ঢাকা, শনিবার   ২৪ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ৯ ১৪২৮

হাসানাত কামাল ও সীমান্ত দাস

প্রকাশিত: ২১:৫১, ১৯ জুলাই ২০২১
আপডেট: ২৩:৩২, ১৯ জুলাই ২০২১

যে সড়ক বন্যপ্রাণীর মৃত্যুফাঁদ

মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে প্রাণ হারানো মেছোবাঘ। ছবি : হাসানাত কামাল

মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে প্রাণ হারানো মেছোবাঘ। ছবি : হাসানাত কামাল

মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়ক পারাপারের সময় আবারও প্রাণ হারালো একটি মেছোবাঘ। সোমবার (১৯ জুলাই) রাত ৯টার দিকে প্রাণীটি গাড়িচাপায় মারা যায়। 

পথযাত্রী মুশফিক আহমদ সাদিক আইনিউজকে বলেন, আমরা কুলাউড়া থেকে মৌলভীবাজার শহরে ফিরছিলাম। এসময় মাঝপথে দেখি তালতলা এলাকায় একটি বন্যপ্রাণী কাতরাচ্ছে। আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে দেখতে পাই একটি মেছোবাঘ রক্তাক্ত ও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। প্রাণীটিকে মাথায় পানি দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মেছোবাঘটি আমাদের সামনেই নিথর হয়ে পড়ে। নাড়াচাড়া করে সাড়া পাওয়া যায়নি আর।

তিনি বলেন, প্রাণীটি জীবিত থাকলে আমরা পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতাম। কিন্তু তার আগেই সে প্রাণ হারায়। 

নিথর হয়ে যাওয়া মেছোবাঘ। ছবি : হাসানাত কামাল

অপর পথযাত্রী তানভীর আজিজ আইনিউজকে বলেন, এই সড়কটি মেছোবাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সড়কের দুপাশে ধানী জমি। আশেপাশেই এসব বন্যপ্রাণীরা বসবাস করে। রাতের বেলা খাবারের সন্ধানে বের হয়। এরা সাধারণত মাছ ও ব্যাঙ পছন্দ করে। খাবারের সন্ধানে সড়ক পারাপারের সময় চালকদের বেপরোয়া গাড়িচাপায় মারা যায়। 

তিনি আরও বলেন, আমি এই পথে নিয়মিত আস-যাওয়া করি। প্রায়ই দেখি মেছোবাঘ কিংবা শেয়াল রাস্তায় মৃত পড়ে আছে। এই সড়কে চালকদের আরও সতর্কভাবে গাড়ি চালানো উচিত। বনবিভাগ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। সড়কের বিভিন্নস্থানে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো উচিত। 

এক্ষেত্রে স্থানীয় গাড়িচালক ও সিএনজিচালকদের সাথে বৈঠক বা মতবিনিময় করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।

মেছোবাঘের উপর আক্রমণ

গ্রাম জনপদে বেঘোরে মেছোবাঘেরদের মৃত্যু প্রায়ই ঘটছে। অনেক সময় গ্রামের মানুষ বাঘের আক্রমণের ভুল আতঙ্কেই এদের পিটিয়ে হত্যা করেন। করোনাকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় বা জার্নাল থেকে জানা যায় মেছোবাঘের উপর ১৯ টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জনপদে ৮২টি মেছোবাঘ আটকের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৩০টি মেছোবাঘ মেরে চামড়া ছাড়ানো হয়েছে। 

মেছোবাঘ রক্ষায় বন বিভাগের উদ্যোগ

এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী আইনিউজকে বলেন, মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ একটি জেলা। এখানে হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর, বাইক্কাবিলসহ অসংখ্য হাওর ও খাল-বিল রয়েছে। এছাড়াও লাউয়াছড়াসহ অন্যান্য বন রয়েছে। মেছোবাঘের ৬০ শতাংশ খাবারই হলো মাছ। বাকি ৪০ শতাংশ ব্যাঙ ও হাওর-বনের পাখি। এরা খুবই নিরীহ প্রাণী। কখনোই মানুষকে আক্রমণ করেনা, এমনকি বাড়ি-ঘরে গিয়ে হাঁস-মোরগও খায়না। কিন্তু মানুষ হাঁস-মোরগ খেয়ে ফেলার ভয় কিংবা আক্রমণ করতে পারে এমন আতঙ্কে মেছোবাঘ আটক করে। অনেকে আবার পিটিয়ে মেরেও ফেলে। তাছাড়াও রাস্তা পারাপারের সময় বেপরোয়া গাড়ি চালনায় মেছোবাঘ ও শেয়াল মারা যায়। বন্যপ্রাণী রক্ষায় মৌলভীবাজারবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে। 

