ঢাকা, সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ২ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ১৫:৪১, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আপডেট: ১৭:০৯, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মধুপূর্ণিমায় টাঙ্গুয়ার হাওরে জ্যোৎস্না স্নান

রাজন চন্দ, তাহিরপুর

বর্ষায় অথৈ জলের রূপালি ঢেউ, ছোটবড় নাও। জলের বুক ফুঁড়ে উঁকি দেয় হিজল-করস বৃক্ষরাজি। হাওরের বিলসমূহে চলে রঙের বদল। আকাশের রঙে রূপবান হয়ে ওঠে হাওরগুলো। দেশীয় ও দূরদেশ থেকে আসা পাখির নানা বর্ণের রূপ মাধুর্য্য থেকে তখন চোখ ফেরানো যায় না। হাওরের গভীরে ছোটা-বড় মাছের ঘাই। শালুক, শাপলাসহ নানা জাতের উদ্ভিদের বুক চিরে ডিঙি নৌকা নিয়ে ভাওয়াইয়া গানের সুরে আর বৈঠার ঠানে মাঝি মুগ্ধ করে তোলে আশপাশের পরিবেশ আর প্রকৃতিকে। আর মধুপূর্ণিমায় হাওরে জ্যোৎস্না স্নান নিয়ে আসে স্বর্গীয় অনুভূতি। প্রকৃতির এই হাতছানি পর্যটকদের আমন্ত্রণ জানায় তার মোহময় সৌন্দর্য্যরে দিকে। হাওর-জল যেন জ্যোৎস্না অবগাহেন ডাকে দূরের মানুষকে।

মধুপূর্ণিমায় টাঙ্গুয়ার হাওর

১২ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর মধুপূর্ণিমা। আর মধুপূর্ণিমায় মানেই টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের মিলন মেলা। টাঙ্গুয়ার হাওর সম্পর্কে  হয়তো জেনেছেন আগেই। এটি রামসার অঞ্চল। রামসার হলো বিশ্বব্যাপী জৈব পরিবেশ রক্ষার এক সম্মিলিত প্রয়াস। বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট এ হাওরের আরেক নাম– "নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল"।

হাওরে ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০ প্রজাতির সরীসৃপ পাওয়া যায়। টাঙ্গুয়ার হাওর বিশাল উন্মুক্ত মিঠাপানির জলাশয়। এর আয়তন প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার। মিঠাপানির সমুদ্র বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রতি বর্ষা মৌসুমে হাওরে ঢল নামে পর্যটকদের। চলতি মাসের (সেপ্টেম্বর) ১২ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ঢল বেড়ে যাবে কয়েকগুণ।  কারণ হল মধুপুর্ণিমা। আর এই মধুপুর্ণিমাতে আসতে পারেন আপনিও।

মধুপুর্ণিমাতে কুলকিনারা ছাড়া বিশাল জলরাশির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে জীবনানন্দ দাশের "আমি যদি হতাম বুনোহংস, বুনোহংসী হতে যদি তুমি" আবৃত্তি করতে করতে দেখতে পারেন,"নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালী ফুলের মতো অজস্র তারা"। মাথার উপরে থাকবে অসীম আকাশ।

এমন অসীম আকাশের দিকে চেয়ে মনে হবে "শুন্যতাই হয়ত প্রকৃত ঈশ্বর"- চাণক্য দা'র কবিতা। কিংবা আমার মগ্নতা ভেঙে দিয়ে দূরে লাফিয়ে উঠবে ব্যাঙ। চমকে যাবেন আপনি। ফিরে আসবেন বাস্তবতায়। অসীম আকাশ থেকে চোখ চলে যাবে খুব দূরে দিগন্তের কাছাকাছি। সেখানে হিজল আর করচের শৃংখলিত সারি। তার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে মনে হবে, "তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি রয়ে যাবো এই বাংলায়"। রুপোলি চাঁদের অবারিত জ্যোৎস্না কাঁচের মত স্বচ্ছ জলে মরীচিকার সৃষ্টি হবে। মনে হবে কোন দূরে বেহুলা ভেলায় করে লখিন্দরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন টাঙ্গুয়ার হাওর পারের ৪৬ টি গ্রাম

চাঁদের আলোয় নৌকার ছাউনি বসে চোখে পড়বে টিমটিমে আলো জ্বেলে হাওরের বুকে ভেসে বেড়ানো মাছধরার অনেক নৌকা।  হয়ত কানে আসবে কোন এক মাঝির বা জেলের গলায়, "মাঝি বাইয়া যায়, অকুল দরিয়ায় বুঝি কেউ নাই রে"। বা "ওরে সাম্পানের নাইয়া, আমারে দে দে ছাড়িয়া"। এমন সময় অমৃত জ্যোৎস্নায় হাওরের জলেখেলায় নামতে পারেন।

