ঢাকা, রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮

জাহাঙ্গীর জয়েস

প্রকাশিত: ১৭:২৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২১
আপডেট: ১৭:৫৬, ২৪ জানুয়ারি ২০২১

সেন্ট মার্টিন: আছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, নেই যত্ন!

পৌষের সকাল। যদিও পৌষের শীত নেই। ১৩ জানুয়ারি, ২০২১। সকাল ১১টা। ঢাকা- মৌলভীবাজার রোডের মৌলভীবাজার বাস স্টেন্ডের কাছে সিডব্লিউএফডির জেনারেশন ব্রেক থ্রু প্রজেক্ট- ফেস টু'র মৌলভীবাজার অফিস। একে একে অফিসে এসে জড়ো হই আমরা।

প্রজেক্টের মৌলভীবাজার শাখার ফিল্ড ম্যানেজার মিরাজুল ইসলাম, টেকনিক্যাল অফিসার নাছিমা আক্তার নীপা, আবদুল আহাদ, মনশ্রী জুঁই, শিক্ষক মাধুরী মজুমদার এবং উনার ছেলে কাব্য।

দুটি ফোরস্টোকে যাই শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন। গন্তব্য বহুদূর। দুপুর সাড়ে বারোটার ট্রেন আসে প্রায় এক ঘন্টা দেরিতে। স্টেশনে পর্যাপ্ত আসনের অভাবে অল্প কিছু যাত্রী ছাড়া সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন বিরক্তি নিয়ে। ময়লা জমে আছে বিভিন্ন জায়গায়। ছাগল, কুকুর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটি গরু যাত্রীদের গা ঘেঁষে চলে যায় গেট দিয়ে নির্ভয়ে।

ট্রেন আসলে তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে ওঠে জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে বসার পরে ট্রেন ছাড়লে আপাত স্বস্তি। স্টেশনের পর স্টেশন পেরোয় আর হরেকরকমের হকার বাদাম, চানাচুর, চিপস, চাটনিসহ বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য নিয়ে বগি থেকে বগি ঘুরেন জীবন জীবিকার তাগিদে।

হেলেদুলে চলা রেলের শব্দ, গতি বিরক্তিকর। কিশোর কাব্য একবার বলেই ফেলে, ট্রেন যেনো টমটমের মতো চলছে।

এখনো লোকে টিকেটবিহীন রেলে ওঠে! হঠাৎ চোখ পরে একটা বক্সের দিকে। যেখানে আছে শেকল। লেখা আছে, 'ট্রেন থামাতে শেকল টানুন। অযথা টানলে দন্ড ৫০ টাকা।'

যাইহোক, আড্ডা, গল্পে এক সময় পৌঁছে যাই চট্টগ্রাম। সেখানে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন শিক্ষক ওমর ফারুক। দেখা করতে আসেন তছলিম- মাহমুদা দম্পতি। স্টেশন থেকে নতুন ব্রিজ গিয়ে কক্সবাজারের গাড়ি ধরি। মারছা, স্বাধীন, সৌদিয়া, হানিফ, শ্যামলী প্রভৃতি গাড়ি যাতায়াত করে।

প্রায় ৩/৪ ঘন্টার যাত্রা। সময়ভেদে বা জ্যাম হলে ভিন্ন কাহিনি। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রার গাড়ি যখন লোকাল গাড়ির মতো বারবার থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করে তখন নিশ্চয়ই ভালো লাগার কিচ্ছু নেই। এই রোডেই প্রথম দেখলাম নামাজের বিরতিতে গাড়ি থামে।

কক্সবাজার শহরে প্রবেশের বেশ কয়েক কিলোমিটার আগে থেকেই ভাঙ্গাচুরা রাস্তার শুরু। যে শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে শুধু পর্যটক হিসেবে। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের গৌরবে গৌরবান্বিত সে শহরের এমন রাস্তাঘাট বিস্ময় জাগায় মনে!

