ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৩ মে ২০২১,   বৈশাখ ৩০ ১৪২৮

সীমান্ত দাস

প্রকাশিত: ২১:৪৮, ১৫ এপ্রিল ২০২১
আপডেট: ২২:৫২, ১৬ এপ্রিল ২০২১

পারিবারিকভাবে শুরু হয়েও ষাট বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম

বায়তুল মোকাররম, রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মসজিদটি ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠেছে। একসময় পারিবারিক উদ্যোগে এর নির্মাণ শুরু হলেও এটি বর্তমানে দেশের জাতীয় মসজিদ। এই মসজিদে হাজার হাজার মুসল্লিরা যান প্রাণের টানে।

ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বায়তুল মোকাররম মসজিদ। মসজিদের নগরী হিসেবে পরিচিত রাজধানী ঢাকার পল্টনে এই মসজিদের অবস্থান। ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম এই মসজিদটির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।

শুধু ধর্মীয় দিক দিয়ে নয়, উন্নত স্থাপনার জন্যও এটি বিখ্যাত। ঢাকায় পুরাতন নিদর্শনের মধ্যেও এটি একটি। এছাড়া এর রয়েছে বিশ্বজুড়ে পর্যটক আকর্ষণ। প্রতি বছর শত শত বিদেশি পর্যটক, ফটোগ্রাফার, মিডিয়াকর্মী, ব্লগার এখানে আসেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তো আসছেনই।

ইসলামিক লেখক ওসমান গণি বলেছেন, এই মসজিদ নির্মাণের অনেক আগে থেকেই নতুন ঢাকার সীমানা বাড়তে থাকে। ফলে পুরোনো ও নতুন- দুই ঢাকার মানুষের কথা এই জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় বিবেচনার বিষয় ছিল বলে তিনি মনে করেন।

ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বায়তুল মোকাররমের ঐ জায়গাটিকে তখন নগরীর কেন্দ্রস্থল হিসাবেও বিবেচনা করা হয়েছিল।

ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম মসজিদ

নির্মাণ

ষাট বছরেরও বেশি সময় আগে মক্কার কাবা ঘরের আদলে চারকোনা আকৃতিতে এই মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে প্রথমে এই বিশাল মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলো একটি পরিবারই।

প্রায় সাড়ে আট একর জমির ওপর নির্মিত এই মসজিদ। মসজিদটির সব্বোর্চ গম্বুজের উচ্চতা ৩০.১৮ মিটার। ১৯৬০ সালে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৬২ সালে কাজ মোটামুটি শেষ হয়।

ইতিহাসবিদ শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ঢাকা কোষ-এ বলা হয়েছে, পাকিস্তান আমলে সিন্ধুর স্থপতি এ এইচ থারানি এই মসজিদের নকশা প্রণয়ন করেন। পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তাঁর ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ঢাকায় বিপুল মুসল্লি ধারণক্ষমতার একটি বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় বাওয়ানি পরিবার।

মসজিদের নির্মাণশৈলী

১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সূত্রে পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য প্রায় সাড়ে আট একর জায়গা নেওয়া হয়। স্থানটি নগরীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকেও ছিল নিকটবর্তী। সে সময় মসজিদের অবস্থানে একটি বড় পুকুর ছিল। যা “পল্টন পুকুর” নামে পরিচিত ছিল। পুকুরটি ভরাট করে ২৭ জানুয়ারি, ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান মসজিদটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।

এদিকে ঢাকা কোষ-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি লতিফ বাওয়ানি মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

নির্মান পরবর্তী ইতিহাস

এ মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশার জন্য নিযুক্ত করা হয় সিন্ধুর বিশিষ্ট স্থপতি আব্দুল হুসেন থারিয়ানিকে। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, গ্রন্থাগার ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি (শুক্রবার) প্রথমবারের মতো এখানে নামাজ পড়া হয়।

১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদটি আটতলা। নিচতলায় রয়েছে বিপণিবিতান ও একটি বৃহত্তর অত্যাধুনিক সুসজ্জিত মার্কেট কমপ্লেক্স।

২০০৮ সালে সৌদি সরকারের অর্থায়নে মসজিদটি সম্প্রসারিত করা হয়। পূর্বে ৩০হাজার মুসল্লি একত্রে নামায পড়লেও বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এ মসজিদের শোভাবর্ধন এবং উন্নয়নের কাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

মসজিদের মূল ভবন

বায়তুল মোকাররম মসজিদটি ৮ তলা। নীচতলায় রয়েছে বিপণী বিতান ও বিশাল মার্কেট। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় নামাজ পড়া হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে ওযুর ব্যবস্থাসহ নারীদের জন্য পৃথক নামাজের কক্ষ ও পাঠাগার রয়েছে।

