ঢাকা, মঙ্গলবার ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৭ ১৪৩৩

জিএম ইমরান

প্রকাশিত: ১৩:২৫, ১২ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ১৫:৪৪, ১৩ অক্টোবর ২০২০

ধর্ষণ ঘটনা কেন বাড়ছে?

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত আট মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন প্রায় ৮৮৯ জন নারী । তারমধ্যে ধর্ষণের পর মারা যান প্রায় ৪১ জন নারী। এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেন প্রায় ৯ জন নারী । এছাড়া, প্রায় ১৯২ জন নারীকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৪জন নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।   

কিন্তু দিনকে দিন ধর্ষণ ঘটনা কেন বাড়ছে? এ বিষয়ে কথা বলতে ‘আইনিউজ’ এর মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক সালমা আক্তার। অধ্যাপক সালমা আক্তারের রয়েছে ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংক, ইউএনওমেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে ‘জেন্ডার’ ইস্যু নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা। এছাড়াও রয়েছে গবেষণা বিষয়ক একাধিক প্রকাশনা।

অধ্যাপক সালমা আক্তার, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ধর্ষণ ঘটনা কেন বাড়ছে?

অধ্যাপক সালমা আক্তারের মতে ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার পিছনে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবার অনেকাংশে দায়ী। এ কালচারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে লিঙ্গ বৈষম্যটা কখনো কখনো খুব বেশী বেড়ে যায়। রেইপ হচ্ছে  লিঙ্গ বৈষম্যর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। এখানে একজন মানুষের সবকিছুকেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে। 

আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে ক্ষমতা প্রদর্শন করা। আমরা কীভাবে আমাদের বাচ্চাদের সামাজিকীকরন করছি এমনভাবে যে, একটা ছেলে ছোটবেলায় মার খেয়ে আসলে আমরা বলি প্রতিবাদ করোনি কেন? কিন্তু একটা মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রের তা বলি না। এমনকি ছোটবেলা থেকে শিক্ষা দেয় বিপদে ছেলেদের কাঁদতে নেই, মেয়েরা স্বর উঁচু করে কথা বলতে নেই। এভাবে যখন একটা ছেল বড় হয়, তখন তার ব্যবহারগুলো সে উগ্রতার মাধ্যমে প্রকাশ করে। 

অধ্যাপক সালমা আক্তার আরো বলেন, আমাদের সমাজটা একটা আয়নার মত। কোন একটা ঘটনা আমাদের সমাজ কিভাবে রেসপন্স করে এটাও অনেকবেশী গুরুত্বপূর্ণ।  আমরা দেখছি সমাজ কোন ঘটনা গ্রহণ করছে, আবার কোন ঘটনা করছে না। একটা সময় যে রেপ করতো সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতো। তার বিরুদ্ধে সবাই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতো। 

এখন তার উল্টোটা হচ্ছে। যে রেইপ হচ্ছে, সেই লুকিয়ে থাকছে। আর যে রেইপ করছে, সে বুক ফুলিয়ে হাটছে। এবং সমাজ এটা গ্রহণ করছে। আরেকটা বড় কারণ আমরা সবাই বস্তুবাদী পৃথিবীর দিকে যাচ্ছি। আমাদের কালচারাল, সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এবং সমাজ সেটা গ্রহণও করছে। সমাজ সেটা জন্য মাস্তি দিচ্ছে না। সুতরাং সামগ্রিক অবস্থার কারণে রেপ কালচার বাড়ছে।

পরিবার কিভাবে দায়ী?

অধ্যাপক সালমা আক্তারের মতে, ধর্ষণ কালচারের বিরুদ্ধে মেয়েদেরকে চুপ রাখার পিছনে পরিবারও (মায়েরা) অনেকটা দায়ী। অবশ্য এর একটি কারণ সামাজিক রেসপন্স।কেননা, যারা প্রতিবাদী হয়, সমাজ তাদেরকে নেগেটিভলি দেখে। ফলে মায়েরা একধরণের অপরাধী বোধ করে। তাছাড়া, একটা মেয়ের ধর্ষিত হওয়ার পরে জীবনের অনেকাংশ পড়ে থাকে। ফলে, অনেক মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার পরও তার পরিবার এ ঘটনার কোন প্রতিবাদ না করে চুপ থেকে যায়। কেননা, আমাদের সমাজে ধর্ষিতা মেয়েদের কেউ বিয়ে করতে চায় না। এ সুযোগে ধর্ষকরা আরো সুযোগ পেয়ে যায়।

কিন্তু আমাদের সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে, একজন ভিক্টিমকে ধর্ষিতা হিসেবে না দেখে। কেউ আড়চোখে না তাকায়। তাহলে, দেখা যাবে একটা মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার পর প্রতিবাদ করছে। তখন ধর্ষকেরা ভয় পেয়ে যাবে।

বিচার প্রকিয়া ধর্ষণের জন্য কতটুকু দায়ী?

অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা ধর্ষণের জন্য অনেকটা দায়ী। আমাদের দেশে ধর্ষণের বিচারটা খুবই দীর্ঘ বিষয়। ততদিনে স্বাক্ষীরা স্বাক্ষী দিতে অপারগতা স্বীকার করে। এবং দীর্ঘদিনে ঘটনার প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া, কোন ধর্ষণ ঘটনার পরে আমরা খুব হইচই করি। কিন্তু কোন একটা ধর্ষণ ঘটনার পরে দেখা যায়, অন্য আরেকটা ইস্যু চলে আসলে আমরা সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একপর্যায়ে আমরা, ধর্ষণ ঘটনাটা ভুলে যায়। এজন্য, ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অধ্যাপক সালমা আক্তার আরো বলেন, আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় বিচারক এবং পুলিশ-প্রশাসন এর সংখ্যা অনেক কম। সেজন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আমাদের গ্রাম্য-সালিশী ব্যবস্থার সাথে সংযুক্তদের দক্ষ করে তোলা যেতে পারে। যাতে ধর্ষণ বিচারের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায়। কেননা, আমাদের দেশের ধর্ষণ ঘটনার অধিকাংশই গ্রামে ঘটে থাকে।

রাজনৈতিক প্রভাব ধর্ষণ মামলায় কতটুকু প্রভাব ফেলে?

রাজনৈতিক প্রভাব ধর্ষণের বিচার-ব্যবস্থায় অনেকটা প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন, অধ্যাপক সালমা আক্তার। তিনি বলেন, দেখা যায় ক্ষমতাশীল কারও দ্বারা ধর্ষিত হলে কোন মেয়ে সহজে মুখ খুলতে চায় না। তবে, এ ক্ষেত্রে  একজন ভিক্টিম ৯৯৯ এ কল দিয়ে খুব সহজে ব্যবস্থা নিতে পারে। বর্তমানে, এ ব্যবস্থায় অনেক সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এবং এ সেবার মাধ্যমে অধিকাংশ ঘটনায় ভিক্টিমের পরিচয় গোপন থাকছে। তবে, এ ক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

কোন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ধর্ষণ প্রবণতা বেশী?

অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, সমাজের সববয়সী নারীদের নিয়ে ধর্ষণ বিষয়ক গবেষণা আমার নেই। তবে শুধুমাত্র ১১৭ জন মেয়ে শিশুর উপর প্রাথমিক গবেষণা করে দেখা গেছে, ৪০.৭০ শতাংশ মেয়ে শিশু প্রতিবেশী দ্বারা, ২০.১০ শতাংশ মেয়ে শিশু নিকটাত্মীয় দ্বারা, ৩০.২০ শতাংশ মেয়ে শিশু গৃহ-শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে।

এছাড়া, ৩৫ শতাংশ মেয়ে প্রেমিকের দ্বারা ধর্ষিত হয়।

কীভাবে ধর্ষণ ঘটনা কমানো যেতে পারে?

অধ্যাপক সালমা আক্তারের মতে, দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এবং, ধর্ষিত হওয়ার সাথে সাথেই ভিক্টিমকে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, ঘটনার পর একজন ভিক্টিম প্রচন্ড রকমের মানসিক পীড়ার মধ্যে দিয় যায়। ফলে, বিচারে সময় সে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে পারেনা। যার কারণে, অনেক সময় সঠিক প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা বেঁচে যায়। 

অধ্যাপক সালমা আক্তার আরো বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় নারী ভিক্টিমের জন্যও পুরুষ চিকিৎসকে নিয়োগ করা হয়। যার কারণে একজন নারী ভিক্টিম হওয়ার পরে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে চান না। ফলে, ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। তাই, ভিক্টিমরা চিকিৎসা নিতে যাতে কোন ধরণের লজ্জাবোধ না করে সেজন্য ভিক্টিমদের চিকিৎসায় নারী চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে। এবং দেশে নারী চিকিৎসক বাড়াতে হবে।

নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানী বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে কি?

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নির্দোষ ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির জন্য তার উপর ধর্ষণের অভিযোগ আনা ফলে। যার ফলে, প্রকৃত ধর্ষক এবং ধর্ষণ ঘটনা আলোচনার বাইরে থেকে যায়। এবং, ধর্ষণের বিষয়টা মানুষ হালকাভাবে নিতে থাকে। আর এ দ্বারা, ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় বলে মনে করেন, অধ্যাপক সালমা আক্তার।

এজন্য কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানীর শিকার না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওয়তায় আনা হয়। সেজন্য, পুলিশ-প্রশাসন এবং জনগণকে সচেতন থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

জিএম ইমরান/ নিজস্ব প্রতিবেদক/ আইনিউজ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়