ঢাকা, শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ৩১ ১৪২৭

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:৪৩, ১ আগস্ট ২০২০
আপডেট: ০১:৪৫, ১ আগস্ট ২০২০

জন্মদিনে জানা অজানার সমরজিৎ রায়

পৃথিবীতে আসলে নির্বোধেরাই কোনকিছু নিয়ে অহঙ্কার করেন। বিশেষ করে সঙ্গীতে অহঙ্কারের কোন জায়গাই নেই। সঙ্গীত শিক্ষার যতই গভীরে যাওয়া হয় ততোটাই আমাদের অক্ষমতা গুলো প্রকাশ পেতে থাকে। যতটাই শিক্ষা নিই ততই সংগীতের মহাসমুদ্রে নিজেকে শূন্য মনে হতে থাকে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের এক অন্যতম জনপ্রিয় নাম সমরজিৎ রায়। আজ ১ আগস্ট তার জন্মদিন। আই নিউজের পক্ষ থেকে শিল্পীর জন্য রইলো অনেক অনেক শুভেচ্ছা। জন্মদিন উপলক্ষ্যে আই নিউজের সঙ্গে দীর্ঘ বিশেষ আলাপচারিতায় জানিয়েছেন তার জীবনের জানা অজানা অনেক কথা। পাঠকদের জন্য চুম্বক তথ্য তুলে ধরা হলো। 

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচিতি

নাম : সমরজিৎ রায়
বাবা : নেপাল চন্দ্র রায়, পেশায় শিক্ষক
মা : রত্না রায়

ভাই বোন
তিন ভাই, এক বোন। বড়ো দুই ভাই পেশায় চিকিৎসক এবং ছোট বোন সিনিয়র সহকারী জজ।

জন্ম তারিখ : ১ আগস্ট
জন্মস্হান: কক্সবাজার

নেশা ও পেশা
সঙ্গীতশিল্পী, পাশাপাশি সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।
শিক্ষকতা : দিল্লীর গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাক্তন শিক্ষক।
প্রথম স্টেজে গাওয়া : ৪ বছর বয়সে।
সঙ্গীতে আসার পেছনে অনুপ্রেরণা : মা, বাবা।
প্রথম ব্যান্ড : সান্নিধ্য (দিল্লী)।
প্রথম প্লেব্যাক : মুখিয়া জী (মৈথিলী ছবি)।
নিজের সঙ্গীত গ্রুপ : রাগিনী (দিল্লী)।
প্রথম বাংলা এলবাম : অনুপ জলোটার সঙ্গে দ্বৈত এলবাম 'অচেনা একটা দিন'।

প্রথম হিন্দী এলবাম: "তেরা তসব্বুর"।
হিন্দী ও বাংলা এ্যালবাম : "অচেনা একটা দিন", "তেরা তসব্বুর", "রবি রঞ্জনী", "এক চিলতে রোদ", "প্রতিধ্বনি", "ফিকর", "গোধূলিবেলা", "জোৎস্নারাতে"।একক মৌলিক গানের সংখ্যা: ৭০ এর অধিক।

নিজের গাওয়া বিশেষ গানগুলো
"এ ঘোর শ্রাবণে", "ভুলে যেতে বোলোনা", "তুমি ভোরের পাখির মতো", "ও যে আমায় মন্দ বলে", "বেহাগের সুরে", "ও রূপসী চাঁদ", "সইয়া", "বালম মোরে", "দেখ উনকো", "তুম বিন", "বিষাদের গানের ভেলা", "যদি কাঁদাতেই চেয়েছো আমায়", "শহরতলী চুপ", "মেঘবালিকা", "গাগরী ভরনে", "সত্যি ভালোবাসি" প্রভৃতি।

পুরষ্কার :
প্রথম হিন্দী এলবাম "তেরা তসব্বুর" ২০১১ সালে ভারতের 'জিমা এওয়ার্ড' এ "সেরা জনপ্রিয় এলবাম" বিভাগে মনোনয়ন পায়।