মসজিদটির ১ম তলা ২৬ হাজার ৫১৭, দ্বিতীয় তলা ১০ হাজার ৬৬০, তৃতীয় তলা ১০ হাজার ৭২৩, চতুর্থ তলা ৭ হাজার ৩৭০, পঞ্চম তলা ৬ হাজার ৯২৫ এবং ষষ্ঠ তলার আয়তন ৭৪৩৮ বর্গফুট।

জুম্মা ও ঈদের সময় বাড়তি ৩৯,৮৯৯ বর্গফুটে নামাজ আদায় করা হয়।

এছাড়া, নারীদের জন্য রয়েছে ৬ হাজার ৩৮২ বর্গফুটের নামাজের জায়গা রয়েছে যা মসজিদের তিনতলার উত্তর পাশে অবস্থিত।

পুরুষদের ওজুখানার জন্য ব্যবহৃত হয় ৬ হাজার ৪২৫ বর্গফুট। নারীদের ওজুখানার জন্য ব্যবহৃত হয় ৮৮০ বর্গফুট।

উল্লেখ্য, মসজিদের প্রবেশ পথটি রাস্তা থেকে ৯৯ ফুট উঁচুতে অবস্থিত।

স্থাপত্যশৈলী

বায়তুল মোকাররমের অবকাঠামো কাবাঘরের মতো। এই মসজিদটিতে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বেশ কিছু আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনও রয়েছে। কাবার আদলে নির্মিত অংশবিশেষ বায়তুল মোকাররমকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে।

মসজিদের ভেতরের দিক

বহিঃনকশা

মসজিদটি বেশ উঁচু। এর প্রধান ভবনটি আট তলা এবং মাটি থেকে ৩০.১৮ মিটার বা ৯৯ ফিট উঁচু। প্রধান ভবনটির রং সাদা। মূল নকশা অনুযায়ী, মসজিদের প্রধান প্রবেশপথ পূর্ব দিকে হওয়ার কথা। পূর্ব দিকের সাহানটি ২৬৯৪.১৯ বর্গ মিটারের। এর দক্ষিণ ও উত্তর পার্শ্বে ওযু করার জন্য জায়গা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে, মসজিদে প্রবেশ করার বারান্দার উপর দুটি ছোট গম্বুজ নির্মাণের মাধ্যমে প্রধান ভবনের ওপর গম্বুজ না থাকার অভাব ঘোচানো হয়েছে।

এছাড়াও মসজিদটির রয়েছে নিজস্ব সুদৃশ্য বাগান।

করোনা মহামারীতে বদলে গেছে মসজিদের স্বাভাবিক দৃশ্য

অভ্যন্তরীণ নকশা

মসজিদে প্রবেশ করার বারান্দাগুলিতে তিনটি অশ্বক্ষুরাকৃতি খিলানপথ রয়েছে, যার মাঝেরটি পার্শ্ববর্তী দুটি অপেক্ষা বড়। দুটি উন্মুক্ত অঙ্গন (ছাদহীন ভিতরের আঙিনা) প্রধান নামাজ কক্ষে আলো ও বাতাসের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তিন দিকে বারান্দা দ্বারা ঘেরা প্রধান নামাজ কক্ষের মিহরাবটির আকৃতি আয়তাকার, যার আয়তন ২৪৬৩.৫১ বর্গ মিটার। সমগ্র মসজিদ জুড়েই অলংকরণের আধিক্যকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

শুক্রবারে জুম্মার নামাজে এই মসজিদে উপচে পড়া ভিড় হয়। আর প্রতি ঈদে পাঁচটি করে জামাত হয় এবং প্রতি জামাতেই থাকে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ।

মসজিদের ভেতরের ১৮০ডিগ্রি ভিউ

রমজান মাসে বায়তুল মোকাররম

মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজানে বছরের সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম ঘটে বায়তুল মোকাররমে। এছাড়াও রোজার প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়। ধনী, গরিব-সব শ্রেনির মানুষ এক সাথে বসে ইফতার করেন মসজিদটিতে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বায়তুল মোকাররমের খতিব মিজানুর রহমান বলেছেন, শুক্রবারে জুম্মার নামাজে এই মসজিদে উপচে পড়া ভিড় হয়। আর প্রতি ঈদে পাঁচটি করে জামাত হয় এবং প্রতি জামাতেই থাকে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ।

তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটকও আসেন বায়তুল মোকাররম মসজিদ দেখার জন্য।

বায়তুল মোকাররমে ইফতার

প্রথম রোজা থেকেই করা হয় ইফতারের আয়োজন। সরকারের ইসলামিক ফাউণ্ডেশন এই ইফতার আয়োজনের অর্থায়ন করে।

তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে ইফতারের আয়োজনা বন্ধ রাখা হয়েছে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, গুগল, বিবিসি বাংলা, গেটিইমেজ, ঢাকা কোষ

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়