নৌকা নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন টাঙ্গুয়ার হাওরের আশেপাশের ৪৬ টি গ্রামে। শীতে যেখানে পানি থাকে না, স্থানীয় কৃষকরা তখন ফসল ফলায় বর্ষায় ডুবে যাওয়া সেসব স্থানে। সেখানে গিয়ে স্বচ্ছ জলে মাটির তল দেখতে পারবেন।

ঘুরতে পারেন নানা দর্শনীয় স্থান

চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে  নয়নাভিরাম এই হাওরে জোছনাবিলাসের পাশাপাশি আরো দেখতে পারেন সিরাজ লেক (নীলাদ্রি), বারিক্কা টিলা, জাদুকাটা নদী, লাকমাছড়া  ও শিমুল বাগান । পাশেই আছে অদ্বৈত মহাপ্রভুর বাড়ি ও শাহ আরেফিনের মাজার। এখানে পর্যটকদের জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরের আশেপাশের তাহিরপুর,জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশা উপজেলার প্রায় হাজারো নৌকা রয়েছে যা ভাড়ায় পাওয়া যায়।

হাওরের বুকে নৌকায় রাত্রি যাপন

বিশাল হাওরের জলরাশির বুকে নৌকায় রাত্রি যাপন করে জোছনা উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের সমাগম প্রতি বছরের সারা বর্ষাজুরেই। তবে পর্যটকদের আগমন বেড়ে যায় পূর্নিমার সময়। পরিবার বা বন্ধুবান্দব নিয়ে আসতে পারেন আপনি। নিজেরাই সব আয়োজন করতে পারেন । এর পাশাপাশি ফেইসবুক ভিত্তিক বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপ আছে যারা ট্যুরের সব আয়োজন করে জনপ্রতি ৩৩ শ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার ভেতরে।

এ বিষয়ে ফেইসবুক ভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপ “বাঙ্গাল: bangal travelers”  -এর মডারেটর নিশাত মৃধা আইনিউজকে বলেন, ‘১৩ তারিখে মধুপূর্নিমায় জ্যোৎস্না বিলাসের জন্য আমরা দুইটি নৌকা ভাড়া নিয়েছি। মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রেখে জনপ্রতি ৩৬০০ টাকা নিচ্ছি আমরা। এই টাকার ভেতরে একজন পর্যটকের ঢাকা থেকে ঢাকা যাতায়াত, ৬ বেলার মূল খাবার, নাস্তা ও নৌকা ভাড়াসহ যাবতীয় সব সুযোগ সুবিধা থাকবে। যারা সাঁতার জানেনা তারা পাবে লাইফ জ্যাকেট।’

প্রতি পূর্ণিমার মত চলতি মাসের মধুপূর্নিমাতেও ( ১২, ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বরের) পর্যটকদের ব্যাপক আগমন ঘটবে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে তাহিরপুর থানার ও সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ ২টি টিম গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় বিভিন্ন নৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকার ভাড়া নির্ধারিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ীই নৌকার ভাড়া নেয়া হবে।  ধারনা করা হচ্ছে এই মাসের মধুপূর্নিমায় হাওরের বুকে জোছনা দেখতে প্রায় কয়েক হাজার পর্যটক টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকায় রাত্রি যাপন করবেন।

পর্যটকদের নিরাপত্তা

পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বদিয়ে তাহিরপুর উপজেলা নৌকা সমিতির সভাপতি ও সদর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবিকুল ইসলাম জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার  নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী আমরা নৌকা ভাড়া দিব। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নৌকার মাঝিরাও সতর্ক অবস্থানে থাকবে।

 

তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো.আতিকুর রহমান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা দেয়ার লক্ষ্যে জেলা ও তাহিরপুর থানা পুলিশের সমন্বয়ে ২ স্তরের বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষনিক নিরাপত্তা ব্যাবস্থা গ্রহন করবে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো.মুনতাসির হাসান পলাশ বলেন,আগত পর্যটকদের যেন কোন ধরনের হয়রানি না হয় এ জন্য আমরা উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছি।

যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে শ্যমালি, হানিফ বা এনার বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জ ৫৫০ টাকা ভাড়া। সুনামগঞ্জ থেকে লেগুনায় জনপ্রতি ১০০ টাকা তাহিরপুর। লেগুনা থেকে নেমেই পেয়ে যাবেন নৌকা। দরদাম করে ঠিক করে নিতে পারেন ৫ থেকে ১২ হাজার টাকার ভেতরে । তবে হাওর ট্যুরের জন্য দলগত ভাবে আসা উত্তম ।
Green Tea
সর্বশেষ