ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৮ ১৪২৭

কয়ছর আহমদ, পর্যটক

প্রকাশিত: ১৬:২৭, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০

লঙ্কাউই: অভিশপ্ত একটি দ্বীপের বিশ্বজয়

থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে একটি পরিবার ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আসে ফসল-সম্পদে পরিপূর্ণ একটি দ্বীপে। অনেকদিন পর- সেই পরিবারের মেয়ে মাসুরী দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দরী হিসেবে সবার নজরে আসে।

কিশোরী অপরুপ সুন্দরী মাসুরীর স্থান হয় রাজপরিবারে; রাজবধু হিসেবে দিন তাঁর ভালোই কাটছিল। এর মধ্যেই মাসুরীর স্বামী কিছুদিনের জন্য বাইরে যায়। কিছুদিন পর এক যুবক আত্মীয় আসে মাসুরীকে দেখতে।

এদিকে রাজ পরিবারের অন্য রাজবধুরা মাসুরীর সৌন্দর্যের প্রতি শুরু থেকেই হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরছিলেন। তাই তারা মাসুরীকে উচিৎ শিক্ষা দিতে সেই আত্মীয় যুবকের সাথে মাসুরী ব্যভিচার করেছে এমন অভিযোগ আনে!

এই কথা শুনে বিচারে মাসুরীকে শাস্তি দেওয়া হয় মৃত্যৃদন্ড। গাছের সাথে বেঁধে অমানবিক অত্যাচার চলে মাসুরীর ওপর। কিন্তু কোনোভাবেই মৃত্যু হয় না সেই সাধারণ পরিবারের মেয়ে রাজবধু মাসুরীর।

মাসুরী বারবার নিজেকে নিরপরাধ বলে স্বামীর ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষার জন্য কাকুতি মিনতি করে। মৃত্যু থেকে রেহাই না পাওয়ায় অন্তত সন্তানের জন্য বাচাঁর আকুতি জানায় সে। কিন্তু মানুষের চিরকালের সন্দেহ রোগ তো আর শেষ হবার নয়। তাই অমানবিক নির্যাতন জারি রাখা হয়, কিন্তু কোনোকিছুতেই মারা যান না মাসুরী।  

আশ্চর্য হয় সবাই! এতো অত্যাচারেও মৃত্যু হচ্ছে না। হিংসে, সন্দেহ আর অবিশ্বাসের মিশ্রনে থাকা সকলের আশা ব্যভিচারীর শাস্তি হোক। অসহ্য যন্ত্রনায় থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজের মৃত্যু কিভাবে হোটে পারে মাসুরী নিজেই জানান।  

মাসুরীর কথামতো শাস্তি প্রয়োগ করা হলে আশ্চর্যভাবে মৃত্য হয় তাঁর। সাদা রক্তে ঢেকে যায় মাসুরীর শরীর! মৃত্যুর পূর্বে মাসুরী দ্বীপবাসীকে একটি অভিশাপ দিয়ে যান যে, ‘এই দ্বীপ পরবর্তী সাত প্রজন্ম দুঃখে কাটবে!’

সাধারণ এক নিরপরাধ রাজবধুর অভিশাপ। অবিশ্বাসী থেকে অভিসপ্ত হলো সেই দ্বীপের মানুষ। এদিকে কিছুদিন পর নিজ দেশে মাসুরীর স্বামী ফিরে এলো; এসে মাসুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং মৃত্যুর কথা জানলো সে। কিন্তু বিশ্বাস করলো না মাসুরীর ওপর আনা অভিযোগ।

বরং, ষড়যন্ত্রের কবলটা সে ঠিকই ধরতে পারল। ক্ষোভে, ব্যাকুল হয়ে সন্তানকে নিয়ে দ্বীপ ছেড়ে চলে যায় মাসুরীর স্বামী। কোথায়? মাসুরীর পূর্বপূরুষের জন্মস্থান প্বার্শবর্তী ফুকেটে।

অন্যদিকে মাসুরীর দেওয়া অভিশাপ সত্য হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে ওই দ্বীপে! কিছুদিনের মধ্যেই ফসলশূন্য হয়ে যায় গোটা দ্বীপ।  অন্য রাজ্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে রাজপরিবারের সবার মৃত্যু হয়!

