ঢাকা, সোমবার   ১৬ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৯

মাসকাওয়াথ আহসান

প্রকাশিত: ২৩:৫৯, ২৪ জানুয়ারি ২০২২

শ্রেণিহীন হয়ে বাঁচার পণ

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান

সম্প্রতি এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে 'চাষাভুষা' শব্দটি তুচ্ছার্থে ব্যবহার করতে দেখে বিস্মিত হয়েছি। যে মানুষটি আপনার মুখে ভাত তুলে দেয়, তাকে আপনি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন কোন মুখে! আমি ঢাকায় এসে কথায় কথায় 'ক্ষ্যাত' শব্দটি ব্যবহার করতে দেখে অনুসন্ধান শুরু করি; কারা এই কৃষক শব্দটিকে তুচ্ছার্থে ব্যবহার করেন। ব্রিটিশদের প্রথমে এই পেয্যান্টস শব্দটি তুচ্ছার্থে ব্যবহার করতে দেখি। এই ব্রিটিশগুলো কোন প্রকৃতির তা বুঝতে চেষ্টা করি। যাদের দু'তিনশো বছর আগেই বিস্তর জমিজমা ছিলো; সেরকম ব্রিটিশ কিন্তু কৃষক শব্দটি কখনো তুচ্ছার্থে ব্যবহার করেন না। এটা করে তারাই যারা ভাগ্যান্বেষণে লন্ডনে এসেছিলো; এরপর ফাটকাবাজি করে সাহেব হয়েছে। আরেকটি প্রবণতা দেখা যায়, যেসব ব্রিটিশ অত্যন্ত দরিদ্র দশা থেকে দরিদ্র কৃষক পিতার অন্নে লালিত হয়ে পরে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলো; তারা নিজের অতীত লুকাতে 'পেয্যান্টস' বলে গালি দিতো সাধারণ জনগণকে।

বাংলাদেশেও কোন সম্পন্ন কৃষক পরিবারের ছেলে-মেয়ে বা যাদের একটু পুরোনো কালেও বেশ জমিজমা ছিলো, যাদের নানা-দাদাদের কাছে কৃষক ছিলো সন্তানতুল্য; তারা মরে গেলেও কৃষক শব্দটিকে তুচ্ছার্থে ব্যবহার করতে পারে না। বরং এই গালি তার গায়ে লাগে। কারণ কৃষক তার পরিবারের সদস্য। ভূমিহীন ও ভুঁইফোঁড়েরাই দুর্নীতির মাধ্যমে একপুরুষে ফর্সা জামাকাপড় পরে ধরাকে সরাজ্ঞান করে। এদেরকে অভিনেতা মোশাররফ করিমের ভাষায় 'ফইন্নির ঘরের ফইন্নি' বলা হয়।

আমার কিছু বন্ধু আছেন যারা যে কোন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও জমিদারদের গালাগাল করেন। অথচ এই জমিদার রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরের কাচারি বাড়ির প্রথম বৈঠকে এসে কৃষকদের মেঝেতে বসে থাকতে দেখে বলেছিলেন, আমি চেয়ারে বসবো না। সবার জন্যই মেঝেতে আসন পাতা হোক। এই দক্ষিণ এশিয়ায় কিছু জমিদার কয়েকশো বছর ধরেই রয়েছে। তাদেরকে অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করে তারাই, যারা নতুন জমিদার হয়ে অত্যাচার করতে চায়। রাজা-বাদশাহকে কর সংগ্রহ করে দেবার দায়িত্বে ছিলো জমিদারেরা। এই কর সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে অনেক জমিদার নিজেই শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছেন; এমন পরিবার এই পূর্ববঙ্গেই ছিলো। টি-গার্ডেন বা এরকম সম্পন্ন চাকরিতে থাকা আত্মীয়ের কাছে টাকা ধার করে খাজনা দিয়েছেন; এমন জমিদারও ছিলো। খরায় ফসল পুড়ে গেছে; তবু ব্রিটিশের ট্যাক্স দিতে হবে; এমন টেনশানে হার্ট এটাকে মারা গেছেন অনেক কৃষক-দরদী তরুণ জমিদার। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের জমিদারের ছেলেরাই কম্যুনিস্ট পার্টি করেছে। সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখার মতো রোমান্টিসিজম; মাসলোর হায়ারার্কি অফ নিড পূরণ না হলে; কখনোই সম্ভব না। কাজেই সমাজে 'চাষা-ভূষা' বা 'ক্ষ্যাত' জাতীয় কৃষককে ছোট করা প্রপঞ্চের ব্যবহারের প্রসঙ্গ এলেই চট করে 'জমিদার'-দের গালি দেয়া ভুল।