তিনি বলেন, বিগত এক বছরে আমি গাছ চুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অনেকগুলো মামলাও করেছি। এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করবো। এক্ষেত্রে সাংবাদিক, বন্যপ্রাণী গবেষক, পরিবেশবীদ, জনপ্রতিনিধিসহ সকল স্তরের মানুষকে নিয়ে একসাথে কাজ করবো।

গত ১৭ জুলাই শ্রীমঙ্গলের ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া মারাত্মকভাবে আহত মেছোবাঘ। ধারণা করা হচ্ছে এটিও সড়ক দুর্ঘটনা বা স্থানীয়দের পিটুনির শিকার।

বন্যপ্রাণীর চলাচল এলাকায় সড়কে সচেতনতামূলক সাইন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ কাজটিও করা যায়। তবে গাড়িচালকরা অনেকসময় সেটাও মানতে চান না। গাড়ির বেপরোয়া গতির কারণে মারা যায় বন্যপ্রাণীরা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় গাড়িচালকদের সাথে সতর্কতামূলক মতবিনিময়ের বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন। বন্যপ্রাণী চলাচল এলাকায় গাড়ি চালকদের কম গতিতে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এছাড়া লাউয়াছড়া এলাকায় বন্যপ্রাণীর সড়ক পারাপারে মৃত্যু এড়াতে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের বিকল্প বাইপাস নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। 

বিড়াল প্রজাতির নিরীহ প্রাণী মেছোবাঘ

এর নামে বাঘ থাকায় এটিকে অনেকেই আক্রমণাত্মক ভাবতে পারেন। কিন্তু মেছোবাঘ নিতান্তই নিরীহ। আমাদের গৃহপালিত বিড়ালের মতোই। এজন্যই এর অন্যান্য নাম মাছবিড়াল, বড় বিড়াল ইত্যাদি। ইংরেজি নাম Fishing Cat, বৈজ্ঞানিক নাম- Prionailurus viverrinus

মেছোবাঘের বিষয়ে বিভিন্ন জার্নাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি মাঝারি আকারের বিড়ালগোত্রীয় একধরনের স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী। ব্রাজিল, কোস্টারিকা, বাংলাদেশ, ভারত, বলিভিয়া, ক্যাম্বোডিয়া, লাউস, শ্রীলঙ্কায় এরা স্থানীয়ভাবে বাঘরোল নামে পরিচিত। এদের আবাসস্থল থাইল্যান্ড ও এল সালভাদোর। বিগত কয়েক দশকে এই বাঘরোলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জনবসতি স্থাপন, কৃষিজমিতে রূপান্তর ও অন্যান্য কারণে বাঘরোলের আবাসস্থল জলাভূমিগুলো দিন দিন সংকুচিত ও হ্রাস পাওয়াই এর মূল কারণ। তাই আইইউসিএন ২০০৮ সালে মেছোবাঘকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করে।

বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

মেছোবাঘ সাধারণত নদীর ধারে, পাহাড়ি ছড়া এবং জলাভূমিতে বাস করে। এরা সাঁতারে পারদর্শী হ‌ওয়ায় এধরনের পরিবেশে সহজেই খাপ খাওয়াতে পারে। এদের গায়ে ছোপ ছোপ চিহ্ন থাকার জন্য চিতাবাঘ বলেও ভুল করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটিকে সেই রাজ্যের 'জাতীয় প্রাণী' তকমা দেওয়া হয়েছে এবং এই রাজ্য বর্তমানে বাঘরোল সংরক্ষণে ও তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আশার আলো দেখিয়েছে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো

আইনিউজ/এইচকে/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়