হেলাল আহমেদ, আই নিউজ
বঙ্গবন্ধু হ ত্যা কা ণ্ড: সতর্কতা পেয়েও বিশ্বাস ভাঙে নি বঙ্গবন্ধুর
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হ ত্যা নিয়ে বিভন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকার দলিলাদি। ছবি- অনলাইন
স্বাধীন বাংলাদেশের বুকেই সেই দেশেরই স্বাধীনতার ঘোষককে হ-ত্যা করার মধ্য দিয়েই মূলত অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ রাজনৈতিক কালো অধ্যায়ে প্রবেশ করে ফেলে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল রাত্রিটি সেই কালো অধ্যায় লেখার সূচনার রাত। এই রাতের পর বাংলাদেশ আরো একটি অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হ ত্যা কা ণ্ডের ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বেশ চর্চা হয়। ধীরে ধীরে বের হয়ে আসতে থাকে নেপথ্যের অনেক ঘটনা, অনুঘটনা, আবহ সৃষ্টির কথা। বহু অজানা দেশি-বিদেশি দলিল, তথ্য-উপাত্ত আসতে থাকলো সংবাধ মাধ্যম মারফত, আমরা দেশবাসী বিগত ৫০ বছর ধরে নানান আঙ্গিকে সেগুলো পাঠ করেছি। জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে ৭৫'র আগস্টের সেই রাতে হ ত্যা র শিকার হবার পূর্বে থেকে এই ব্যাপারে সতর্ক করে আসা হচ্ছিল। সতর্কতাগুলো আসছিলো বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা মারফতে। এরমধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র', যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এমনকি সুইডেনের একটি সংবাদ মাধ্যমের নিবন্ধ প্রকাশের খবরও জানা যায়। যারা বিভিন্ন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁকে হ ত্যা পরিকল্পনা হচ্ছে বা ক্যু ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এ বাঙালি সেনাসদস্য ও নেতৃবৃন্দের প্রতি অতিবিশ্বাসে তিনি সেসব অগ্রাহ্য করেছেন। যা তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে আজও মনে করেন ঐতিহাসিক ও দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা।
একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যেরকম নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকার কথা তিনি তাতে থাকতেন না। যেকারণে রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালেও মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়িকে। সেই গাড়ির জানলা খোলা। খোলা জানালায় তাকালে পথচারীদের চোখে পড়ত, গাড়ির ভেতরে হয়তো মগ্নচিত্তে পত্রিকা পড়ছেন বঙ্গবন্ধু। এসবকিছুর পেছনে ছিল এ দেশের মানুষ আর ব্যবস্থার প্রতি বঙ্গবন্ধুর অন্ধবিশ্বাস। এ দেশের মানুষের হাতে তিনি খু ন হতে পারেন তা যেন তিনি মেনে নিতে পারতেন না।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' এর সতর্কবার্তা
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' এর সাবেক রিসার্চ অ্যাণ্ড অ্যানালাইসিস উইং এর প্রধান আর এন কাও ১৯৮৯ সালে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সানডে পত্রিকায় এপ্রিল মাসে এক অভিযোগের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল অসন্তুষ্ট সেনাসদস্য শেখ মুজিবুর রহমানকে হ ত্যা র ষড়যন্ত্র করছে, এই তথ্য আমরা আগেই পেয়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলি। তাঁকে এও বলেছিলাম যে খুবই সতর্কতার সঙ্গে আমাদের কাছে খবরটা পৌঁছানো হয়েছে। যিনি এ খবর দিয়েছেন যেকোণ মূল্যেই তাঁর পরিচয় গোপন রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গান্ধী ছিলেন বাংলাদেশের পরম বন্ধু ছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক আর এন কাও কে বাংলাদেশে এসে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেন। আর এন কাও ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করে আসন্ন আশঙ্কিত বিষয়ের ব্যাপারে অবগত করেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান আর এন কাও এর সেই আশঙ্কাকে বেশ হালকা করে নিলেন। তিনি প্রতিউত্তরে বললেন, তারা আমার নিজের সন্তান, তারা আমার ক্ষতি করবে না। তারা পরবর্তীতে আর এন কাও এর সেই আশঙ্কাকে নিষ্ঠুর বাস্তবতায় রূপ দিয়েছিলেন। নির্দয়ভাবে সপরিবারে হ ত্যা র শিকার হয়ে অতিবিশ্বাসের খেসারত দিয়ে হয়েছিলো গোটা শেখ পরিবারকে সে রাতে।
সুইডিশ নিবন্ধে 'ক্যু' এর ইঙ্গিত
সুইডেনের একটি পত্রিকাতেও সেসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান মুজিবকে হ ত্যা ও সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের বিশেষ প্রবন্ধ ছাপা হয়। যেখানে সেনাসদস্যের অভ্যুত্থান ও পরিকল্পনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি প্রকাশ করা হয়। এই ব্যাপারে কিছু তথ্য জানা যায় তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দিন আহমদের লেখায়। ক্রিটিকাল টাইমস: মেমোয়ার্স অব দ্য সাউথ এশিয়ান ডিপ্লোম্যাট (দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৭) বইতে ফখরুদ্দিন সাহেব লিখেছেন- পনেরো আগস্টের দুই সপ্তাহ আগে আমি সুইডেন থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছিলাম। সেখানে সেনাবাহিনীর অসন্তুষ ও সেনাসদস্যদের অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল।
ফখরুউদ্দিন সাহেবের সেই বার্তাও জাতির পিতা তেমন গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিলেন বলে মনে হয় নি। শেখ মুজিবুর রহমান এতোবড় একটি ক্যু ঘটতে পারে বা এর পরিকল্পনার ব্যাপারে জানার পরও শুধু বলেছিলেন, সফিউল্লাহকে (তৎকালীন সেনাপ্রধান) ফোন করে ব্যাপারটা দেখতে বলবো।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত কতৃক সতর্ক করা হয় বঙ্গবন্ধুকে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুরি' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন সেসময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। কিন্তু এই হেনরি কিসিঞ্জার এবং নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটনের কথোপকথন থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রও সেসময় বঙ্গবন্ধুকে 'ক্যু' ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। সাংবাদিক ও ইতিহাস লেখক মিজানুর রহমান খান প্রথমা প্রকাশনী থেকে ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর মার্কিন দলিলে মুজিব হ ত্যা কা ণ্ড বইটিতে উল্লেখ করেছেন হেনরি কিসিঞ্জার এবং নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটনের সেই কথোপকথন। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটায় (ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় সকাল আটটা) কথা হচ্ছিল দুজনের মধ্যে-
কিসিঞ্জার : আমরা কি তাঁকে জানাইনি?
