগে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম তার তথ্য পান স্থানীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, উনার কথা প্রথমে জানতে পারি শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তীর মাধ্যমে। সেই থেকে তার জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল। অন্তত প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া একটি ঘর তার জন্য আমরা বরাদ্ধ করতে পেরেছি এটা আনন্দের, সেই সাথে আমরা গর্বিতও। 

এই বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, বীরঙ্গনা শিলাগুহের কান্না ও কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীর চোখে জল এসেছে, সেই সাথে সারাদেশের মানুষের চোখ ভিজেছে। তবে শিলা গুহের আজকের কান্না ছিল আনন্দ অশ্রু। দেশের জন্য শিলা গুহ যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই ক্ষত পূরণ হবার নয়। তবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের কারণে তার মাথা গুজার জন্য একটি ঘর দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। শিলা গুহের পাশে আমি ব্যক্তিগত ভাবে এবং জেলা প্রশাসন আজীবন থাকবে। যখনই তার কোন প্রয়োজন আমরা জানতে পারবো তার পাশে দাঁড়াবো।

আইনিউজ/রিপন দে/এসডি

আইনিউজে শিলা গুহের ভিডিও-

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়