সংগীত বিশারদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় সর্ব ভারতের গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করায় প্রাপ্ত এওয়ার্ডগুলো হলো: পন্ডিত ডি.বি পলুস্কর এওয়ার্ড, হরি ওম ট্রাস্ট এওয়ার্ড, সঙ্গীতা বসন্ত বেন্দ্রে এওয়ার্ড, বাসুদেব চিন্তামন এওয়ার্ড, নলিনী প্রতাপ কানবিন্দে এওয়ার্ড, সুশীলা এওয়ার্ড, সুখবর্ষা রায় এওয়ার্ড ইত্যাদি এবং বাংলাদেশে লাক্স আরটিভি স্টার এওয়ার্ড ২০১৫।

গুরু
শ্রীমতি পদ্মা দেবী, পন্ডিত নির্মলেন্দু চৌধুরী, পদ্মশ্রী পন্ডিত মধুপ মুদ্গল, পদ্মভূষণ পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী, পন্ডিত সারদা প্রসন্ন আচার্য্য, পন্ডিত সুধাংশু বহুগুনা, শ্রী সন্দীপ শ্রীবাস্তব প্রমুখ। তাছাড়া বিশেষ গুরু হলেন কিংবদন্তী শিল্পী মান্না দে ও কিংবদন্তী শিল্পী মৃণাল চক্রবর্তী দাদু।

যাঁদের সঙ্গে দ্বৈত গান ও সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করা হয়েছে : কিংবদন্তী শিল্পী অনুপ জলোটা, হৈমন্তী শুক্লা, অন্বেষা দত্তগুপ্ত, রূপরেখা ব্যানার্জী, সঞ্চিতা ভট্টাচার্য, প্রিয়াংকা গোপ।

একান্ত সান্নিধ্য বা কাজ করার সৌভাগ্য
মান্না দে, মৃণাল চক্রবর্তী, অনুপ জলোটা, পন্ডিত যশরাজ, পন্ডিত শিবকুমার শর্মা,পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া,ওস্তাদ জাকির হোসেন, জগজিৎ সিং, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, নির্মলা মিশ্র, হৈমন্তী শুক্লা, অজয় দাস, বটকৃষ্ণ দে, শ্রাবন্তী মজুমদার প্রমুখ।

বিশেষ প্রাপ্তি
পুলক বন্দোপাধ্যায়, মৃণাল চক্রবর্তী, অজয় দাস এবং বটকৃষ্ণ দে'র মতো স্বর্ণযুগের কিংবদন্তী গীতিকার ও সুরকারদের কথা ও সুরে নিজের বেশ কিছু মৌলিক গান গাইতে পারা।

সবচেয়ে ভালবাসি : বাবা, মা এবং আরণ্যক (ভাগ্নে)।

গর্ব হয় : বাবার মতো এমন গুণী আদর্শ একজন মানুষ ও শিক্ষকের সন্তান হতে পেরে।
কষ্ট : মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো কেউ না বোঝা।
এড়িয়ে চলি : লোক দেখানো ভালোবাসা।
আনন্দের স্মৃতি : দিল্লীর গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে আমার ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো ক্লাসের সমস্ত দিনগুলো।

নতুন শিল্পীদের উদ্দেশ্যে
সঙ্গীতের জন্য প্রয়োজন শুধু সাধনা আর ইচ্ছে।
আবার জন্ম নিলে: ভীষণ সুরে গাওয়া একজন প্ৰকৃত সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার ইচ্ছে।

ভক্তের গুরুত্ব
আমার কাছে ভক্তদের গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। ভক্তদের ছাড়া আমাদের আসলে কোন মূল্যই নেই। সবসময়ই চেষ্টা করি তাঁদের মেসেজের জবাব দেওয়ার, যদিও প্রতিদিন সেই সংখ্যাটা এতো বেশিই থাকে যে মাঝে মাঝে হিমশিম খেতে হয়, তাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করি কাউকে নিরাশ না করতে।