শহরের প্রধান সড়কসহ যে সড়কেই গেছি। শুধু ধুলাবালি, ভাঙা আর ভাঙা। সুগন্ধা, লাবণী, কলাতলী পয়েন্ট এবং হিমছড়ি কোথাও প্রকৃতি প্রদত্ত সৌন্দর্য ছাড়া কোনো যত্নের স্পর্শ চোখে পরলো না।

কক্সবাজারে আমাদের দলে যুক্ত হোন এনজিও কর্মকর্তা শামীম সর্দার- আগন্তু দম্পতি এবং তাদের ছোট্ট সোনামণি আফরা। যাদের আথিতেয়তা ভুলার নয়।

স্থানীয় একজন সংস্কৃতিকর্মি বল্লেন, শহরজুড়ে নাকি প্রচুর ঘোড়া। কিন্তু সৈকত ছাড়া কোনো ঘোড়া চোখে পরলো না। আবার সৈকতের ওই ঘোড়াগুলো দেখে মনে হলো, এগুলোকে শুধু কিছু ইনকামের জন্যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যতিক্রম ছাড়া সব কয়টা ঘোড়া খুবই দুর্বল এবং অযত্নে লালিত পালিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো রুচিসম্মত লোক আজকাল ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খাবে আমার মনে হয় না। তা-ও এমন বিশ্রী ঘোড়া।

কক্সবাজার শহরকে ধুলাবালির শহর কিংবা ইজি বাইকের শহর বলা যায়। যতদূর চোখ যায় ধুলোর আস্তরণে ঢাকা ইজি বাইক আর ইজি বাইক। সব দিকে ধুলোর দাপট।

বিমানবন্দর সড়কের জাহাজ ঘাট থেকে জাহাজ ছাড়ে নারিকেল জিঞ্জিরা তথা সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে। এখানে ইজি বাইক প্রতি পার্কিংয়ের জন্যে নেয়া হচ্ছে ১০ টাকা করে। অথচ পার্কিংয়ের জন্যে আলাদা কোনো জায়গা নেই। সংকীর্ণ রাস্তায়ই পার্কিং।

খানাখন্দে কোমর ভাঙার দশা সেদিকে খেয়াল নেই কিন্তু অবৈধ আয়ে পূণ্য লাভের বাসনা। একথা বলার কারণ এ টাকা থেকে ওয়াজ মাহফিলও হবে। গর্বের সাথে এ তথ্য জানালেন ইজি বাইক চালক।

বিডব্লিউটিএর এ জাহাজ ঘাট এবং টেকনাফ থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ টি জাহাজ দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে জাহাজ ছাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয় এখানে। ব্যাপারটা যেমন মজার তেমনি বিরক্তিরও। কারণ এখানে জাহাজ ছাড়ে জোয়ার-ভাটার হিসেব কষে, জীবনের হিসেব এখানে আদৌ কি দরকারি!

বিডব্লিউটিএ'র জাহাজ ঘাট এবং টেকনাফ থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ টি জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়

সকাল ৮ টায় ছাড়ে আমাদের জাহাজ। বাঁকখালি নদী পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের নীল জল কেটে ছুটে চলে জাহাজ। দূরে জলরাশিতে যেনো নেমে এসেছে আকাশ। মাঝে মধ্যে মাছ ধরার কিছু ট্রলার ছাড়া আর কিছু চোখে পরে না। রৌদ্রজ্বল দিনে বিভিন্ন বয়সের যাত্রীদের আনন্দ উল্লাসে ৬ ঘন্টার যাত্রায় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে দ্বীপের শরীর।

প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার পর্যটক আসছেন এখানে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁয় মানুষের ঢল। সারা দ্বীপজুড়ে প্রকৃতি দু'হাতে ঢেলে দিয়েছে অপার সম্পদ এবং সৌন্দর্য। ছেঁড়া দ্বীপ, দারুচিনি দ্বীপসহ সেন্টমার্টিনের পুরো সৈকতজুড়ে অনাবিল আনন্দ উপভোগে ব্যস্ত সবাই।

কিন্তু প্রতিযোগিতা করে তৈরি হওয়া এসব বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। প্রকৃতি, পরিবেশের চিন্তা গুরুত্ব পায়নি বুঝতে কষ্ট হয় না। কে কতো সৈকতের কাছে আসতে পারবে তারই প্রতিযোগিতা। বেশির ভাগেরই কোনো সরকারি অনুমোদন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে বলে মনে হয় না।