যেখানে সন্তানসহ মাসুরীর স্বামী গিয়েছে সেই ফুকেট দ্বারা আক্রান্ত হয় মাসুরীর স্মৃতিবিজরিত দ্বীপটি। আর থাইল্যান্ডের ফুকেটের উত্থান সে সময় থেকে। অভিসপ্ত দ্বীপে অনিষ্ট করতে কবরে থাকে মাসুরী।

এমনি এক অভিশাপ ছিল যে এখন এই দ্বীপের মানুষ বুঝে মাসুরী কে ছিল? ধীরে ধীরে নিজেদের ভূল বুঝতে পেরে সঠিক পথে আসতে থাকে দ্বীপবাসী। তার স্মৃতিসৌধ মাকাম মাসুরী এখন দ্বীপবাসীর আদর্শ!

মাসুরীর সেই অভিসপ্ত দ্বীপটিই হলো মালেয়শিয়া তথা বিশ্ববাসীর কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় দ্বীপ লঙ্কাউই! বর্তমানে ধনে-মানে-সৌকতে ভরা দ্বীপটিতে  ১৯৭০ দশক পর্যন্ত সেটা দারিদ্রতম একটি দ্বীপ ছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার সমাপ্তি ঘটে ১৯৮০ দশকে। কারন মাসুরীর অভিশাপের ৭ প্রজম্মের সমাপ্তি হয়। তাই স্থানীয়রা মনে করেন, লঙ্কাউই দ্বীপের অতীতের দুরবস্থা আসলে মাসুরীর দেওয়া অভিশাপেরই ফল।

৮০ দশকের শুরুতেই মালেয়শিয়ার ৪র্থ প্রধানমন্ত্রী হন ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু বদলাতে থাকে। বদলাতে থাকে লঙ্কাউই। মাসুরীর নতুন প্রজম্মের জন্ম হয় থাইল্যান্ডের ফুকেটে। সেই সাথে ভাগ্য ফিরে মালেয়শিয়ার লঙ্কাউই দ্বীপের।

এমনই ফেরা যা দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আসেন লঙ্কাউইতে। দারিদ্রপীড়িত দ্বীপ থেকে সম্পদ আহরণ করে এবং পর্যটনের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে কাজ করে যান ড. মাহাথীর।

পাপ মোচনের জন্য ফুকেট থেকে নিয়ে আসেন মাসুরীর ৭ম প্রজম্মের সন্তান আয়েশাকে। দেওয়া হয় যথাযত সম্মান।  আজ লঙ্কাউই বিশ্বের পর্যটনের এক অনন্য আকর্ষনীয় স্পট।

কুয়ালালামপুরের উত্থান

যদি কোন দেশকে বৈচিত্র্যতার জন্য পুরস্কৃত করা হয় তাহলে মালয়েশিয়া হবে অন্যতম। রীতিনীতি, বিভিন্ন দ্বীপের সারি, পাহাড়-পর্বত, উর্বর উচ্চভূমি ও ট্রপিকেল রেইন ফরেস্ট এই সব বৈচিত্র্য নিয়ে মালয়েশিয়া গঠিত।

১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে থাকা একটি জঙ্গলে একদল চিনা ভাগ্যান্বেষী অনুমতি নিয়ে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে সেটা এখন বিশ্ববাসীর কাছে এক অত্যাধিক আকর্ষনীয় কর্মচঞ্চল, ঝকঝকে আধুনিক শহর কুয়ালালামপুর নামে পরিচিত।