আথারটন : আমরা তাঁকে বলেছিলাম।
কিসিঞ্জার : কে বা কারা এটা করতে পারে, সে বিষয়ে একটা ধারণা কি আমরা তাঁকে দিইনি?
আথারটন : আমরা তাঁকে নামধান বলেছিলাম কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে...তিনি (মুজিব) তুরি মেরে উড়িয়ে দেন। বলেন, তাঁর সঙ্গে এমন কিছু কেউ করতেই পারে না।
১৯৭৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত ছিলেন স্টিফেন আইজেনব্রাউন। আইজেনব্রাউন দাবী করে বলেছিলেন, জুলাইর শেষ বা আগস্টের শুরুর দিকে শেখ মুজিবকে সতর্ক করতে তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারকে পাঠানো হয়েছিল। আর এভাবেই তাঁরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আসন্ন সম্ভাব্য 'ক্যু' এর ব্যাপারে সতর্ক করে আসছিল।
একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যেরকম নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকার কথা তিনি তাতে থাকতেন না। যেকারণে রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালেও মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়িকে। সেই গাড়ির জানলা খোলা। খোলা জানালায় তাকালে পথচারীদের চোখে পড়ত, গাড়ির ভেতরে হয়তো মগ্নচিত্তে পত্রিকা পড়ছেন বঙ্গবন্ধু। এসবকিছুর পেছনে ছিল এ দেশের মানুষ আর ব্যবস্থার প্রতি বঙ্গবন্ধুর অন্ধবিশ্বাস। এ দেশের মানুষের হাতে তিনি খু ন হতে পারেন তা যেন তিনি মেনে নিতে পারতেন না। যে সেনাসদস্যকে তিনি সন্তান বলে পরিচয় তাদের হাত তাঁর রক্তে রঞ্জিত হবে এটা জাতি হিসেবে আমরাও কি আশা করেছি বা করতে পারি?
১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত ছিলেন স্টিফেন আইজেনব্রাউন। তিনিও দাবী করে বলেছেন, আগস্ট হ ত্যা কা ণ্ডে র আগে জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুর দিকে শেখ মুজিবকে সতর্ক করতে একজন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূৎ প্রেরণ করা হয়েছিলো। ডেভিস ইউজিন বোস্টার নামের ওই মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে বলেছিলেন, আপনি যদি তাঁকে (শেখ মুজিবুর রহমান) দেখতে যান, তাহলে দেখবেন অবাক দৃশ্য। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লোকজন তাঁকে দেখতে ভিড় করে আছে। আমি নিজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অভিভূত হয়েছি।
জাতির পিতার এমন সরল বিশ্বাস আর দেশবাসীর আস্থা অর্জন করায় অভিভূত হয়েছিলেন দেশি-বিদেশি অনেক বিজ্ঞজনেরাও। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ জাতির পিতার এমন সরল বিশ্বাস এবং সেনাসদস্যদের প্রতি অতি আস্থার কারণে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা করছিলেন। যা বাস্তবে রূপ নিয়েছিল ভয়াল ১৫ আগস্টের রাতে।
- কাল থেকে যেসব শাখায় পাওয়া যাবে নতুন টাকার নোট
- 'জাতীয় মুক্তি মঞ্চ' গঠনের ঘোষণা
- বেইলি রোডে আগুন : ৩ জন আটক
- এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী
- এক বছরেই শক্তি, ক্ষিপ্রতা জৌলুস হারিয়ে 'হীরা' এখন বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী
- ওয়াহিদ সরদার: গাছ বাঁচাতে লড়ে যাওয়া এক সৈনিক
- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিকথা (প্রথম পর্ব)
- এবার ভাইরাস বিরোধী মাস্ক বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো বাংলাদেশ
- মায়েরখাবারের জন্য ভিক্ষা করছে শিশু
- ২৫ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক

























