ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৬ ১৪২৮

খাইরুন নাহার চৌধুরী (লাভলী)

প্রকাশিত: ২৩:৫৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২২:৪৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইউরোপের পথে পথে

মানবদেহের কংকালের পিরামিড

মানবদেহের কংকালের বিশাল সংগ্রহ `Catacombs of Paris`

মানবদেহের কংকালের বিশাল সংগ্রহ `Catacombs of Paris`

পৃথিবীতে এমন জায়গা আছে বলে আমি জানতামও না। আমার কল্পনাতেও ছিল না আমি এমন কিছু কখনও দেখব। অবিশ্বাস্য! ভালো লাগা খারাপ লাগা এই দুই অনুভূতি নিয়ে ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেখলাম "Catacombs of Paris" নামক মানবদেহের কংকালের এক বিশাল সংগ্রহ।

ইংল্যান্ড প্রতি বছর দুই একবার বেড়াতে যাওয়া হয়। মেয়ে সেখানে পড়াশোনা করছে, সেই সুবাদেই বেশি যাই। তাছাড়া ভাই-বোন,আত্মীয়, বন্ধুদের অনেকেই ইংল্যান্ডের নানা শহরে স্থায়ী বসবাস করছেন। এই সুযোগে সবার সাথে দেখাও হয়ে যায়।  

ইংল্যান্ডের খুব কাছেই ফ্রান্স। শিল্প, সাহিত্য, ফ্যাশনের এই তীর্থস্থান দেখার খুব ইচ্ছে ছিল সব সময়। ফ্রান্স যেতে হলে বাংলাদেশ থেকে সেনজেন ভিসা নিয়ে যেতে হয়। 

লেখক ও তাঁর ভ্রমণসঙ্গী।

আমরা সেবার তিনজনের সেনজেন ভিসা নিয়ে ইংল্যান্ড গেলাম। কিছুদিন লন্ডন ঘুরে রওয়ানা দিলাম ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে। লন্ডন থেকে আকাশ পথে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পৌঁছাতে আমাদের সময় লেগেছিল মাত্র এক ঘণ্টা বিশ মিনিট। আমাদের প্লেন যখন ফ্রান্সের আকাশে, জানালা দিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম আল্পস পর্বতমালার অপার্থিব সৌন্দর্য। শেষ বিকেলের সোনা রোদ আল্পসের শরীরে যেনো গলে গলে পড়ছিল। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য! 

শুধুই মানবদেহের হাড়গোড়, সাজানো আছে কংকালের পিরামিডে।

প্যারিস পৌছে এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ট্যাক্সি ডেকে সোজা হোটেলে চলে আসলাম। ট্যাক্সি করে আসতে আসতে প্যারিস শহরটা দেখছিলাম। লুইদের বিলাসবহুল জীবন কেমন ছিল, তার কিছুটা আন্দাজ পাচ্ছিলাম। আধুনিক অট্টালিকা আর প্রাচীন স্থাপত্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ফ্রান্সে না আসলে দেখা হতো না। 

ফ্রান্সের জনগণ পারতপক্ষে ইংরেজি ভাষায় কথা বলে না। আমার মেয়ের ফ্রেঞ্চ ভাষা জানা ছিলো বলে আমরা মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট ফ্রান্স ভ্রমণ করতে পেরেছিলাম। 

হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো। ল্যাগেজ রেখে, ঝটপট ফ্রেশ হয়ে রিসেপশনে গিয়ে আইফেল টাওয়ার সম্পর্কে নানান কথা জেনে নিলাম, মানে কয়টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা, এখান থেকে কতদূর, আমরা এখন গেলে দেখতে সময় মতো পৌঁছাতে পারবো কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কালবিলম্ব না করে আমরা তিন ভ্রমণ পিপাসু হন্তদন্ত হয়ে টেক্সি ডেকে ছুটলাম আইফেল টাওয়ার দেখতে। 

আমাদের এবারের টেক্সি ড্রাইভার বেশ ভালো ইংরেজি জানেন। আমাদেরকে আইফেল টাওয়ার সম্পর্কে, প্যারিস শহর সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়ে শর্টকাটে আইফেল টাওয়ারে পৌঁছে দিলেন। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভাড়ার সাথে কিছু বাড়তি ইউরো দেওয়া হলো। 

এতোদিন আইফেল টাওয়ারকে সিনেমা কিংবা নাটকের দৃশ্যে দেখেছিলাম, বইয়ে পড়েছিলাম, আজ খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হলো । টাওয়ারের সামনে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ কিউ থেকে, সেদিনের মতো দেখার চিন্তা বাদ দিয়ে কিছু ছবি তুলে হোটেলে ফিরে আসলাম। আমার কন্যা নানান রকম ভ্রমণের ম্যাগাজিন ঘেঁটে, ভ্রমণের ওয়েবসাইট ঘেঁটে এক আশ্চর্য রকম স্থান আবিষ্কার করলো, সে নাকি আগে থেকেই জানতো এই স্থানটির সম্পর্কে। 

কঙ্কালের পিরামিডে লেখক খাইরুন নাহার চৌধুরী (লাভলী)

পৃথিবীতে এমন জায়গা আছে বলে আমি জানতামও না। আমার কল্পনাতেও ছিল না আমি এমন কিছু কখনও দেখব। অবিশ্বাস্য! ভালো লাগা খারাপ লাগা এই দুই অনুভূতি নিয়ে ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেখলাম "Catacombs of Paris" নামক মানবদেহের কংকালের এক বিশাল সংগ্রহ। এটি ১৫শ শতকের একটি limestone Quarry. প্যারিসের মাটিকে দূষণমুক্ত করার জন্য ১৮শ শতকে এই Quarry কে Ossuary তে পরিণত করা হয়। এখানে সর্ব প্রথম প্যারিসের সবচেয় বড় cemetery থেকে কংকাল এনে সংগ্রহ করা হয়। তার পর একে একে আরো বহু cemetery থেকে কংকাল আনা হয়। French Revolution এর সময় মৃত ব্যক্তিকে সরাসরি এখানে এনে রাখা হতো। তাছাড়াও হাজার হাজার প্লেগ রোগীর কংকালও এখানে আছে। 

সিঁড়ি বেয়ে যখন গুহায় নামছিলাম মনে হচ্ছিল এর বুঝি কোনো শেষ নেই। ১৩০টি সিঁড়ি বেয়ে এক সময় এই অন্ধকার গুহায় পৌঁছোলাম। এসে তো হকচকিয়ে গেলাম! একি! আমার সামনে কতো লক্ষ-কোটি কংকাল আছে তার কোনো ধারণাই আমার নেই। সাথে গাইড হিসেবে ভাড়া করা ওয়াকি টকি ছিল। কিছুক্ষণ শুনবার পর আমি সেটার কথা ভুলেই গেলাম। ওয়াকি-টকি পকেটে রেখে কেবল দেখেই যাচ্ছি, একের পর এক কংকালের পিরামিড। 

খাইরুন নাহার চৌধুরী (লাভলী)লেখক ও ট্রাভেলার 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়