ভ্রমণ শুরু করুন কুয়ালালামপুর থেকে। মালেয়শিয়ার ভ্রমণ ২ দিন হলে শুধু কুয়ালালামপুর সিটি ট্যুর করতে পারেন। দেখতে পারেন ৮৮ তলা ও ১৪৮৩ ফুট উচ্চতার পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুরের ঔপনিবেশিক স্থাপত্বের নিদর্শন ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, স্বাধীন মালেয়শিয়ার পতাকা উত্তোলনের পতাকাদন্ড ১০০ মিটার উচ্চতার মারডেকা স্কোয়ার, সুলতান আব্দুল সামাদের প্রসাদ (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট), অপরুপ স্থাপত্বের জামেক মসজিদ, মসজিদ নেগারা, ইসলামিক আর্ট গ্যালারী, জে ইয়া মন্দির, লেক গার্ডেন্স, বাগানের মধ্যে হৃদ তাসিক পেরদানা, বার্ড পার্ক। রাতের কুয়ালালামপুর আলো জ্বলমল সবসময়।

ঘুরে আসতে পারেন ২৫ কি.মি. দূরের পূত্রজায়া থেকে। পুরোটাই কৃত্রিমভাবে তৈরী করা হয় ৯০ দশকে। আমেরিকাকে চ্যালেন্জ করে তৈরী করা স্যাটেলাইট সিটি এই পুত্রজায়া। ফেডারেল মালেয়শিয়ার রাজধানীতে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অফিস, বাসস্থান। সেই সাথে সকল সরকারী কাজকর্মের কেন্দ্রস্থল। ট্রেনে যেতে হবে।

যদি আরো একদিন বেশী থাকেন তাহলে যাবেন শৈল শহর গ্যান্টিং হাইল্যান্ড। ছুটি কাটানোর অসাধারণ একটি জায়গা। একটি সন্ধ্যা কাটাতে পারলে বারবার যেতে ইচ্ছে হবে। কুয়ালালামপুর থেকে বাসে এবং পরবর্তীতে স্কাইওয়েতে করে হোটেলে।

৪ দিনের জন্য হলে অবশ্যই যাবেন এশিয়ার অন্যতম বন্দর শহর মালাক্কা। মিশ্র সংস্কৃতির এই শহরটি হল মালেয়শিয়ার প্রাচীন শহর। চিনা, ভারতীয়, আরব, পুর্তুগিজ, ইংরেজ সকলের অবদানে এই শহর গড়ে উঠে।

মেলাক্কা নদীর দুদিকেই শহর। হেরিটেজ বিল্ডিং, স্ট্রিট মার্কেট, টাউন হল না দেখলে বিচিত্র এই মালেয়শিয়াটাই অপরিচিত থেকে যাবে আপনার কাছে। তাছাড়া রয়েছে অসংখ থিম পার্ক।

ট্যুরের সময় আরো ২ দিন বাড়ালে যাবেন পামে ছাওয়া দ্বীপ পেনাং। পর্যটনের আরেক আকর্ষণ পেনাং সড়ক পথে গেলে এশিয়ার দীর্ঘতম ও বিশ্বের পঞ্চম ১৩.৫ কিঃমি দীর্ঘ পেনাং ব্রিজ হয়ে দ্বীপে যেতে হয়।

অপরুপ সৈকতসমূহ দেখতে পেনাং না গেলে কি করে হয়। এছাড়া ৩৮ জন হিন্দু দেব দেবীর মূর্তি নিয়ে মারিয়াম্মান মন্দির পর্যটক আকর্ষন করে। এর পাশেই কেলিং মসজিদ। মালেয়শিয়ার প্রথম দিককার মসজিদ গুলোর একটি এটি।

আরো থাকতে হবে মালেয়শিয়া দেখতে। আপনার গুণার দিন ফুরিয়ে যাবে কিন্তু মালয়েশিয়া দেখা ফুরাবে না। সবুজ বাগিচায় ঢাকা পাহাড়ী এলাকা ক্যামেরুন হাইল্যান্ড বা তামান নেগারার আদিম অরণ্যে যাওয়া লাগবে।

