ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১,   ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭

রাকিবুর রহমান

প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১
আপডেট: ১৭:০১, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

হঠাৎ আলোচনায় কাদের মির্জা, কী চান তিনি?

আবদুল কাদের মির্জা। বর্তমান সময়ে আলোচিত একটি নাম। প্রায় দুই মাস আগে হঠাৎ আলোচনায় আসা এ ব্যক্তি জাতীয় রাজনীতিতে তেমন পরিচিত মুখ না হলেও তার অন্যতম পরিচয়- তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই।

এক দশকের বেশি সময় বসুরহাট পৌরসভা মেয়রের দায়িত্বে থাকা আবদুল কাদের মির্জার আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না পরিবার, প্রশাসন এমনকি আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নেতারাও। কখনো ফেসবুক লাইভে, কখনো সংবাদ সম্মেলনে, আবার কখনো জনসভায় তুলে ধরছেন নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির কথা। তার এসব কথা ‘সত্যবচন’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলেও।

আবদুল কাদের মির্জার এমন কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রাজনীতি পর্যন্ত অস্বস্তি ছড়ালেও এ বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারছেন না দলের জ্যৈষ্ঠ নেতারাও। তাদের মতে, কাদের মির্জার বক্তব্য ‘পাগলের প্রলাপ’। আবার কারো কারো ধারণা নিজেকে ‘জাতীয় নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করতেই মরিয়া হয়ে পড়েছেন কাদের মির্জা।

গত ১৬ জানুয়ারি বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো মেয়র হন কাদের মির্জা। এরপর ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নিতে যান চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে যাবার পথে ফেনীর দাগনভূঞা বাজারে তার গাড়ি বহরে হামলার অভিযোগও তোলেন তিনি।

ওইদিন বিকেলে বসুরহাটে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে কাদের মির্জা বলেন, নোয়াখালী ও ফেনীতে চলা অপরাজনীতির বিষয়ে আমার নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার গাড়ি বহরে হামলার বিষয়টিও তিনি দেখবেন বলেছেন। এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই হিসেবে বেশি আলোচিত বসুরহাট পৌরসভার মেয়র কাদের মির্জা

আ’লীগ নেতাদের সমালোচনায় মুখর কাদের মির্জা

মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই একের পর এক তীর্যক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন কাদের মির্জা। তার একাধিক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরালও হয়। সেসব বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনায় মুখর থাকতে দেখা যায় তাকে। শোনা যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারির কথাও।

ভাইরাল হওয়া একটি বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, যারা বলেন- অমুক নেতা তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। এটাই হলো সত্য কথা। সত্য কথা বলতে হবে। আমি সাহস করে সত্য কথা বলছি।

নোয়াখালীতে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে উল্লেখ করে বক্তব্যে তিনি বলেন, নোয়াখালীর মানুষজন বলে- নোয়াখালীতে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এটা সত্য কথা। কিন্তু আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। টাকা দিয়ে বড় জনসভা করা, মিছিল করা কোনো ব্যাপার নয়। টাকা দিলে, গাড়ি দিলে আমিও অনেক লোক জড়ো করতে পারব।

অন্য একটি বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, আমি প্রয়োজনে একা রাজনীতি করবো। তবে কোনো বেঈমান, মোনাফেক, সুবিধাবাদীর সঙ্গে আমি থাকবো না। আমি অপরাজনীতির বিরুদ্ধে থাকবো।

কাদের মির্জার আধাবেলার হরতাল

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কাদের মির্জার ডাকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আধাবেলা হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়। সেই কর্মসূচিতে অন্যতম দাবি ছিল নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসিকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি চরকাঁকড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ফখরুল ইসলাম সবুজকে গ্রেফতার এবং ফেনী ও নোয়াখালীর অপরাজনীতির হোতাদের দল থেকে বহিষ্কার করা। তবে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে প্রকাশ্যে কিছু না বলায় এখনো উত্তপ্ত রয়েছে নোয়াখালীর পরিস্থিতি।

হরতাল কর্মসূচি পালনের পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কোম্পানীগঞ্জ ও বসুরহাটের পরিস্থিতি নিয়ে করণীয় ঠিক করতে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে বসুরহাট পৌরসভার হল রুমে মতবিনিময় সভা করেন কাদের মির্জা।

বসুরহাটে রক্তপাত ঘটানোর ষড়যন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করে সভায় তিনি বলেন, জনপ্রিয়তা মানুষের জন্য একটা কাল। সেটার ভুক্তভোগী আজ আমি নিজেই। বড় নেতা থেকে ছোট নেতা সবাই আমার বিরোধিতা করছেন। সব শিয়ালের এক ডাক।

তিনি বলেন, অপরাজনীতির সঙ্গে জড়িতরাই কবিরহাট থেকে লোক পাঠিয়ে কোম্পানীগঞ্জে রক্তপাত ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছে। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করি। যিনি ফাঁসির কাষ্ঠে গিয়েও সত্য কথা বলতে বা আদর্শ থেকে পিছপা হননি।

কাদের মির্জার বক্তব্য ‘মিথ্যাচার’

দল ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে কাদের মির্জার বক্তব্যকে ‘মিথ্যাচার’ দাবি করে একইদিন সংবাদ সম্মেলন করেছেন নোয়াখালী সদর উপজেলা, পৌর আওয়ামী লীগ এবং জেলার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে তারা উল্লেখ করেন, প্রায় দুই মাস ধরে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া কাদের মির্জার বক্তব্য দল ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যাচার’ ছাড়া কিছুই নয়। এছাড়া পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা আওয়ামী লীগ নয়, বরং বিএনপি-জামায়াত জোটের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তার বক্তব্যে এমনটিই মনে হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন নেতারা। একইসঙ্গে দলের ও দলের নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের দায়ে কাদের মির্জার বিচারও দাবি করেন তারা।

বহিষ্কারের বিষয় নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায়

২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দলের সব কার্যক্রম থেকে কাদের মির্জাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে চিঠি পাঠানোর কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানায় নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ। তবে বিজ্ঞপ্তির দুই ঘণ্টা পরই পুনরায় বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কথা জানায় জেলা আওয়ামী লীগ। জানতে চাইলে বহিষ্কারের বিষয়টি দলের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র।

দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন কাদের মির্জা

বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচন পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস বিভিন্ন মাধ্যমে কাদের মির্জার দেয়া বক্তব্য নিঃসন্দেহে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করছেন দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা।

তিনি বলেন, একের পর এক দলের পরিপন্থী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন কাদের মির্জা। যা দলের দায়িত্বশীল একজন নেতার পরিবারের কাছ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি আরো বলেন, লতিফ সিদ্দিকী বড় মাপের নেতা। দলের পরিপন্থী কাজ করায় তিনিও রেহাই পাননি, তা সবাই দেখেছে। তবে কাদের মির্জার বক্তব্য সত্য হলে তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আর মিথ্যা প্রমাণিত হলে কিংবা এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকলে সেটাও দলের ভেবে দেখা উচিত।

বসুরহাটে ১৪৪ ধারা জারি

সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন হত্যার ঘটনায় আজ সোমবার বেলা আড়াইটায় বসুরহাটের রূপালী চত্বরে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিল করার কথা জানিয়েছেন কাদের মির্জা। এর আগে একই স্থানে বেলা তিনটায় বিক্ষোভ–সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি পক্ষ। সেই কর্মসূচিতে সমর্থন রয়েছে নোয়াখালী ও ফেনীর দলীয় দুই সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী ও নিজাম হাজারীরও।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ দিন সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।

আইনিউজ/এইচকে

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়