ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা

প্রকাশিত: ১৪:৪৩, ৩০ এপ্রিল ২০২২
আপডেট: ১৬:২০, ৩০ এপ্রিল ২০২২

মুগ্ধতার প্রতীক মুহিত

আবুল মাল আবদুল মুহিত

আবুল মাল আবদুল মুহিত

চলে গেলেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম নায়ক আবুল মাল আবদুল মুহিত। ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন এক মহান কর্মবীর। বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী মুহিত ছিলেন জনহিতে নিবেদিত একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশের  উন্মেষ ও বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক দক্ষ প্রশাসক, দূরদর্শী জনপ্রতিনিধি ও ধীমান রাজনীতিবিদ। 

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মুহিত। স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষক।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া আবদুল মুহিত বরাবরই একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সালে আবদুল মুহিত যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আরও পড়ুন- রাষ্ট্রপতি হওয়ার মনোবাসনা ছিল মুহিতের

সিএসপি হওয়ার পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনাসচিব হন। এর আগে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন তিনি। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হলে সেপ্টেম্বরে মুহিত হন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক।

১৯৭৭-৮১ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ছিলেন তিনি এবং ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী করার প্রস্তাব দিলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে রাজি হন। শর্তটি ছিল নির্দলীয় সরকার গঠন করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

আরও পড়ুন- ট্যালেন্টেড অভিভাবক হারালাম : আব্দুল মোমেন

এরশাদ কথা না রাখলে দুই বছরের মাথায় মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মুহিত। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সরকার তাঁকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তা দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মুহিত বই লিখেছেন ৪০টি।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত এ পর্যন্ত ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন, যার ১০টি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনঃগঠন ও বৃহৎ বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। 

সদা হাস্যোজ্জ্বল স্পষ্টবাদী এই মানুষটি ছিলেন স্নিগ্ধ রুচির অধিকারী এক পরিশ্রমী লেখক, গবেষক, সর্বোপরী সমাজ সংস্কারক। উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন আধুনিক, কুসংস্কারমুক্ত, কুপমন্ডুকতামুক্ত একজন পরিশীলিত শৈল্পিক মানুষ। একটি পরিতৃপ্ত ও সফল জীবন কাটিয়ে তিনি অনন্তের যাত্রী হলেন। মুগ্ধতার প্রতীক মুহিত শুধু  তাঁর নিজস্ব পরিমন্ডলে আলো ছড়াননি। তাঁর চারপাশকে করেছেন আলোকিত।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক স্বাপ্নিক পুরুষ, আলোকিত সিলেটের স্বপ্নদ্রষ্টা মুহিত অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মগুণে। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

  মুক্তাদীর আহমদ মুক্তাসাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়