সৈকতে নামার প্রতিটি পথ ময়লা আবর্জনায় ভরা। ডাবের খোসা, প্লাস্টিক, পলিথিনসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। এখানে আগতদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় একটা পানীয় হচ্ছে ডাব। আকারভেদে এক একটা ডাবের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

এ দ্বীপকে কুকুরের দ্বীপও বলা যায়। আছে অসংখ্য কুকুর। যাদের সমুদ্রে নেমে দাপাদাপি করতেও দেখলাম।

৮ হাজার ভোটারসহ প্রায় ১২ হাজার অধিবাসী নিয়ে দেশের সবচেয়ে ছোট ইউনিয়ন এই সেন্টমার্টিন। দুই রাত তিন দিনের ভ্রমণে কোনো পুলিশ সদস্য চোখে পরেনি। অবশ্য বিজিবির ক্যাম্প দেখতে পেয়েছি। যদিও এখানে অপরাধ প্রবনতা প্রায় নেই বলেই জেনেছি স্থানীয় মানুষজনের সাথে কথা বলে।

পাখির চোখে সেন্ট মার্টিনের পুরো চিত্র

পর্যটন মৌসুম তাদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। অন্য সময় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম তাদের জন্যে সবচেয়ে যন্ত্রণার। তখন পর্যটকের আগমন বন্ধ থাকে। স্থানীয় লোকজন তখন অন্য অঞ্চলে চলে যান কাজের সন্ধানে। অন্যরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। গুরুতর চিকিৎসার জন্যে তাদের যেতে হয় টেকনাফে। এক্ষেত্রে অনেকেই বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের প্রায়ই মৃত্যুর মুখেও পরতে হয়।

এখানে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ব্যবসার মতো বিভিন্ন ধরনের মাছ এবং শুটকির ব্যবসা জমজমাট। মাছের মধ্যে ইলিশ, রূপচান্দা, সুন্দরী, সুরমা, টুনা, গুল পাতা, কোরাল, লাক্ষা, স্যামন(স্যালমন), মাইট্টা, বাটা, প্লানপিছ, কোকোনাস মাছসহ বহু জাতের মাছ।

শুটকির মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের চান্দা। যেমন- রূপচান্দা, টেকচান্দা, কালোচান্দা, সাদাচান্দা, গুলচান্দা প্রভৃতি। এছাড়া লাক্ষা, লইট্টা, মাইট্টা, চুরি, চাপিলা, চিংড়ি, কোরাল, হাঙ্গর, মইল্যা, নাইল্যা, ক্যাছকি, মাথা গুইজ্জা, লেইজ্জা পোয়া, লাল পোয়া প্রভৃতি।

সেন্ট মার্টিনে রয়েছে রূপচান্দা, টেকচান্দা, কালোচান্দা, সাদাচান্দা, গুলচান্দা প্রভৃতি শুটকির দোকান

এসব মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তার স্বাদ বহু দিন ভুলা যাবে না। এছাড়া প্রতি হোটেলে অন্তত এক রাত হয় বারবিকিউয়ের আয়োজন।

চাইলে সারা সেন্টমার্টিন হেঁটেই দেখে নেয়া যায়। তাছাড়া রিকশা, ভ্যানগাড়ি, বাই সাইকেল, মোটর সাইকেলে চড়ে দেখে নিতে পারেন দ্বীপের অপূর্ব সৌন্দর্য। আর নিজেদের স্মৃতি ভালোভাবে ধরে রাখতে সৈকতজুড়ে আছে তালিকাভুক্ত ২২০ জন ফটোগ্রাফার। যারা দুটি সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত। আশ্চর্য হলো তারা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া ছবি তুলতে তুলতেই দক্ষ হয়ে উঠেছেন।

সেন্ট মার্টিনের বালিতে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত সূর্যের ডুবে যাওয়ার সৌন্দর্য অমলিন

অবশেষে ফেরার পালা। ১৮ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে তিনটায় জাহাজ ছাড়ে সেন্টমার্টিন। দুই রাত তিন দিনের স্মৃতি মাথায় নিয়ে দেখি, ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে থাকে নারিকেল জিঞ্জিরা। এক সময় আর দেখা যায় না। মনে হয় নীল জলে মিশে গেছে প্রকৃতি প্রদত্ত অপার সৌন্দর্যের আধার প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন।

আইনিউজ/এইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়