ভক্তরা যেভাবে যোগাযোগ করবেন : ফেইসবুকে

শিল্পী ও অহঙ্কার
পৃথিবীতে আসলে নির্বোধেরাই কোনকিছু নিয়ে অহঙ্কার করেন। বিশেষ করে সঙ্গীতে অহঙ্কারের কোন জায়গাই নেই। সঙ্গীত শিক্ষার যতই গভীরে যাওয়া হয় ততোটাই আমাদের অক্ষমতা গুলো প্রকাশ পেতে থাকে। যতটাই শিক্ষা নিই ততই সংগীতের মহাসমুদ্রে নিজেকে শূন্য মনে হতে থাকে। আর তাছাড়া শিল্পীদের গলা পুরোপুরি সৃষ্টিকর্তারই দান, আমরা এটাকে ঘষামাজা করে আর একটু পরিষ্কার করতে পারি শুধু। তাছাড়া এমন কোন কিছুই নেই যা আমরা মৃত্যুর সময় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারি, তাই অহঙ্কার করার মতো সত্যিই কিছু নেই মানুষের।

প্রকৃত সৌন্দর্য : অবশ্যই মনের।
বিদেশে অনুষ্ঠান : জার্মানী, বেলজিয়াম, ভারত।
প্রিয় মুহূর্ত: ভারতের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট আব্দুল কালামের সঙ্গে তিনবার মধ্যাহ্ন ভোজনে অংশগ্রহণ।

প্রিয় ভালোলাগা : কোন না কোনভাবে মানুষের উপকারে আসতে পারা।
আমার কাছে ভালবাসার প্ৰকৃত মানে: প্রিয় মানুষটির জীবনের সমস্ত দূর্বল দিকগুলো মেনে নিয়ে ও মনে নিয়ে তাকে আজীবন আঁকড়ে ধরা এবং বিশ্বাস জোগানো যে "আমি আছি, সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে"।

প্রিয় কাঙ্খিত মুহূর্ত : টিনের চালে ঝুম বৃষ্টিতে পাশে বসে প্রিয় মানুষের কন্ঠে গান শোনা এবং শোনানো।
মধুর দৃশ্য: শীতের সকালে বাড়ির উঠোনে মোয়া মুড়ি খেতে খেতে বাবার সাথে বসে রোদ পোহানো এবং একটু দূরে মা'র শাক কুটাকুটির অভূতপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করা।

প্রিয় নিজস্ব অনুভূতি
ভালো লাগার সর্বোচ্চ মাত্রা হলো তীব্র কষ্ট, আর কষ্টের চূড়ান্ত পর্যায়ে মেলে অনন্ত সুখ। আমার মেজাজ ভীষণ পরিবর্তনশীল। খুবই সূক্ষ্ম কিছুর জন্য প্রচন্ড কষ্ট পাই, আবার অন্যদিকে ভীষণ সূক্ষ্ম কিছুর জন্য পাই তীব্র সুখ। যেমন দেখা গেলো সারাদিন মন ভীষণ খারাপ হয়ে আছে, গোধূলিবেলায় হঠাৎ মুক্ত আকাশে এক ঝাঁক পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড ভালোলাগায় মনটা ভরে যায়।

উদাস করা দৃশ্য
গভীর রাতে সমুদ্রতীরে একা দাঁড়িয়ে দূর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে জল। উত্থাল সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর মনের হাহাকারের নিঃশব্দতায় স্মৃতির মুকুরে হাতড়ে বেড়াই যেন কতো কিছুই।

