ঢাকা, রোববার   ১৮ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৫ ১৪২৮

শাহ শরীফ উদ্দিন, সিলেট

প্রকাশিত: ১৯:৫০, ২২ মার্চ ২০২১
আপডেট: ২৩:২১, ২২ মার্চ ২০২১

রাতারগুলে `সুবিধার বাঁধে` জলারবনের সর্বনাশ

রাতারগুলের জলারবন। ছবি: আইনিউজ

রাতারগুলের জলারবন। ছবি: আইনিউজ

হিজল, করছ, বরুণ, মূর্তাসহ হরেকরকম পানি-সহিষ্ণু বৃক্ষঘেরা রাতারগুলের জলারবন। রাতারগুলে প্রায় ৩ হাজার একর বনভূমি থাকলেও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৫ শত ৪ একর। যা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালে। এতোদিন এ বনভূমি অনেকটাই স্বাভাবিক থাকলেও এবার 'সুবিধার বাঁধে' হচ্ছে জলারবনের সর্বনাশ।

অতীতের নিয়ম পাল্টে এবার চার মাস শুকনায় থাকার বদলে বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া ময়লা পানিতে শেকড় ভিজিয়ে থাকতে হয়েছে গাছগুলোকে। তাই অকারণেই মরছে গাছ। কিন্তু কিভাবে এ বাঁধ তা অনেকটাই অজানা বন বিভাগের। আর গবেষকদের মতে 'নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়ত ক্লান্ত বৃক্ষ এক সময় পরাজিত হচ্ছে।'

নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে যুদ্ধ করছে জলাবনের গাছ

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক সময় শুষ্ক মৌসুমে এ বনের গাছের গুড়া শুকনো থাকলেও এখন পর্যটকদের নৌকা চলাচলের জন্য বাঁধ দিয়ে আটকানো হয়েছে পানি। তাই শুষ্ক-বর্ষা উভয় মৌসুমেই কিছু অংশে থাকে পানি। এতে নতুন করে পরিচিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার যুদ্ধ করতে হচ্ছে গাছগুলোকে। কেবল তাই না, পানির গতিরোধ থাকার কারণে জমে থাকা পানি প্রচণ্ড ঘোলাটে এবং ময়লা। বনের ভিতরেই চিহ্ন আছে তাবুবাস ও আগুন পোহানোর। বাদ পড়েনি আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা। আছে ডাবের দোকান, ঝালমুড়িসহ মুখরোচক খাবারের দোকানও।

বনের ভেতর ঘুরে দেখা যায় পানির কাছাকাছি থাকা অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। তবে যত ভেতরের দিকে যাওয়া যায় তত গাছগুলোর চেহারা তুলনামূলক ভালো। অতীতে পানিগুলো স্বাভাবিক চলাচল থাকলেও এবার অজ্ঞাত কারণে বাঁধের সকল পাশেই পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে শুকনার এ মৌসুমে বাঁধের এক পাশ দিয়ে পানির যাতায়াত থাকলেও এবার পর্যটকদের নৌকা চলাচলের সুবিধার জন্য তা বন্ধ করা হয়েছে। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিএমসি) উদাসীনতাসহ আছে নানা অভিযোগ। কেবল তাই না, এ কমিটির মদদেই নৌকা ঘাটের ইজারাদাররাই বাঁধের পাশ দিয়ে পানি চলাচনের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

তবে বাঁধ কিভাবে কখন হয়েছে তার কোন সঠিক তথ্য জানেন না সিলেটের বন সংরক্ষক। তবে তথ্য দিলেন সারি রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আমি যতটুকু জেনেছি ২০০৭-৮ অর্থ বছরে বাঁধটি করা হয়েছে। মূলত ২০১৫ সাল থেকে এর ব্যাপক প্রচার হলেও তখনো কিছু পর্যটক আসতেন। আর পর্যটকদের নৌকা চলাচলের জন্য এখানে একটি গর্ত করে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে।

 বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া ময়লা পানিতে শেকড় ভিজিয়ে থাকতে হয়েছে গাছগুলোকে। তাই অকারণেই মরছে গাছ।

গাছ রক্ষায় বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের যত পরামর্শ

এদিকে সম্প্রতি স্থানীয়দের সাথে কথা হলে জলারবন রক্ষায় বেশ কিছু পরামর্শমূলক বক্তব্য দিয়েছেন তারা। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে- জলাবন রক্ষায় ৩টি গেটের বদলের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য একটি গেট নির্ধারণ করা, পর্যটকদের আগমন সীমিত করা। অথবা পর্যটক বন্ধ করে দেওয়া। বাঁধ কেটে পানি চলাচলের স্বাভাবিক যাতায়াত তৈরি করা। দীর্ঘদিন থেকে গাছের গুড়া ঘিরে রাখা মূর্তা কর্তন করা, বনের দেখভালের দায়িত্ব রাতারগুলের মানুষের কাছে হস্তান্তর করা ও এ বন সংরক্ষণে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য বাগবাড়ি এলাকায় ৩৬ একর বনাঞ্চলকে বিকল্প হিসেবে কাজে লাগানো ইত্যাদি।

তবে জলারবনের সামগ্রিক বিষয় শোনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার বলেন, ‘এটা সত্য যত ভেতরে যাওয়া যায় তত গাছের শারীরিক অবস্থা ভালো এবং যেখানে মূর্তা কম সেখানেও গাছের অবস্থা ভালো। তবে এটি গবেষণার বিষয়। এমন হতে পারে এসব গাছ জন্মলগ্ন থেকে নির্ধারিত কিছু সময় শুকনায় থেকে এবং স্বচ্ছ জলে থেকে অভ্যস্ত। কিন্তু এখন এর উলটো হওয়ায় গাছগুলো মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে কিছু গাছ মারা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে গবেষণার প্রয়োজন।’

জলারবন নিয়ে বন বিভাগের পরিকল্পনা

এদিকে জলারবন নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন। তিনই বলেন,'এখানে এখনো অনেক ভূমি আছে যা খালি পড়ে আছে। আমরা দুই ধাপে ইতোমধ্যে বন লাগিয়েছি। কিন্তু ওই এলাকায় গরুর উপদ্রব বেশি। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের গরুর কারণে নতুন লাগানো মূর্তগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তবুও যে পরিমাণ টিকে তার থেকে সময়ে সময়ে বনের বিস্তৃতি হবে।

তবে বাঁধের বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য না না দিতে পারলেও বনের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ হতে দেওয়া হবে না বলে জানালেন বন সংরক্ষক এসএম সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, 'যদি পর্যটকদের সুবিধার জন্য বা অন্য কারো সুবিধার জন্য পানি আটকানো হয়ে থাকে তাহলে এটি কেটে দেওয়া হবে। তবে এবার যেহেতু আর সময় চলে গেছে। বৃষ্টিবাদল হলে পানি এমনিতেই স্বাভাবিক চলাচল করা শুরু করবে সে ক্ষেত্রে আগামীতে এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।'

এছাড়া সহ ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) ও অন্যান্য বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় বলে জানান তিনি। সে ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান সিলেটের বন সংরক্ষক এসএম সাজ্জাদ হোসেন।

জলারবনে বাদ পড়েনি আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা

এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘বন বিভাগ থেকে যে সহযোগিতা চাওয়া হবে আমরা তা করতে প্রস্তুত।'

দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান পরিবেশকর্মীদের

অপরদিকে বন বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম। তিনি বলেন, 'অতীতে কিন্তু এভাবে পানি জমে থাকত না। এবার পানি জমে আছে। তার কারন এই বাঁধ। তাই আমি বলব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে গাছগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সে হিসেবে বন বিভাগ বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে এটাই আমার প্রত্যাশা।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়