বরং তাকিয়ে দেখুন ফইন্নির ঘরের ফইন্নিদের দিকে যারা রাজনীতির আঁচল ধরে খড়ের ঘর থেকে প্রাসাদে উঠেছে। একপুরুষের 'খোকন সোনা' হয়ে চুলে জেল মেরে ক্যাতরায়ে সেলফি তুলছে; গ্লোরিয়া জিনসে চেক ইন দিয়ে দেশপ্রেমের গপ্পো শোনাচ্ছে। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে হড়বড় করে নিও এফলুয়েন্স শো অফ করছে। শিল্প বিপ্লবোত্তর ইউরোপে এরকম এক প্রজন্মের ধনীদের বলা হতো ফিলিস্টাইন্স। সারাজীবন রেললাইনের ধারে প্রাতঃক্রিয়া সেরে এখন এটাচড বাথ আর হাইকমোড ছাড়া আত্মবর্জ্য ত্যাগ করতে পারেনা; এতোই তেল হয়েছে এগুলোর।

এই লজিং মাস্টারগুলো গরীব মারার সংকল্পে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমায়, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায়। নীতিনির্ধারণে কৃষক মারার খুনে লোকগুলো সবই ভূমিহীন শ্রেণি থেকে আসা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এই শিক্ষক হয়েছে দলীয় বুদ্ধি আবর্জনার স্তূপে তেলের বিনিময়ে খাদ্য নিশ্চিত করে; তারই এতো তেল হয়েছে যে, চাষাভুষা শব্দটি অবলীলায় ব্যবহার করে। ওসব মূলত ভিক্ষুকদের ডাকাত হয়ে ওঠার গল্প। এ কারণে যেসব মানুষ নিজের জমি বিক্রি করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি করতেন, দল ক্ষমতায় থাকলে; তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না ক্ষমতার ত্রিসীমানায়। কারণ সম্পন্ন পরিবার থেকে আসা মানুষেরা দাস হতে পারে না। হাওয়া ভবনে বা সুচিন্তাভবনে গিয়ে অদৃশ্য সাবানে হাত কচলাতে পারে না।

যেহেতু সাদা-কালোয় সব উপপাদ্যের নিদান নেই; ধূসর এলাকাটায় এই উদ্ভিন্ন সামাজিক গতিশীলতার বিশৃঙ্খলার নিদান খুঁজতে হবে। কোন দরিদ্র বালক সাহায্য চাইলে তাকে সাহায্য করি, কিন্তু এ-ও জানি এই ছেলেটিকে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিয়ে দিলে; সেই খুনে উঠবে। সীমাহীন সম্পদ বৈষম্য আর সামাজিক গণতন্ত্রহীনতায়; বাংলাদেশ এক কেড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার হিংস্র জনপদ। মাত্র দশ হাজার টাকার জন্য এক রাজমিস্ত্রি সম্প্রতি এক অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে হত্যা করেছে। এক সাংবাদিক 'স্যার না বলায়' বিক্ষুব্ধ হয়েছেন এক নির্বাচন কর্মকর্তা। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জীবন সরকার দলীয় খুনে ডাকাত আর পোষ্য পুলিশ-এলিট ফোর্সের তাণ্ডবে এতোই নির্যাতিত আর অপমানিতের জীবন, দলের দুর্নীতি মেশিন পেয়ে এক পুরুষে ধনী হওয়া দাম্ভিক লোকের দম্ভের স্টিম রোলার এইখানে অহোরাত্রচলে। ফলে অত্যাচারিত বস্তির কিশোর পুলিশ হবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পুলিশ হয়েই ভুলে যায় নিজের অতীত, বস্তির মানুষের ওপর চড়াও হয়। এইজন্য 'বাদামওয়ালার ছেলে' ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে; এ খবর আমাকে আনন্দিত করে না। আমি জানি এই ছেলেটি বাদামওয়ালাদের শহর ছাড়া করবে। রিকশাওয়ালার মেয়ে ইউএনও হয়েছে এ খবরে আনন্দিত হই না; বরং ভয় বাড়ে, মাছওয়ালা স্যার না বললে তাকে ধাক্কা দিয়ে ড্রেনে ফেলে দেবে এই মেয়েটি। হাইল্লার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক হয়েছে শুনলে ভয় লাগ, সে 'চাষাভুষা' শব্দটি তুচ্ছার্থে ব্যবহার করবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে সমাজের প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা করার বোধ জারিত করতে হবে। আমি সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রতিটি কোর্সের শুরুতেই বলি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌকিদার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে শিক্ষক-উপাচার্য সবাইকে একই চোখে দেখতে শেখো; নইলে বাকিসব শিক্ষার কোন মানে হয় না। ইউরোপে যেমন দালান-নির্মাতা শ্রমিক আর বড় কোম্পানির সিইও ট্রামে পাশাপাশি সিটে বসে থাকে। অথচ সিভিল সার্ভিসে থাকার সময় এক নৈশভোজে, এর আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনকারী এক বাউল-এর পাশে বসতে চায়নি আমারই এক সহকর্মী। সমাজের এই নিষ্ঠুর শ্রেণি সচেতনতা দেখে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। সেই থেকে পণ করেছি, যতদিন বাঁচবো ঐকান্তিক শ্রেণিহীন হয়ে বাঁচবো।

মাসকাওয়াথ আহসানলেখক ও সাংবাদিক

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়