তামান নেগারা

পশ্চিম মালয়েশিয়ার উত্তরাংশের তিনটি রাজ্য জুড়ে তামান নেগারা অবস্থিত যা বিশ্বের প্রাচীনতম রেইন ফরেস্ট। তামান নেগারা ইকো ট্যুরিজম ও দুঃসাহসিক গন্তব্য হিসেবে জনপ্রিয়।

এই পার্কটি মালয়ান টাইগার, এশিয়ান হাতি ও সুমাত্রার গন্ডারের মত দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী ও গাছপালায় পরিপূর্ণ। এই পার্কের আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে দীর্ঘ সাসপ্যানশন ব্রীজের উপর দিয়ে চাঁদের আলোয় হাঁটা।

প্রায় গাছের উপর দিয়ে গেছে এই ব্রীজ যার ফলে পাখিদের আবাস দেখা যায় এখান থেকে। রাতের সাফারির ব্যবস্থা আছে এখানে। ফলে পেঁচা, চিতা বিড়াল ও ওয়াটার ড্রাগনের মত নিশাচর প্রাণী এবং শুধুমাত্র রাতে প্রস্ফুটিত হয় এমন উদ্ভিদ দেখারও সুযোগ আছে এখানে।

মালেয়শিয়া দেখবেন আর লঙ্কাউই যাবেন না। বসে থাকেন এয়ারপোর্টে। আর ২ দিনের জন্যও যদি মালেয়শিয়া যান তাহলে আলো জ্বলমলে কুয়ালালামপুর দেখে কি করবেন? সোজা যান লঙ্কাউই।

এটি মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে আন্দামান সাগরে অবস্থিত। ৯৯টি দ্বীপ নিয়ে লংকাউই দ্বীপপুঞ্জ গঠিত। এখানে আছে ছবির মত সুন্দর সৈকত, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও পর্বতমালা। পর্যটকদের জন্য অনেক রিসোর্ট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে যা বিশ্বের অন্যতম পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

দ্বীপমালার ব্যতিক্রমি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এখানে পর্যটকরা ভীড় করেন। সাড়া শহর জুড়ে মাসুরীর পোট্রেট পাবেন। বলা হয় মাসুরীর শহর।

বেশি লিখতে কার ভালো লাগে। আমারও লাগার কথা না। কিন্তু এরকম পর্যটন আর ইতিহাস সমৃদ্ধ দেশের কিছু কথা না লিখলে কি করে হয়? দেখার ইচ্ছে হলে আপনাকে জানতে তো হবেই। আর যারা দেখে এসেছেন তারা কি দেখে ফিরে এসেছেন তা জানা জরুরী।

যেতে যেতে আরও কিছু তথ্য

বাংলাদেশ থেকে ভিসা নিয়ে যেতে হয় মালেয়শিয়ায়। ভিসা সমস্যা হয় না যদি ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট থাকে। এয়ারপোর্টে সমস্যা করবেনা যদি ভারত, নেপাল ভ্রমণ থাকে। না হলে কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আর সবকিছুর উর্ধ্বে হলো নিজের চলার ধরন।

এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে কুয়ালালামপুর। টেক্সিতে গেলে খরচ বেশী। ট্রেনে বা বাসে যেতে পারেন। থাকতে পারেন বুকিং বিনতাংতে। বাংলাদেশীদের আস্তানা বলা যায়। খাবারের মান এবং দাম সবকিছুই ঠিক আছে।

কেনাকাটার জন্য পাসার মালামের রাতের বাজার, চায়না টাউনে যেতে পারেন বাজেট মার্কেটের জন্য। মালেয়শিয়া যেতে বিমানভাড়া লাগবে ২০-২২ হাজার। টু স্টার/ থ্রী স্টার হোটেলের রুম ভাড়া অন্তত বাংলাদেশ থেকে কম।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়