ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৪ ১৪২৮

আইনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২৯, ৫ জুন ২০২১
আপডেট: ২২:০২, ৫ জুন ২০২১

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বদলে যাচ্ছে দূষণের চাপে?

একদল দর্শনার্থী মানেই প্লাস্টিকের বিরাট বহর, সবই থেকে যায় সুন্দরবনে। ছবি: অনলাইন

একদল দর্শনার্থী মানেই প্লাস্টিকের বিরাট বহর, সবই থেকে যায় সুন্দরবনে। ছবি: অনলাইন

সুন্দরবনে আজকাল লবনাক্ত মাটির বৃক্ষের চেয়ে বেশি পরিমাণে যেন দেখা যাচ্ছে প্লাস্টিক। বনের একদম গহীন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে এ প্লাস্টিকের রাজত্ব। পর্যটক-দর্শনার্থীরা অনেকেই এডভেঞ্চারের লোভে বনের গহীনে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাটিয়ে আসতে চান, তারা সেইসময় সাথে নেন প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, পলিথিন ইত্যাদি। বছরের পর বছর এইসব প্লাস্টিক জঙ্গলে পড়ে থাকে। 

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রায় দেশের সব সচেতন নাগরিকদের কণ্ঠে পরিবেশের দূষণরোধের বার্তা ফুটে উঠেছে। অনেকেরই নজরে `হট টপিক` হয়ে উঠে এসেছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন দূষণের কথা। মানুষের আগ্রাসনে দূষণ বাড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে। বন-সংলগ্ন এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপন, বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল, বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের কারণে ঘটছে এসব দূষণ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও জলজপ্রাণীর ওপর। 

তবে প্রতিদিনই সুন্দরবনের দূষণ বাড়লেও এ নিয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা করেনি বন বিভাগ, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো সংস্থা। এমন অবস্থায় আজ শনিবার (৫ জুন) পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ২০০১ সাল থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন জেলাগুলোতে বেসরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে বেড়েছে নদীভাঙন ও পলি পড়ার হার। তার ওপর মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডে দূষণ বাড়ছে সুন্দরবনে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সুন্দরবন সংশ্নিষ্টরা।

এছাড়াও সুন্দরবনে আজকাল লবনাক্ত মাটির বৃক্ষের চেয়ে বেশি পরিমাণে যেন দেখা যাচ্ছে প্লাস্টিক। বনের একদম গহীন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে এ প্লাস্টিকের রাজত্ব। পর্যটক-দর্শনার্থীরা অনেকেই এডভেঞ্চারের লোভে বনের গহীনে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাটিয়ে আসতে চান, তারা সেইসময় সাথে নেন প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, পলিথিন ইত্যাদি। বছরের পর বছর এইসব প্লাস্টিক জঙ্গলে পড়ে থাকে। 

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করলেও সেই এলাকার মধ্যে গড়ে উঠছে শিল্প প্রতিষ্ঠান। গত ৮-১০ বছরে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারি, বিটুমিন, সি ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরি প্রভৃতি। বনের খুব কাছেই বিশালাকৃতির খাদ্যগুদাম নির্মাণ করেছে খাদ্য বিভাগ। বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পশুর নদে, যা চলে যাচ্ছে বনের মধ্যে নদী ও মাটিতে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকায় উঠে এসেছে পরিবেশ দূষণের কথা, এসেছে সুন্দরবন দূষণের কথা। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মোংলা বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বনের মধ্য দিয়ে ১৩১ কিলোমিটার নদীপথে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচল করছে। বনের মধ্যে নদী দিয়ে রায়মঙ্গল ও কয়রার আংটিহারা এলাকা দিয়ে জাহাজ যাওয়া-আসা করছে ভারতে। মোংলা বন্দরের পশুর নদের চ্যানেলে প্রতিবছর আসছে গড়ে প্রায় সাড়ে চারশ বিদেশি জাহাজ।

এছাড়াও নদে চলাচল করছে পণ্যবাহী কয়েক হাজার দেশি জাহাজ। এসব জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ, হাইড্রোলিক হর্ন ও রাতে আলো আতঙ্কিত করে তুলছে বন্যপ্রাণীদের। নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল ও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে বনের মধ্যে। এতে দূষিত হচ্ছে বনের মাটি ও পানি। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস তেল নিয়ে ট্যাঙ্কার ডুবির কারণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে সুন্দরবন। এরপর সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীতে পটাশ সার, কয়লা ও ক্লিঙ্কার বোঝাই জাহাজডুবি হয়েছে আরও ছয়-সাতবার।

অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দীর্ঘদিন ধরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি চক্র। এর ফলে বিভিন্ন মাছের পোনা, কাঁকড়া, সাপসহ জলজপ্রাণী মারা যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাচারের উদ্দেশ্যে বিষ দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ ও কুমির। যা পানি দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। 

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিবছর সুন্দরবন ভ্রমণে যাচ্ছেন অসংখ্য পর্যটক। সবশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছিলেন এক লাখ ৭৩ হাজার পর্যটক। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেক পর্যটক চিপসের প্যাকেট, পলিথিন, পানি ও কোমল পানীয়ের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ, খাবারের প্যাকেট, ওয়ানটাইম প্লেট ও গ্লাস ফেলছেন বনের মধ্যে মাটি ও নদীতে। এ ছাড়া উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে পর্যটকবাহী কিছু কিছু জলযানে। বনের মধ্যে বুঝে কিংবা না বুঝে হৈচৈ করেন কিছু পর্যটক। এর সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের ওপর।

এই বন আমাদের প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত এক অমূল্য সম্পদ। পরিবেশ দিবসে আমরা আসুন নিজেকে শুধরে নেই, শপথ নেই প্রাকৃতিক জায়গা ভ্রমণে গিয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার করলেও তা যথাস্থানে ফেলবো, পানি দূষিত করবো না, নিঃশ্বাস নিচ্ছি যে বাতাস থেকে সেটিও বিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো। 

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়