ঢাকা, রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:৪৪, ৩ জুন ২০২১
আপডেট: ১৪:৩৯, ৩ জুন ২০২১

‘জুম দখল করে চাঁদা দাবি করে, জুমে যাইতে দেয় না। আমরা খাবো কি?’

ছয় দিনেও দখলমুক্ত হয়নি মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের ছোটলেখা চা-বাগানের বনাখলাপুঞ্জির জুম। এতে খাসিয়াদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। নিজেদের জুমে কাজ ও পান তুলতে না পেরে তারা কষ্টে দিন পার করছেন।

দখল ও চা-বাগানের আওতাধীন আগারপুঞ্জিতে সহস্রাধিক পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় বুধবার (২ জুন) মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলী ডেরিক প্রেন্টিস, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের মহাসচিব ফিলা পতমী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মৌলভীবাজার জেলা শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান বড়লেখার বনাখলাপুঞ্জি ও আগারপুঞ্জি পরিদর্শন করেন। তারা দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তারা পুঞ্জি দুটিতে ঘুরে মান্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে কথা বলেন।

গত শুক্রবার (২৮ মে) সকালের দিকে বনাখলাপুঞ্জির কয়েকটি জুম দখলের ঘটনা ঘটে। এদিকে পরদিন শনিবার (২৯ মে) ওই বাগানের আওতাধীন আগারপুঞ্জি নামের আরেকটি পুঞ্জির খাসিয়াদের সহস্রাধিক পানগাছ কেটে ফেলে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা।

এসব ঘটনার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আদিবাসী নেতারা। তারা দ্রুত জুম দখলমুক্ত করে খাসিয়াদের বুঝিয়ে দেওয়া ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

এ সময় মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলী ডেরিক প্রেন্টিস বলেন, সম্প্রতি আমরা দেখছি আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর একটার পর একটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। গত শুক্রবার বনাখলাপুঞ্জিতে প্রায় ৭০ একর জুমের জায়গা দখলের ঘটনা ঘটে। পরদিন শনিবার আগারপুঞ্জিতে সহস্রাধিক পানগাছ কেটে নিয়েছে দৃর্বৃত্তরা। এগুলো ন্যাক্কারজনক ও দুঃখজনক। এই ঘটনার আমরা তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। সাথে সাথে আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার যেন আশু একটা সমাধান হয়।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসি ফোরামের মহাসচিব ফিলা পতমী বলেন,গত তিন চার মাস ধরে সিরিজ সব ঘটনা খাসি জনগোষ্ঠির উপরে প্রতিবারি হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে আমার একটা প্রশ্ন? শুধু আমরাই কেন টার্গেট হচ্ছি? কুলাউড়ায় অনেক ধরণের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় সিরিজ ঘটনা ঘটছে। আমি প্রশাসনকে জানাতে চাই এই ঘটনাগুলোর যদি সুষ্ঠু বিচার না হয় আমরা সকল সংগঠন একসাথে আন্দোলনে যাব।’

বনাখলাপুঞ্জির আমস বলেন, আমার জুমের জায়গা দখল করে ঘর তৈরি করেছে। ভয়ে যাইতে পারছি না। ছয়দিন হয়ে গেল। কখন উদ্ধার হবে। কাজ করতে পারব কি না? এই চিন্তায় আমাদের সময় যাচ্ছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি এবং মানবাধিকার সংস্থা অভিযানের প্রোগ্রাম অফিসার তামলিমন বাড়ে বলেন, বুধবার সরেজমিনে পুঞ্জিগুলো ঘুরে দেখেছি। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছেন দখলমুক্ত হবে। তবে এসব ঘটনায় খাসিয়ারা আতঙ্কে আছেন। একটি পুঞ্জির জুম দখল আরেকটি পুঞ্জির সহস্রাধিক পান গাছ কাটা দুটোই কিন্তু পরিকল্পিত ঘটনা। নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই। এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা এরকম ঘটনা করে খাসিয়াদের ভয় দেখাচ্ছে। যাতে তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। আমরা প্রশাসনের কাছে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি করছি। 

পুঞ্জির বাসিন্দা ও চা-বাগান কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ছোটলেখা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ চা চাষের জন্য ১ হাজার ৯৬৪ দশমিক ৫০ একর টিলাভূমি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়। পরে তারা ২৭২ একর জমি খাসিয়াদের কাছে উপ-ইজারা দেয়। ২০০৭ সালে খাসিয়ারা ওই জমিতে বনাখলাপুঞ্জি নামে বসতি স্থাপন করে। এরপর সেখানে পান চাষ শুরু করে। পুঞ্জিতে বর্তমানে প্রায় ৩৬টি খাসিয়া পরিবারের দেড়শতাধিক সদস্য থাকে। প্রতিটি পরিবারের আলাদা পানের জুম আছে। গত ২৮ মে বোবারথল এলাকার আব্দুল বাছিত, পিচ্চি আমির, লেছই মিয়ার নেতৃত্বে ৪০-৫০ জনের একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুঞ্জিতে ঢুকে তিনটি পানের জুমের দখল করে নেন। এ সময় তারা সেখানে একটি অস্থায়ী ঘরও নির্মাণ করে। তখন জুমে থাকা খাসিয়াদের তারা তাড়িয়ে দিয়ে বলে এক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরকে ১০ লাখ চাঁদা না দিলে তারা জুমে প্রবেশ করতে পারবে না।

এই ঘটনায় পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) নরা ধার ও ছোটলেখা বাগানের প্রধান টিলা করণিক মো. দেওয়ান মাসুদ রোববার থানায় পৃথকভাবে দুটি মামলা করেন। অপরদিকে আগারপুঞ্জির সহস্রাধিক পানগাছ কাটার ঘটনায় সোমবার (৩১ মে) দুপুরে পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) সুখমন আমসে বাদী হয়ে বড়লেখা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

বনাখলা পুঞ্জির মান্ত্রী নরা ধার বলেন, আমরা নিরীহ মানুষ। পান চাষ করে সংসার চালাই। জুম দখল করে চাঁদা দাবি করেছে। জুমে যাইতে দিচ্ছে না। মঙ্গলবার পুলিশের সার্কেল অফিসারসহ অনেকে আসছিলেন। তারা বলেছেন ব্যবস্থা নেবে। ছয়দিন হয়ে গেছে আমরা খুব কষ্টে আছি। দ্রুত জুম উদ্ধার না হলে আমরা খাব কি!

এদিকে গত মঙ্গলবার (১ জুন) বিকেলে পুঞ্জির ৩৬টি খাসিয়া পরিবারের লোকজন জড়ো হন ছোটলেখা চা-বাগান ব্যবস্থাপকের বাংলোর সামনে। এখানে তাদের সাথে কথা বলেন মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) সাদেক কাউসার দস্তগীর। তিনি দ্রুত তাদের জুম উদ্ধার ও দোষীদের আইনের আওতায় নেওয়ার আশ্বাস দেন।

এ সময় বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরা, বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রতন দেবনাথ, স্থানীয় দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার বুধবার (২ জুন) বিকেলে বলেন,দখলদারদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে স্থানীয় চেয়ারম্যান ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছিলেন। তিনি সরাতে পারেননি এখন আমরা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও বিজিবিসহ যৌথভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের উচ্ছেদ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খাসিয়াদের সর্বাত্মক আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

আইনিউজ/সাজু মারছিয়াং/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়