Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ জানুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ১৪ ১৪৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:৫১, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

কৃষিপ্রেমের পরশে জাগ্রত শিক্ষার স্বপ্ন

সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের ভরসা কৃষি উদ্যোক্তা আবুল ফজল

কৃষি উদ্যোক্তা আবুল ফজল তালুকদার তার বরই বাগানের পরিচর্যা করছেন। ছবি: আই নিউজ

কৃষি উদ্যোক্তা আবুল ফজল তালুকদার তার বরই বাগানের পরিচর্যা করছেন। ছবি: আই নিউজ

কেবল কৃষির প্রতি ভালোবাসা নয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা আবুল ফজল তালুকদার। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যেই গড়ে তুলেছেন একটি বরই বাগান, যা আজ শুধু আয় নয়, অনেকের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠেছে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাউরভাগ গ্রামে গড়ে উঠেছে এই ব্যতিক্রমী বরই বাগান। ‘তালুকদার অ্যাগ্রো’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে আবুল ফজল প্রমাণ করেছেন ইচ্ছা আর সততা থাকলে দেশের মাটিতেই গড়া যায় সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। কথায় আছে, ‘আমার দেশের মাটি, সোনার চেয়েও খাঁটি’ এই বিশ্বাসই তাঁর পথচলার অনুপ্রেরণা।

সম্প্রতি বাগান ঘুরে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ডালে ঝুলছে ছোট-বড় অসংখ্য বরই। কোনোটি সবুজ, কোনোটি লালচে, আবার কোনোটি হলুদাভ রঙে পাকতে শুরু করেছে। চোখ জুড়ানো এই দৃশ্য যেন পরিশ্রমেরই প্রতিফলন।

আবুল ফজল তালুকদার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আলাপকালে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তাঁর আলাদা টান ছিল। সুযোগ পেলেই মাঠে-ফসলে ছুটে যেতেন। চাকরির ব্যস্ততায় কৃষিকাজে সময় দেওয়া সম্ভব না হলেও কৃষির ভাবনা কখনও মন থেকে হারিয়ে যায়নি।

তিনি ও তাঁর স্ত্রী শিক্ষিকা আমেনা ফজল দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়ে আসছেন। তবে দু’জনের আয়ে এই বাড়তি খরচ চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছিল। একসময় ভাবনা ছিল ব্যাংকে টাকা রেখে সেখানকার লাভ থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যয় নির্বাহ করবেন। কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় বরই বাগান করার পরিকল্পনা।

আবুল ফজল বলেন, “বর্তমানে চারজন শিক্ষার্থী আমাদের কাছে পাঁচ থেকে আট বছর ধরে রয়েছে। এর মধ্যে একজনের বিয়েও দিয়েছি। তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি চিকিৎসাসহ যাবতীয় খরচ এখন এই বাগানের আয় থেকেই চলছে।”

২০১৯ সালে মাত্র তিন কিয়ার জমিতে ৫০০টি চারা রোপণের মাধ্যমে বরই চাষ শুরু করেন তিনি। ধাপে ধাপে বর্তমানে প্রায় ১২ কিয়ার জমিতে চারটি বরই বাগান গড়ে তুলেছেন। এখন তাঁর বাগানে প্রায় তিন হাজার গাছ রয়েছে। এতে মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে সেই বিনিয়োগ উঠে এসেছে, আর এখন বাগানের আয়েই চলছে সব ব্যয়। বাগানে চারজন নিয়মিত শ্রমিক কাজ করছেন।

এই বাগানে থাই কুল, কাশ্মীরি আপেল কুল, বল সুন্দরী, চায়না টক-মিষ্টি, নারকেল কুল, জাম্বু কুল ও ঢাকা-৯০ এমন নানা জাতের বরই চাষ হচ্ছে। সব জাত একসঙ্গে না পেকে পর্যায়ক্রমে ফল দেয়, যা বাজার ব্যবস্থাপনাকেও সহজ করেছে।

বিশেষত্ব হলো এই বাগানে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বরই বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতি কেজি বরই ৮০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার কেজি বরই বিক্রি হয়েছে। মৌসুম শেষে আরও ১০ থেকে ১৫ হাজার কেজি বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি। এখানে পাইকারদের কাছে নয়, বরং দর্শনার্থীরা সরাসরি বাগানে এসে নিজের হাতে বরই পেড়ে কিনে নিয়ে যান।

এই বাগানের আয় দিয়েই আজ পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে কয়েকজন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী। তাদের একজন সামিয়া আক্তার। তিনি বিএ পাস করে বর্তমানে আইসিটি কোর্স করছেন। সামিয়া বলেন, “নবম শ্রেণি থেকে মামা আবুল ফজল আমাকে ও আরও তিনজনকে পড়ালেখার খরচ দিচ্ছেন। মামা চাকরিতে থাকা অবস্থায় এত খরচ সামলানো কঠিন ছিল। পরে এই বাগান গড়ে তোলেন। এখন আমাদের পড়াশোনার সব খরচ এখান থেকেই আসে।”

তিনি আরও জানান, আবুল ফজলের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রফিনগরে। সেখানকার কয়েকজন শিক্ষার্থীর বেতন, বই-খাতার খরচও এই বাগানের আয় থেকে দেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রামের ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য জার্সি, পুরস্কারসহ বিভিন্ন ব্যয়ও বহন করা হয়।

আবুল ফজল তালুকদার বলেন, “২০২৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমি পুরোপুরি চাষাবাদে যুক্ত হয়েছি। সিলেট অঞ্চলের বেকার তরুণদের একটি বার্তা দিতে চাই, বিদেশে গিয়ে কষ্টের জীবন নয়, দেশের মাটিতেই সৎভাবে চাষাবাদ করে ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। আমার বিশ্বাস, এই মাটি কখনও বেইমানি করে না।”

কৃষিপ্রেম আর মানবিক দায়িত্ববোধের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই বরই বাগান আজ শুধু একটি সফল কৃষি উদ্যোগ নয়, এটি শিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়