ঢাকা, সোমবার   ১৬ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৯

সেলিম আহমেদ

প্রকাশিত: ১৪:০২, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১
আপডেট: ১৭:৪৪, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১

নব উচ্ছ্বাসে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ

পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের দিন আজ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম আর টানা ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পর ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছিলাম একটি লাল সবুজ পতাকা। এর জন্য হারাতে হয়েছিল ৩০ লাখ তাজা প্রাণ আর দু’লাখ মা বোনের ইজ্জত। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এক-দুই করে ৫০ বছরে পা দিল বাংলাদেশ । বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী আজ।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৬ গুণের বেশি। অর্থাৎ ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছিলেন। সেখানে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে এবার হিসেব মেলানোর পালা। যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এক দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল; তা কী আসলেই পূর্ণতা পেয়েছে। প্রথমেই যদি প্রাপ্তির কথা বলি, হ্যাঁ , আমরা অনেক পেয়েছি। ‘আপাত সম্ভবনাহীন’ একটি দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ। সেই সময়ের নানা পরিসংখ্যানের বিচারে বাংলাদেশ ছির পৃথিবীর দরিদ্রতম একটি দেশ। ১৯৭২ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ২০৩৫ সালের মধ্যে সেই দেশটি হতে যাচ্ছে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

এই পঞ্চাশ বছরে বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয়। রপ্তানিও বেড়েছে বহুগুণ, একইসঙ্গে বেড়েছে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যাও।‘মেড ইন বাংলদেশ’ খচিত পোশাকসহ নানা পণ্য এখন গোঠা বিশ্বে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। মহামারি করোনাকালে গোঠা বিশ্বের নানা দেশে যখন প্রবৃদ্ধির হার কমে কমতির দিকে ঠিক তখনই বাংলাদেশে আকর্ষণীয় প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় গিয়েছে।

বিবিএস ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-১৯৭৪অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিলো মাত্র ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপির আকার ছিলো ৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। আর মাথাপিছু আয় মাত্র ১২৯ ডলার। দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশ।

বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে এসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বহুগুণে বেড়ে মিলিয়ন ডলার থেকে এসেছে বিলিয়ন ডলারের ঘরে। ২০২০ সালের হিসেবে ৩৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতি বিরাজ স্বত্ত্বেও ২০২১ সালে তা আরও বেড়েছে। জিডিপি আকার ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে বেড়েছে ৩৬৯ গুণ। পরিমাণে যা প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৬ গুণের বেশি। অর্থাৎ ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছিলেন। সেখানে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে দেশের অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। একেকটি মেগা প্রকল্প তাঁক লাগিয়ে দিচ্ছে পুরো বিশ্বকে। শহরে শহরে হয়েছে বড় বড় ফ্লাইওভার, রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে মেট্রোরেল। মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। পুরো দেশে প্রায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবমেরিন, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মহাসড়কগুলো ফোরলেন, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালুসহ দেশজুড়ে রাস্তাঘাট কালভার্ট নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। 

সবমিলিয়ে কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক ও জরিপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এতোসব উন্নয়নের মধ্যেও প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসেবে রয়েছে গড়মিল। বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসেও আমরা উপহার দিতে পারিনি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, শোষণবিহীন কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণই ছিল আমাদের স্বাধীনতা। 

সংগ্রামের প্রধানতম উদ্দেশ্য। জাতির পিতা সে লক্ষ্যেই নতুন দেশের যাত্রা শুরু করেছিলেন। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই জাতির পিতা দেশে ফিরে শাসন ক্ষমতাগ্রহণের পরপরই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। সংবিধানে চারটি মূলনীতি-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্তি হয়। কিন্তু সেই মূলনীতি থেকে এখন আমরা অনেক দূরে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দিন দিন বাড়ছে বৈষম্য। এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি শোষন বিহীন সমাজ। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এখনো উন্নয়নে সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা পাচ্ছে না গুণগত শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সুশাসন। সব সুফল ভোগ করছে গুটি কয়েক মানুষ।

দেশের সর্বত্র ক্ষমতাবানদের লোভের লড়াইয়ে দেশে জন্ম নিচ্ছে অস্থিরতা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সামাজিক অবক্ষয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র নির্মাণের জন্য রাজনৈতিক পরিমন্ডলকে যে পুনর্গঠনের দরকার ছিল তাও হয়নি। মানুষ হারাচ্ছে ভোটের অধিকার। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এখনো বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে এসে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো-জীবন বাজি রেখে এই লাল-সবুজ পতাকা এনে দেয়া সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা আমরা আজও জানিনা। দেশদ্রোহী রাজাকারদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা থমকে আছে অজ্ঞাত কারণে। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা, বধ্যভূমি চিহ্নিত করন ও সংরক্ষণ, বীরঙ্গনাদের পুর্ণবাসনও হয়নি এই অর্ধশতকে। থমকে আছে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম। এসব অসাপ্ত কাজগুলো কবে হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

কবি হেলাল হাফিজের তার ‘একটি পতাকা পেলে’ কবিতায় লিখেছেন,‘... কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে, আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে/সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ, সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে’। আমরা আর দুঃখ পুষে রাখতে চাইনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আকাক্সক্ষা করি, অতীত-বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে মানুষের সকল প্রত্যাশা পূরণে অগ্রসর হবে বাংলাদেশ। নব উচ্ছ্বাসে এগিয়ে যাক আমার প্রিয় দেশ।

সেলিম আহমেদ, সাংবাদিক

আইনিউজ ভিডিও 

ঘুরে আসুন মৌলভীবাজারের পাথারিয়া পাহাড়

হাইল হাওরের বাইক্কাবিলে পর্যটক আর পদ্মটুনার ভিডিও ভাইরাল

জলময়ূরের সাথে একদিন | বাইক্কা বিল | ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়