গানের ঘর "স্বপ্নতরী"
আমার প্রাণের জায়গা আমার গানের ঘর "স্বপ্নতরী"। ভোরবেলা যখন তানপুরা নিয়ে এই ঘরে রেয়াজে বসি দখিনা বাতাস গায়ে এসে লাগে। চারিদিকে পাখির কলতান, দূরের আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা উড়ে বেড়ায়, সামনে পুকুরে দল বেঁধে রাজহাঁসেরা সাঁতার কাটে। আবার কখনো দেখা গেলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, কখনোবা পূর্ণিমা রাতে গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উঁকি দেয় আমার স্বপ্নতরীতে। সেই আলোতে বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ার দৃশ্য আসলে বলে বোঝানো যাবেনা, এ যেন স্বর্গসুখ। ওই সময়গুলো জীবনের প্রাপ্তি।

কল্পনায় প্রিয় অন্যায় আব্দার
প্রিয়জনটি সারাক্ষণ কারণে অকারণে করা আমার অভিমানগুলো ভাঙাতে থাকবে। আমার কল্পনার স্বপ্নগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

প্রিয় কল্পনার দৃশ্য
নির্জন পাহাড়ের উপরে এক বাংলোয় বৃষ্টির এক বিকেল। ঝুমঝুম বৃষ্টি, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। হালকা ভলিউমে বাজছে হেমন্ত মুখার্জীর কন্ঠে রবি ঠাকুরের "সঘন গহন রাত্রি ঝরিছে শ্রাবণ ধারা"। জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে দূর দৃষ্টিতে বৃষ্টি দেখছি। বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির ঝাপটা এসে আমার চোখে মুখে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আহা শান্তির পরশ। তবে পাহাড়ের ঝুম বৃষ্টি অনুভব করার মানসিকতার সঙ্গী দুর্লভ। পাহাড়, বৃষ্টি, সমুদ্র, পূর্ণিমার চাঁদ আর সঙ্গে রবি ঠাকুরের গানই হলো পৃথিবীতে স্বর্গসুখ অনুভূতির অন্যতম উপায়।

ভয় পাই
অকারণে অনেকেই আমাকে ভুল বোঝেন, এটা আমার ভয়ের বড়ো একটা কারণ। মাঝে মাঝে অনেক রাগারাগি করলেও ভেতরে আমি প্রচন্ড নরম মনের মানুষ। কাউকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে ভালো লাগেনা কিংবা কারো লাশ দেখতে পারিনা ছোটবেলা থেকেই। এই ব্যাপারগুলো ভীষণ ভাবে কষ্ট দেয় আমাকে। নিজের মৃত্যুকে কখনোই ভয় পাইনা, ভয় পাই কাছের মানুষদের হারানোর।

পৃথিবীর সমস্ত সন্তানদের জন্য উপদেশ
বাবা মার চেয়ে মূল্যবান পৃথিবীতে আর কেউ নেই। জন্ম থেকে তাঁরা যেভাবে সন্তানদের আগলে রেখে বড়ো করেন ঠিক তেমনি আজীবন তাঁদের যত্নের পুরোপুরি দায়িত্ব সন্তানের। প্রতিদিন তাঁদের ভালো লাগা খারাপ লাগার খবর নিন। তাঁদের সঙ্গে বসে অন্তত একবেলা হলেও খাওয়ার চেষ্টা করুন, এতে তাঁদের ভালো লাগবে। দিনে অন্তত বেশ ক'বার জিজ্ঞেস করুন তাঁদের কিছু প্রয়োজন আছে কিনা। নিয়মিত তাঁদের শরীরের খোঁজ নিন, কোনো ঔষধপত্র লাগবে কিনা তাও জেনে নিন। সম্ম্ভব হলে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমানোর আগে তাঁদের রুমে গিয়ে একবার দেখা করুন। তাঁদের ভালোলাগার বিষয়গুলোর মূল্য দিন এবং তাঁদেরকে অনুভব করান যে তাঁরা আপনার কাছে ভীষণ মূল্যবান। মনে রাখবেন এই দু'জন মানুষের অভাব জীবনে আর কাউকে দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়।

ফেসবুক পেইজ
www.facebook.com/samarjitroy.music

ইউটিউব চ্যানেল
www.youtube.com/c/SamarjitRoyMusic

আইনিউজ/এইচকে

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়